বাঞ্জুবাবু একটা চেয়ারে বসে সই করে দিলেন। সুরঞ্জনবাবু কাগজটা হালদারমশাইকে দিয়ে বললেন,–এবার দয়া করে কেটে পড়ুন মশাই।
হালদারমশাই কাগজটা কর্নেলকে দিয়ে বললেন,–আর-একবার দেইখ্যা দিন কর্নেলস্যার!
কর্নেল কাগজটা হাতে নিয়েছেন, এমনসময় ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি, এস. আই. রমেনবাবু এবং আরও একজন অফিসার ঘরে ঢুকলেন। বারান্দায় একদঙ্গল কনস্টেবলও এসে দাঁড়াল।
বাঙ্কুবাবু আড়ষ্টভাবে হেসে বললেন,–কী ব্যাপার স্যার? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না?
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–আপনার বাড়ি হয়েই আসছি দত্তবাবু! আপনাকে আমাদের দরকার।
বাঞ্ছারাম দত্ত করজোড়ে বললেন,–বলুন স্যার!
–কর্নেলসায়েব! আপনি এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আগে কথা বলে নিন।
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে কাঞ্চন সেনের কার্ডটা বের করে বললেন,–দেখুন তো দত্তবাবু। এই কার্ডটা চিনতে পারেন কি না।
দত্তবাবু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন,–ওটা কীসের কার্ড স্যার?
কলকাতার বিখ্যাত চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির এজেন্ট কাঞ্চন সেনের কার্ড। তাকে আপনি কয়েক লক্ষ টাকার জুয়েলারি বিক্রির খবর দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে শুক্রবার কাঞ্চনবাবু আপনার বাড়ি এসেছিলেন। কিন্তু জুয়েলারি তাকে সেদিন দেখানোর অসুবিধে ছিল বলেই আমার ধারণা। কারণ ওগুলো তখনও আপনার কাছে পৌঁছয়নি। তা ছাড়া, চোরাই জুয়েলারি। একটা ঝুঁকি ছিল, আপনি তা জানতেন। তাই জুয়েলারি চুরির দায় অন্যের কাঁধে চাপানোর জন্য আপনি কাঞ্চনবাবুর পকেট থেকে কোনো সুযোগে তার কার্ডটা চুরি করেছিলেন। কাঞ্চনবাবু কলকাতা ফিরে গিয়ে টের পান তার এজেন্ট-কার্ড চুরি গেছে। পরদিন শনিবার তিনি ২৯৭ আপনার কাছে এসেছিলেন। কিন্তু কার্ডের হদিস পাননি। রবিবার সুদর্শনবাবু তার মাসতুতো ভাই ঝন্টুবাবুর নির্দেশে কলকাতায় আমার কাছে গিয়েছিলেন। বাসে কিংবা ট্রেনে আপনার লোক তার ব্যাগে কার্ডটা গোপনে ভিড়ের মধ্যে গুঁজে দেয়। হা-সুরঞ্জনবাবু আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সুরঞ্জনবাবুই আপনাকে জানিয়েছিলেন, তার ছোটভাই কোথায় যাচ্ছেন। আপনি সুরঞ্জনবাবুর কাছেই জেনে নিয়েছিলেন, সুদর্শনবাবু ব্যাগে মহালক্ষ্মীর ছবি আমাকে দেখাতে নিয়ে যাবেন। সুদর্শনবাবু ছবি বের করলেই চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির এই বিশেষ কার্ড বেরিয়ে পড়বে। সুদর্শনবাবু কার্ড দেখে চমকে উঠবেন। আমিও কার্ডটা দেখব। এই কার্ড দেখার পর সুদর্শনবাবু আমার সন্দেহভাজন হবেন। কিন্তু ছবি বের করার সময় কার্ডটা ছিটকে পড়েছিল সুদর্শনবাবুর পায়ের নীচে। তিনি তা লক্ষ করেননি। তিনি চলে যাওয়ার পর কার্ডটি আমি দেখতে পেয়েছিলুম। আর-একটা কথা। কাঞ্চনবাবু কার্ড হারানোর পর আমার কাছে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের হাতে আপনার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–দত্তবাবুর সেই লোককে আমরা অ্যারেস্ট করেছি। সে জেরার মুখে সব স্বীকার করেছে। কাঞ্চনবাবু আপনাকে শনিবার এসে কার্ড না পেয়ে হুমকি দিয়ে গিয়েছিলেন, কার্ড না পেলে তিনি আপনাকে চোরাই জুয়েলারির কেসে ফাসাবেন। তাই রবিবার আপনার লোক, অর্থাৎ কুখ্যাত বাবু ঘোষকে আপনি কলকাতা পাঠিয়েছিলেন। সে কাঞ্চনবাবুর একসময় ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। অনেক চোরাই জুয়েলারি সে কাঞ্চনবার সাহায্যে বিক্রি করেছে। আপনার হুকুম ছিল, বেগতিক দেখলেই তাকে যেন বাবু ঘোষ খতম করে। শেষপর্যন্ত বাবু ঘোষ তা করেছে। তাকে আমরা খুনের দায়ে ধরেছি। এবার আপনার পালা! রমেনবাবু! বাঞ্ছারাম দত্তকে অ্যারেস্ট করুন।
রমেনবাবু বাঞ্ছারাম দত্তের কাছে এসে সহাস্যে বললেন,–আপনাকে গ্রেফতার করা হল। আপনি মানী লোক। চলুন! আমাদের গেস্টহাউসে থাকবেন। একটু কষ্ট হবে। কিন্তু উপায় কী?
বলে তিনি কনস্টেবলদের ডাকলেন, রামভকত! সুরেন্দ্র! এঁকে প্রিজনভ্যানে নিয়ে যাও। একমিনিট। কই দত্তবাবু! শালের ভেতর থেকে হাতদুটো বের করুন।
দত্তবাবুর দুটো হাতে তিনি হ্যান্ডকাফ এঁটে দিলেন। কনস্টেবলরা দত্তবাবুকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–রামভকত! দত্তবাবুকে একটু পরে নিয়ে যাবে। কর্নেলসায়েব! বলুন!
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন,–দত্তবাবু! আপনি পাঁচখালি এলাকার কালুখালিতে দশরথের কাছে অর্ডার দিয়ে একটা বেতের ছড়ি তৈরি করেছিলেন! অবিকল সুদর্শনবাবুর মতো ছড়ি।
দত্তবাবু বলার ভিতরে বললেন,–তাতে কী হয়েছে?
কর্নেল সবাইকে অবাক করে ভোঁদাকে বললেন,–ভোঁদা! তোমার থলে দাও!
ভোঁদা চটের থলেটা নিয়ে এল। কর্নেল থলেতে হাত ভরে যে জিনিসগুলো বের করলেন, তা একটা বেতের ছড়ির ভাঙাচোরা খানিকটা অংশ। শুধু ঘোরানো কালো রঙের বাঁটটা আস্ত আছে। কিছু অংশে মাটি লেগে আছে। বোঝা যায়, শুকনো কাদা।
কর্নেল হাসলেন। –এগুলো শ্রীমান ভেঁদার আবিষ্কার। দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগে ভোঁদা সন্ধ্যার একটু আগে কনকপুর থেকে সেচবাংলোতে ফেরার সময় দুর থেকে দেখেছিল, দত্তবাবু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তার মোটরসাইকেলে চেপে তার পাশ দিয়ে চলে গেলেন। এই ছেলেটা স্বভাবে খুব কৌতূহলী! ছোটবেলা থেকে সে সর্বচর। মঙ্গলবার ভোরে মর্নিংওয়াকে আমার সঙ্গে বেরিয়ে সে এই গোপন ঘটনাটা বলেছিল। তার সঙ্গে গিয়ে এগুলো একটা ঝোঁপের ভিতরে দেখতে পেলুম। তার ঢোলা প্যান্টের দুই পকেটে ভরে এগুলো তাকে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখতে বললুম। আমার মাথায় একটা থিয়োরি এসেছিল। তার সত্যতা যাচাই করতেই কালুখালিতে দশরথের কাছে গিয়েছিলুম। তার পর সিওর হয়েছিলুম।
