সুদর্শনবাবু সবার আগে হন্তদন্ত বেরিয়ে গেলেন।…
দোতলায় উঠে দেখি, সুদর্শনবাবু একহাতে তাঁর বেতের ছড়ি অন্য হাতে ছড়ির কালো বাঁট নিয়ে তেমনই হন্তদন্ত এগিয়ে আসছেন। তিনি হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন–আমার চাবি নেই! আমার চাবিদুটো চুরি গেছে।
শোভাদেবী ধমক দিলেন।–চুপ করো নান্টু! আর চাবি-চাবি কোরো না। তোমরা দুভাই জানো না। কিন্তু শৈলবালা সাক্ষী! মৃত্যুর আগের দিন শ্বশুরমশাই আমাকে দু-জোড়া চাবিই গোপনে দিতে চেয়েছিলেন। তখন আমার বয়স কম। সাহস করে চাবি রাখতে পারিনি। এবার থেকে আমার কাছে চাবি থাকবে।
সুরঞ্জনবাবু মিনমিনে গলায় বললেন,–আমার চাবিজোড়াও নিয়েছ তুমি?
চুপ! একটি কথাও নয়।–বলে তিনি কোমরের কাছ থেকে দুজোড়া চাবি বের করে সিঁড়ির পূর্বের ঘরের দরজা খুললেন। তারপর ভিতরে ঢুকে আলো জ্বেলে দিলেন। এঘরের কোনো জানলা নেই। দ্বিতীয় কোনো দরজাও নেই।
কনেমিঃ ভাদুড়ি এস. আহ.মর আসছি। চলুন সুরঞ্জনবাবু শুনার ঘরে গিয়ে দেখলুম আমাদের পিছনে ভোঁদাও উঠে এসেছে। চোখে চোখ পড়লে সে নিঃশব্দে হাসল।
শোভাদেবী দেওয়ালের মধ্যে বসানো আয়রনচেস্ট দুটো চাবির সাহায্যে খুললেন। তারপর মেঝেয় মাথা লুটিয়ে প্রণাম করে দুহাতে রুপোর চৌকো থালায় বসানো দেবী মহালক্ষ্মীকে বের করলেন। কষ্টিপাথরে তৈরি ছোট্ট প্রতিমার মাথায় রত্নখচিত মুকুট আর গলা থেকে হাঁটু অব্দি ঝোলানো জড়োয়া নেকলেস আলোয় ঝলমল করে উঠল।
সুরঞ্জনবাবু আর সুদর্শনবাবু মাথা লুটিয়ে প্রণাম করলেন। শোভাদেবী বললেন,–ও. সি. সায়েব, কর্নেলসায়েব। এবার আপনারা কী বলবেন, বলুন!
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি একটু হেসে বললেন, আপনার স্বামী রাজসাক্ষী হবেন! আর কী বলব? আপনার গোয়েন্দাগিরির কাছে হার না মেনে উপায় নেই। কী বলেন কর্নেলসায়েব? মিঃ হালদার?
কর্নেল চুপ করে থাকলেন। হালদারমশাই বললেন,–ঠিক কইছেন মিঃ ভাদুড়ি! এতদিনে বুঝলাম, ওনাগো ক্যান গৃহলক্ষ্মী কয়!
মিঃ ভাদুড়ি আমার দিকে ঘুরে বললেন-জয়ন্তবাবু! আপনি তো সাংবাদিক! আমার ধারণা, পুরো ঘটনাটি আপনি আপনাদের পত্রিকায় লিখবেন। তাই না?
কর্নেল সহাস্যে বললেন,–জয়ন্ত রোমহর্ষক গপ্পো লিখে ফেলবে। ওকে একটু সতর্ক করে দেওয়া উচিত।
বলে তিনি পিছনে ঘুরলেন। অ্যাই ভোঁদারাম! উঠে পড়ো বাবা! রায়বাড়ির মহালক্ষ্মী দেবী দর্শন করতে চেয়েছিলে। দর্শন হয়ে গেছে। আর কী?
ভোঁদা এতক্ষণ ধরে উপুড় হয়ে মেঝেয় মাথা ঠেকিয়ে ছিল। উঠে দাঁড়িয়ে সে তেমনই নিঃশব্দে হাসল। সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, প্রতিমার মূল্যবান রত্নরাজির চেয়ে একটি অনাথ, সরল ও নিষ্পাপ তরুণের এই হাসি অনেক বেশি উজ্জ্বল। অনেক বেশি মূল্যবান।…
৪.৯ কালিকাপুরের ভূত রহস্য
এক
সেবার ডিসেম্বরেও কলকাতায় তত শীত পড়েনি। এক রবিবারে অভ্যাসমতো কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে আড্ডা দিতে এসেছিলুম। দেখলুম কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে যথারীতি চুরুট টানছেন, আর সোফার কোণের দিকে বসে প্রাইভেট ডিটেকটিভ আমাদের প্রিয় হালদারমশাই ডানহাতে খবরের কাগজ আর বাঁ-হাতে এক টিপ নস্যি নিয়ে বসে আছেন। আর কর্নেলের কাছাকাছি যে প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি কাচুমাচু মুখে বসে আছেন, তাকে দেখেই বোঝা গেল তিনি মফস্বলের মানুষ। কলকাতার লোকজনের চেহারা আর হাবভাবে বেশ খানিকটা চেকনাই থাকে। এই ভদ্রলোক মুখ তুলে আমাকে দেখে আর-একটু আড়ষ্টভাবে সরে বসলেন। কর্নেলের জাদুঘর সদৃশ ড্রইংরুমে ঢুকেই আমি সম্ভাষণ করেছিলুম,–মর্নিং কর্নেল।
কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে গলার ভেতরে মর্নিং’ আউড়ে আবার চোখ বুজলেন।
ভদ্রলোকের সামনে দিয়ে এগিয়ে আমি সোফার শেষপ্রান্তে বসলুম। এতক্ষণে হালদারমশাই নস্যি নাকে গুঁজে কাগজ নামিয়ে রেখে মৃদুস্বরে বললেন,–আয়েন জয়ন্তবাবু, বয়েন। আপনাগোর সত্যসেবক পত্রিকায় আইজ তেমন কিসু নাই।
আমি চোখের ইশারায় প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললুম,–আছে। সবকিছু কি কাগজে ছাপা হয়!
আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–হ, ঠিক কইসেন।
ইতিমধ্যে ষষ্ঠি আমার জন্যে এক পেয়ালা কফি দিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম,–এবার ডিসেম্বরেও কলকাতায় শীতের দেখা নেই। ফ্যান চালাতে হচ্ছে।
আমার কথা শুনে সেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, আপনাদের কলকাতা শহরে এসে আমাকে সোয়েটার খুলতে হয়েছে। সোয়েটারের ওপর ওই দেখছেন একখানা শাল, তাও জড়ানো ছিল। আমাদের কালিকাপুরে গেলে কিন্তু শীতের কামড়ে আপনার হাড় নড়িয়ে দেবে।
কর্নেল তো তুম্বা মুখে চোখ বুজে কী ধ্যান করছেন, কে জানে।
কালিকাপুরের ভদ্রলোক কথা বলায় গুমোট ভাবটা কেটে গেল। জিগ্যেস করলুম,–আপনি কালিকাপুর থেকে আসছেন? সেটা কোথায়?
ভদ্রলোক বললেন, আজ্ঞে বেশি দূরে নয়, মোটে ঘণ্টাচারেকের ট্রেন জার্নি। স্টেশন থেকে নেমে এক্তাগাড়ি, সাইকেলরিকশা, বাস–সবই পাওয়া যায়। গঙ্গার ধারে আমাদের গ্রামটা এখন আর গ্রাম নেই। ইলেকট্রিসিটি এসেছে, টেলিফোন এসেছে, নিউ টাউনশিপ হয়েছে।
ভদ্রলোক আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ কর্নেল চোখ খুলে বললেন, আপনার বাড়িতে আপনার বাবা আর কাকা ছাড়া আর কে-কে থাকেন?
ভদ্রলোক বললেন, আমার এক বিধবা পিসি থাকেন। আমার মা তো অনেক বছর আগে মারা গিয়েছেন। কাকা বিয়ে করেননি। সাধুসন্ন্যাসীর মতো ওঁর চালচলন। আমরা ভাবি কবে হয়তো কাকা সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে যাবেন। অথচ আপনাকে বলেছি আমার বাবা রুগ্ণ মানুষ, বাড়ি থেকে বেরোতেই পারেন না। কিন্তু কাকার শরীর-স্বাস্থ্য খুব ভালো। নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন কিনা।
