আমরা মাঠ ঘুরে স্বর্গপুরীর পেছনে গেলুম। দুজনের সঙ্গেই টর্চ আছে। কর্নেল গতকাল এসেই বাড়ির চৌহদ্দি মুখস্থ করে ফেলেছেন দেখছি। অবশ্য বরাবর তার এসব ব্যাপারে খুব দক্ষতা দেখে আসছি। এবার আর টর্চ জ্বালতে নিষেধ করলেন। আমাকে ইশারা করলেন পেছনে আসতে। এদিকে নিচু পাঁচিল আছে। দোতলায় অনামিকার ঘরে লণ্ঠনের আলো দেখা যাচ্ছে। ওর দাদুর ঘরেও আলোর আভাস পেলুম বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে।
উত্তর পূর্ব কোণে গিয়ে কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, এখানে একটা মন্দির আছে। এস আমরা মন্দিরের কাছে যাই।
অন্ধকারে ততক্ষণে দৃষ্টি পরিষ্কার হয়েছে। মন্দিরটা পুরনো মনে হল। সামনের চত্বরে একটা আটচালার ওদিকে একটা ঝোপের আড়ালে দুজনে বসে রইলুম।
বসে আছি তো আছি। বাতাস বইছে। কিন্তু মশার উৎপাত প্রচণ্ড। একসময় ফিসফিস করে বললুম, এখানে আমরা বসে আছি কেন? মশার কামড়ে যে ঢোল হয়ে গেলুম ফুলে!
কর্নেল বললেন, চুপ!
অমনি দেখলুম, স্বর্গপুরীর দিক থেকে মাটির ওপর টর্চের আলো ফেলে কেউ এগিয়ে আসছে। সে মন্দির চত্বরে এসে একটু দাঁড়াল। এদিক ওদিক তাকাল। তারপর সটান গিয়ে মন্দিরে ঢুকল।
কর্নেল আমাকে খোঁচা মেরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে মন্দিরের দরজায় গিয়েই টর্চ জ্বেলে বললেন, ডিমদুটো আছে তো মুখুয্যে মশাই?
দেখলুম, বোঁ-ও করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অনামিকার দাদু। মুখ একেবারে সাদা হয়ে গেছে। আর ওঁর একটা হাতে একটা কালো চোঙ যেন।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, এই শিবলিঙ্গের নকলটা চমৎকার বানিয়েছেন কিন্তু। এবার দয়া করে ঘর থেকে আসল পাথরের শিবলিঙ্গটা এনে যথাস্থানে বসিয়ে দেবেন। আর এক কাজ করুন, হাট্টিম পাখির ডিম দুটো আমাকে দিন। তাহলে আর আপনাকে উদ্বেগ পোয়াতে হবে না। কেউ ভয় দেখাতেও আসবে না। ডিম দুটো সরকারের শুল্ক দফতরের প্রাপ্য নয় কি মুখুয্যে মশাই? হা—দিন, দিন। ও দুটো কাস্টমসকে ফেরত দিতে হবে।
নকল শিবলিঙ্গটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এগিয়ে দিলেন কালোবাবু। একেবারে হতবাক দশা ওঁর। পা দুটো কাঁপছে।
কর্নেল নকল কাঠের তৈরি শিবলিঙ্গ থেকে একটা কাগজের মোড়ক বের করে বললেন, আপাতত এই নকল শিবলিঙ্গ আগের মতো বসানো থাক। পরে আসলটা এনে বসিয়ে দেবেন। আসুন। আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়।
কালোবাবু গলার ভেতর থেকে বললেন, চলুন।
খিড়কি দিয়ে বাগানে ঢুকে আমরা সোজা বাড়ির দোতলায় ওঁর ঘরে গেলুম। অনামিকা সাড়া পেয়ে বেরিয়েছিল। প্রথমে অবাক হয়ে পরে একটু হেসে ফেলল। ওর দাদুর অবস্থা দেখেই।
কতক্ষণ চুপচাপ থাকার পর কালোবাবু বললেন, অনি! আমাদের চা এনে দে! গলা শুকিয়ে গেছে। তারপর কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন, আপনি কেমন করে জানলেন কে জানে! ব্যাপারটা জানতাম শুধু অনির মা আর আমি। আপনার তো জানার কথা নয়!
কর্নেল বললেন, তা ঠিক। তবে ব্যাপারটা অনুমান করতে আমাকে বিশেষ মাথা ঘামাতে হয়নি। ওই ছড়ার ভেতর ডিমের কথা আছে এবং আপনার ছেলে কাস্টমস অফিসার ছিলেন। তাকে স্মাগলাররা খুন করেছিল। দামি রত্নকে সাংকেতিক ভাষায় স্মাগলাররা ডিম বলে। কাজেই..
বাধা দিয়ে কালোবাবু বললেন, হ্যাঁ–দেবুর কাছে শুনেছি কথাটা। দেবুকে ওর নিউ আলিপুরের বসায় ফলো করে এসে গুলি করে পালায় ওরা। দেবুর বুকে গুলি লেগেছিল। বউমাকে সে মৃত্যুর আগে শুধু বলতে পেরেছিল, পকেটে দুটো জিনিস আছে। সামলে রাখো। আর কোনও কথা বলতে পারেনি। স্মাগলিং ঘাঁটি থেকে এই রত্ন দুটো উদ্ধার করে বাসায় আসছিল। তখন রাত প্রায় বারোটা।
তাহলে আপনার বউমা আপনাকে এ দুটো রাখতে দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ। কিন্তু আমার মাথায় আসেনি, এ জিনিস সরকারের ঘরে জমা দেওয়া উচিত।
আজ রাতে যদি ওরা আপনাকে ভয় দেখাতে না আসে, আর কোনওদিনই আসবে না। কারণ কাল সকালেই জয়ন্তদের কাগজে খবর বেরুবে। ওরা দেখবে পাচার করা রত্ন দুটো সরকারের ঘরে জমা পড়েছে। আর ফিরে পাওয়ার আশা নেই।
অনামিকা চা নিয়ে এল ট্রেতে, সবাইকে চা দিয়ে একপাশে বসল সে। তারপর বলল, পালকগুলো পরীক্ষা করেছেন কর্নেল?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। ওগুলো সিন্থেটিক ফাইবার দিয়ে তৈরি নকল পালক।
তাহলে ওই বিদঘুটে পাখিদুটোও নকল পাখি?
তা আর বলতে? ওরা ভেবেছিল, বুড়োমানুষ—তাকে এভাবে ভূতের ভয় দেখালে ডিম দুটো ফেরত পেতে অসুবিধে হবে না।
কালোবাবু রাগ দেখিয়ে বললেন, আমি ন্যাকা, না বুদ্বু? এদুটো দামি জিনিসকে সত্যি সত্যি হাট্টিমাটিমের ডিম ভেবে ফেরত দিতে চাইব?
ওরা তাই ভেবেছিল। রিটায়ার্ড স্টেশনমাস্টার। ৭৫ বছর বয়স। তিনি কি আর রত্ন চিনতে পারবেন? তাছাড়া রত্ন দুটো দেখুন, অবিকল সাদা ডিম যেন।
আমি বললুম, সব বুঝলুম। কিন্তু দোতলার ওই জানালায় অত উঁচুতে নকল পাখি নিয়ে কীভাবে উঠত ব্যাটাচ্ছেলেরা?
কর্নেল চাপা গলায় বললেন, আমার নাক গলানোতে ওরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে—আজ তার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছে। আমার ধারণা, ওরা মরিয়া হয়ে সম্ভবত আজ রাতেই শেষ চেষ্টা করবে।
কালোবাবু লাঠি ঠুকে বললেন, আসুক না! ছাতু করে দেব। দেবুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। জয়ন্ত তুমি থাকো। আমি একবার চুপিচুপি থানা থেকে আসছি। দেখি, লালবাজারের ওঁরা থানায় এসে গেছেন নাকি। আমি খিড়কি দিয়ে বেরুব। অনি, তুমি তোমাদের কানাইকে বললা, খিড়কির দরজাটা আটকে দিয়ে আসবে।..
