ওঁদের এসব কথা বুঝতে পারছিলুম না। একটু পরে মোনাঠাকুর চায়ের সরঞ্জাম নিতে এসে হালদারমশাইকে দেখে কেন কে জানে মুচকি হেসে চলে গেলেন। তারপর এল হরিপদ। সে হালদারমশাইকে দেখে গম্ভীর মুখে বলল,আপনি আবার এসেছেন বাবুমশাই! আবার ঝামেলা বাধবে।
বলে সে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিল। কর্নেল বলবেন,–তোমার কর্তাবাবুদের কাজ শেষ হয়নি হরিপদ?
–হয়েছে আজ্ঞে! ছোটবাবু আমাকে ঘরে আলো জ্বেলে দিতে বললেন। ওনারা এক্ষুনি এসে যাবেন।
সে চলে যাওয়ার একটু পরে দুই ভাই ঘরে ঢুকলেন। তারপর গোয়েন্দাপ্রবরকে দেখে দুজনেই থমকে দাঁড়ালেন। সুরঞ্জনবাবু গম্ভীরমুখে বললেন, আপনি আবার এসেছেন? কর্নেলসায়েব! ওঁকে চলে যেতে বলুন!
সুদর্শনবাবু দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন,–কেলেংকারি হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি! কর্নেলসায়েবের খাতিরে গায়ে হাত তুলছি না। বেরিয়ে যান বলছি। নইলে গোবিন্দকে ডাকব।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনারা মিঃ হালদারের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করেছিলেন। কিন্তু লিখিতভাবে কন্ট্রাক্ট বাতিল করেননি। প্রাইভেট ডিটেকটিভদের ব্যাপারে একটা সরকারি আইন আছে। আমাকে মিঃ হালদার বলছিলেন, কারণ দেখিয়ে কন্ট্রাক্ট বাতিল করতে হয়। তা না হলে উনি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
সুরঞ্জনবাবু বাঁকা হেসে বললেন, ঠিক আছে। আপনি যখন বলছেন, তা-ই করছি। নান্টু! একটা কাগজ এনে দাও।
সুদর্শনবাবু বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল এবার গম্ভীরমুখে বললেন, একজন স্থানীয় বিশিষ্ট লোককে ডাকতে হবে। তিনি কন্ট্রাক্ট বাতিলের কাগজে সাক্ষী হিসেবে সই করবেন। আপনার বন্ধুদের মধ্যে তেমন কেউ নিশ্চয় আছেন?
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–এমন আইন আছে নাকি?
-আছে। আপনি পুলিশকে ফোন করে জেনে নিতে পারেন।
সুদর্শনবাবু এক্সারসাইজ খাতার একটা পাতা ছিঁড়ে এনে সুরঞ্জনবাবুকে দিলেন। সুরঞ্জনবাবু বললেন–নান্টু! কর্নেলসায়েব বলছেন, কন্ট্রাক্ট বাতিলের কাগজে কোনো বিশিষ্ট লোককে সাক্ষী রাখতে হবে। এই নাকি আইন।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ সুদর্শনবাবু! বরং আমার কথা যাচাই করতে থানায় টেলিফোন করুন। পুলিশকে বলুন আমি এখানে আছি। না-না! নিঃসন্দেহ হওয়া উচিত। আপনি ফোন করে আসুন।
লক্ষ করলুম, কর্নেল সুদর্শনবাবুর দিকে তাকিয়ে কথা বলার সময় চোখের ভঙ্গিতে যেন কী ইশারা করলেন। সুদর্শনবাবু ফোন করতে যাচ্ছেন দেখে সুরঞ্জনবাবু বললেন,–নান্টু! বাঙ্কুবাবুকেও একটা ফোন করে এখনই আসতে বলো! ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকছে। বাঙুরও আসা দরকার।
একপ্রান্তে সুরঞ্জনবাবুর অ্যাডভোকেট কাকার সেক্রেটারিয়েট টেবিল আছে। উল্টোদিকের চেয়ারে বসে তিনি বললেন,–বলুন কর্নেলসায়েব! কী লিখতে হবে।
কর্নেল বললেন,–বেশি কিছু না। বাংলায় লিখলেও চলবে। স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লিখুন : প্রাইভেট ডিটেকটিভ শ্রী কে. কে. হালদার মহাশয়ের সহিত আমাদের গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর গহনা উদ্ধারের জন্য যে চুক্তি করিয়াছিলাম, তাহা এতদ্বারা বাতিল করিলাম। কারণ তিনি এই কার্য করিতে গিয়া আমাদের পরিবারে অহেতুক মনোমালিন্য ও বিরোধ বাধাইয়া সমস্যার সৃষ্টি করিয়াছেন।
কর্নেলের এইসব কথা লিখতে সুরঞ্জনবাবুর মাত্র মিনিট পাঁচেক সময় লাগল। কাগজটা তিনি কর্নেলকে দিয়ে বললেন,–বাইশ বছর স্কুলমাস্টারি করেছি কর্নেলসায়েব! আশা করি বানান ভুল নেই!
কর্নেল কাগজটা তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন,–এর তলায় তারিখ দিয়ে আপনি ও সুদর্শনবাবু সই করবেন। বাঁদিকে সাক্ষী সই করবেন।
সুদর্শনবাবু একটু পরে ফিরে এলেন। বললেন,–ও. সি. থানায় ছিলেন। তিনি বললেন, আইনে এইরকম ব্যবস্থা আছে!
সুরঞ্জনবাবু বললেন–বাঙ্কুবাবুকে পেলে?
-হ্যাঁ। উনি এক্ষুনি আসছেন।
–এসো। আমি সই করেছি। তুমি তলায় সই করো। তারিখ লিখে দিয়ে।
দুজনে সই করার পর কর্নেল একটু হেসে বললেন,–মিঃ হালদার পূর্ববঙ্গের লোক। ওঁর সামনেই বলছি। একসময় পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। ওঁর দাপটে চোর-ডাকাতরা এলাকা ছেড়ে পালাত। আইনকানুন ওঁর মুখস্থ। উনি হঠাৎ এসে পড়বেন জানতুম না। এসেই আমাকে বলছিলেন, ক্ষতিপূরণের কে করবেন আপনাদের বিরুদ্ধে। আমি ওঁকে বুঝিয়ে শান্ত করেছি।
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–কাল রাত্রে ঝন্টু ট্রাঙ্ককলে বলছিল, আপনাকে যেন এই কেসের দায়িত্ব দিই। আপনার সঙ্গে কি কন্ট্রাক্ট করতে হবে?
-নাঃ! সুদর্শনবাবু! আপনি বসুন। মিঃ হালদারের সঙ্গে নিষ্পত্তি হয়ে গেলে আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলব। তো বাঙ্কুবাবুর বাড়ি কতদূরে?
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–তত কিছু দূরে নয়। ওই মোটরসাইকেলের শব্দ শুনছি। হরিপদ! ও হরিপদ!
হরিপদ দরজায় উঁকি মেরে বলল,–আজ্ঞে বড়বাবু!
-–গেট খুলে দে। বাঙ্কুবাবু আসছেন মনে হচ্ছে।
একটু পরে বাইরে মোটরসাইকেলের শব্দ থেমে গেল। সুরঞ্জনবাবু উঠে গিয়ে বললেন, –এসো বাঞ্ছু! বড্ড ঝামেলায় পড়ে গেছি।
তার সঙ্গে বেঁটে স্থূলকায় একজন ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। কর্নেলকে দেখেই উনি থমকে দাঁড়ালেন।–এঁরা কারা?
–কলকাতা থেকে ঝন্টু এঁদের পাঠিয়েছেন। উনি কর্নেলসায়েব! পরে বলছি।
–ডিটেকটিভদ্রলোক আবার এসে ঝামেলা পাকিয়েছেন?
সুরঞ্জনবাবু কাগজটা তাঁকে দেখিয়ে বললেন, এখানে তুমি উইটনেস হিসেবে একটা সই দাও বাঞ্ছু! নান্টু থানায় ফোন করেছিল। ও. সি. সায়েব বলেছেন এটাই নাকি আইন।
