–আপনি বসুন!
–বসব। তা যা বলছিলুম। কাকাবাবু আসলে ভাবতেন, কনকপুর ছেড়ে দূরে থাকলে বাবা একা সব সম্পত্তি ভোগ করবেন।
–আপনার কাকাবাবুর ফ্যামিলি?
–সেটাই বলতে যাচ্ছিলুম। খুব ট্র্যাজিক ঘটনা। অ্যাকসিডেন্টের সময় তার গাড়িতেই কাকিমা আর তার ছেলে ছিল। বছর তিনেক বয়স। কাকিমার বাপের বাড়ি চণ্ডীতলায় পৌঁছে দিয়ে কাকাবাবুর কৃষ্ণনগর যাওয়ার কথা ছিল। আর কী বলব?
সুরঞ্জনবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, আপনারা বসুন! আমি আসছি।
তিনি ভিতরের দরজা দিয়ে চলে গেলেন। দেখলুম, ভোঁদা দরজার পাশে হাঁটুমুড়ে বসে আছে। কর্নেল ঘরের ভিতরটা দেখছিলেন। আস্তে বললেন, এই আইনের বইগুলোর দাম অন্তত সে-আমলেই লক্ষাধিক টাকা। এত বই! অথচ ভদ্রলোক এখানে বসেই ওকালতি করতেন!
বললুম,–এই এরিয়ার সব মক্কেল নিশ্চয় ওঁর হাতে ছিল।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে চাপাস্বরে বললেন, নাকি পূর্বপুরুষের মহালক্ষ্মীর জুয়েলস ওঁর এখানে থাকার কারণ? জয়ন্ত! সম্ভবত সুদর্শনবাবু জানেন না, দু-জোড়া চাবি ওঁর ঠাকুরদাই তার দুই ছেলের জন্য তৈরি করিয়েছিলেন।
বলে তিনি ছবিগুলো দেখতে গেলেন। ডাইনে ও বাঁয়ে আলমারির ওপরে উঁচুতে ছবিগুলো টাঙানো আছে। আর আলমারিগুলোর জন্য দুপাশের দেওয়াল ঢাকা পড়েছে। ওদিকে সম্ভবত কোনো জানলা নেই। কর্নেল ছবিগুলো দেখার পর সোফায় এসে বসলেন।
সেইসময় হন্তদন্ত হয়ে সুদর্শনবাবু ঘরে ঢুকলেন। কী আশ্চর্য! নমস্কার কর্নেলসায়েব! আপনি আসছেন না! এদিকে আপনার প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোক কাল একটা ঝামেলা বাধিয়ে এক কাণ্ড করে বসেছিলেন।
–কী কাণ্ড বলুন তো?
–এ বাড়ির কে নাকি ওঁকে গোপনে বলেছে, তিনবছর আগে আমার ঘরের তালা আমি নাকি নিজেই ভেঙেছিলুম। কিন্তু তার চেয়ে সাংঘাতিক কথা–গত মহালয়ার আগের দিন শৈলবালা পাঁচিলের কাছে একটা সাপ দেখে চ্যাঁচামেচি করছিল। তখন আমি নীচে নেমে গিয়েছিলুম। সেইসময় দাদা নাকি আমার ঘর থেকে আমার ছড়িটা নিয়ে সাপ মারতে আসছিল। হালদারবাবুকে কে এসব কথা বলেছে, জানি না। আমার মেজাজ তো জানেন! আপনাকে অলরেডি বলেছি সে কথা!
–আপনি আপনার দাদাকে চার্জ করে বসলেন?
-হ্যাঁ। তারপর দু-ভায়ে প্রায় হাতাহাতির উপক্রম। সেই সময় বাঞ্ছুদা নামে এক ভদ্রলোক–দাদার বন্ধু উনি এসে পড়ে মিটিয়ে দিলেন। ডিটেকটিভদ্রলোকের পরিচয় দিতুম না। কিন্তু রাগের বশে–বুঝতেই পারছেন!
-বাঞ্ছুবাবুই কি মিঃ হালদারকে চলে যেতে বললেন?
-উনি কী করে বলবেন? উনি দাদাকে যত, আমাকে তত বকাবকি করে চলে গেলেন। পুলিশ যা পারল না, একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ তা পারে? বাঞ্ছুদা ঠিকই বলেছেন মনে হল। সাপ মারবার জন্য দাদা আমার ঘর থেকে মোটা বেতের ছড়িটা আনতে যেতেও পারেন, এই ভেবে আমি দাদাকে খামোকা চার্জ করেছিলাম। কারণ সাপটা হরিপদ মারার পর আমার ঘরে গিয়ে ছড়িটা ব্র্যাকেটে একই অবস্থায় ঝোলানো দেখেছিলুম।
–আর সেই চাবির চাপা শব্দ শুনতে পেতেন তো!
–হ্যাঁ। বিকেলে ক্লাবে যাওয়ার সময় অভ্যাসমতো শব্দটা টের পেয়েছি।
–বাড়ির লোকেদের আপনারা জিজ্ঞেস করেননি, কে মিঃ হালদারকে এসব কথা বলেছে।
–করব না আবার? প্রত্যেকে মহালক্ষ্মীর দিব্যি কেটে বলেছে, সে বলেনি।
এইসময় শীর্ণকায় যে লোকটি চা-টা নিয়ে এলেন, তিনিই মোনাঠাকুর। সুদর্শনবাবু তাকে বললেন,–চা না কফি?
ঠাকুরমশাই বললেন,–বড়বাবু চা পাঠাতে বলেছিলেন! বলে তিনি চলে গেলেন।
সুদর্শনবাবু বললেন,–সরি কর্নেলসায়েব! আমার ঘরে আপনার জন্য কফি এনে রেখেছি।
–ঠিক আছে। চা-ই খাওয়া যাক। আপনার পুকুরে মাছ ধরার কাজ শেষ হয়েছে?
–দাদাকে যেতে বললুম। মাছের ব্যাপারীকে ওজন করে দিতে হবে। এদিকে আপনারা এসেছেন। এ বেলা দু-মুঠো–
বলে তার চোখ পড়ল ভোঁদার দিকে।–এই! কে রে তুই?
কর্নেল বললেন,–ইরিগেশন বাংলোয় কাজ করে ছেলেটা। আমি সঙ্গে এনেছি। কিছু কেনাকাটার ব্যাপার ছিল। তো আপনার কি মাছের ব্যাপারীর কাছে যাওয়া দরকার?
–একটুখানি দরকার বইকি। আপনারা চা খান। আমি শিগগির আসছি।
বলে সুদর্শনবাবু আবার হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। চায়ের কাপ হাতে কর্নেল উঠে গিয়ে আবার সেই ছবিগুলো দেখতে-দেখতে কখনও একটু থেমে, কখনও কয়েক-পা এগিয়ে আবার পিছিয়ে এসে একটু থেমে, ডাইনে থেকে বাঁদিকে ঘোরাঘুরির পরে সোফায় এসে বসলেন। আমি বললুম,–ছবিগুলো আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কেন বলুন তো?
কর্নেল সে-প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, তুমি বেরিয়ে গিয়ে গেটের ওখানে একটু দাঁড়িয়ে চলে এসো। গেট খুলে রাখবে। হালদারমশাই না এসে পড়লে নাটক জমবে না।
একটু দ্বিধার সঙ্গে তার নির্দেশ পালন করতে গেলুম।…
.
গোয়েন্দাপ্রবর ঘরে ঢুকে সোফার এককোণে বসলেন। তারপর কর্নেলকে দেওয়ালে টাঙানো একটা বিশাল ছবি দেখিয়ে বললেন,–রায়বাহাদুর!
কর্নেল বললেন,–বাঁ-দিকে তিননম্বর বলেছিলেন আপনি!
হালদারমশাই বললেন,–ঘরে আলো জ্বালে নাই ক্যান? ওনারা কই গেলেন?
–পুকুরের ধারে মাছ ধরিয়ে বিক্রি করছেন।
হালদারমশাই অমনই উঠে ছবিটার কাছে গেলেন। তখনই ফিরে এসে বললেন,–ভুল করছিলাম। চাইর নম্বর। রাত্রে এটুখানি দেখা। হঃ! রায়বাহাদুর। সুদর্শনবাবু আগের দিন কইছিলেন, ওনার ঠাকুরদার ঠাকুরদা রায়বাহাদুর ছিলেন।
