–রমেনবাবু! এর নাম ভোঁদা। আমার ভাগ্য! একজন বিশ্বস্ত সহযোগী পেয়ে গেছি।
রমেনবাবু হাসতে-হাসতে বললেন,–আমরা পিছনে বসছি! জয়ন্তবাবু! মিঃ হালদার! আমাদের পিছনে বসতে হবে। ভোঁদা! তোর হাতে ওটা কী?
কর্নেল বললেন,–অ্যাটম বোমা রমেনবাবু! ওটা ছোঁবেন না প্লিজ!
কর্নেল সামনে বসলেন। আমরা পিছনে। এই জিপগাড়িটা গত রাতেরটা নয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের কাছে পৌঁছে গেলুম। আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা বাঁদিকে বাঁক নিয়ে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই আমাদের গাইড।
হালদারমশাই বললেন,–আপনারে যা কইছি কর্নেলস্যার! একটু দূরের থেইক্যা বাড়িখান দেখাইয়া দিমু। আমারে দেখলে ওনারা হয়তো আবার ইনসাল্ট করবেন!
–ঠিক আছে। তবে আপনাকে যেতে হবে ও-বাড়ি। আপনি লক্ষ রাখবেন। জয়ন্ত একসময়ে বেরিয়ে একটুখানি দাঁড়াবে। আপনি ঠিক তখনই সোজা গিয়ে ঢুকবেন।
খেলার মাঠের ডানদিক ঘুরে ছোট রাস্তা, তারপর বড় রাস্তা দিয়ে মিনিট দশেক হাঁটার পর হালদারমশাইয়ের নির্দেশমতো বাঁদিকে ঘুরে কিছুটা এগিয়ে গেলুম। এদিকটা কনকপুরের শেষপ্রান্ত মনে হচ্ছিল। একটা বিশাল বটগাছের তলায় শিবমন্দির। সেখানে দাঁড়িয়ে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,–ডাইনে রাস্তায় আউগাইয়া কারেও জিগাইবেন। গেট আছে। পুরানো দোতলা বাড়ি। উঁচা বাউন্ডারিওয়াল আছে। দ্যাখলেই বোঝবেন। গেটে ‘রায়ভবন’ লেখা আছে। আর কী কমু?
ডাইনে রাস্তাটা একসময় পিচে মোড়া ছিল। এখন খানা-খন্দে শ্রীহীন অবস্থা। পশ্চিমে এগিয়ে বাড়িটা চোখে পড়ল। দক্ষিণমুখী পুরোনো দোতলা বাড়ি। মাঝামাঝি গেট। ফাটলধরা গেটের মার্বেলফলকে ‘রায়ভবন’ লেখা। ওপরে বুগেনভেলিয়ার ঝাপি। গেটের মরচে ধরা গরাদের সামনে কর্নেল দাঁড়াতেই একটা লোক এসে বলল,–সায়েবদের কোথা থেকে আসা হচ্ছে আজ্ঞে?
কর্নেল বললেন, কলকাতা থেকে। সুদর্শনবাবুকে খবর দাও!
–ছোটবাবু ওদিকে পুকুরের মাছ ধরাচ্ছেন সার! বড়বাবুকে ডাকব?
–তাই ডাকো। ওপর থেকে কেউ বলল,–কে রে হরিপদ?
–বড়বাবু! এনারা কলকাতা থেকে এসেছেন।
বুগেনভেলিয়ার ঘন ঝাপির জন্য গেট থেকে দোতলা দেখা যাচ্ছিল না। কর্নেল বললেন,–এই কার্ডটা নিয়ে গিয়ে বড়বাবুকে দেখাও হরিপদ।
হরিপদ গেট খুলল না। গরাদের ফাঁক দিয়ে সে কর্নেলের হাত থেকে তাঁর নেমকার্ড নিয়ে চলে গেল। বললুম,–অদ্ভুত তো!
কর্নেল হাসলেন।–অদ্ভুত কিছু নয়। মুখ বুজে থাকবে।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এবং গায়ে শালজড়ানো একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখা গেল। তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন,–নমস্কার! নমস্কার! তা হলে সত্যিই কর্নেলসায়েবের পায়ের ধুলো পড়ল রায়বাড়িতে? ও হরিপদ! গেট খুলিসনি কেন হতভাগা! সায়েবকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস?
হরিপদ গেট খুলল। আমরা ভিতরে ঢুকলুম। কর্নেল বললেন, আপনি সুরঞ্জনবাবু?
–হ্যাঁ কর্নেলসায়েব! ইনি বুঝি সেই সাংবাদিক ভদ্রলোক? গত রাত্রে কলকাতা থেকে ঝন্টু ট্রাঙ্ককল করেছিল। আপনি পৌঁছেছেন কি না জিজ্ঞেস করছিল। আরে! এটা আবার কে?
কর্নেল বললেন, আমি ইরিগেশন বাংলোয় উঠেছি। ছেলেটি সেখানে কাজ করে। আমাদের রায়ভবন চিনিয়ে দেবে বলে একে নিয়ে এলুম। এর নাম ভোঁদা!
সুরঞ্জনবাবু বললেন,–অ্যাই ভোঁদা! বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছিস, বেশ করেছিস! তা সায়েবদের সঙ্গে তুই ঢুকলি কেন? বেরো বলছি!
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ভোঁদা আমার সারাক্ষণের সঙ্গী। আসবার পথে কিছু কেনাকাটা করেছি। ওর চটের ব্যাগে রাখা আছে।
সুরঞ্জনবাবু ঘুরে বললেন,–হরিপদ! হাঁ করে কী দেখছিস! বসবার ঘরের দরজা খুলে দে শিগগির! আসুন কর্নেলসায়েব! আর আপনার নামটা কী যেন?
আমি পকেট থেকে আমার একটা নেমকার্ড বের করে দিলুম। উনি পড়ে দেখে বললেন, হ্যাঁ, জয়ন্ত চৌধুরি। ঝন্টুই বলেছিল। আসুন! দেখতেই পাচ্ছেন, কী অবস্থায় বেঁচে আছি। স্কুল থেকে রিটায়ার করেছি দুবছর আগে। এখনও পেন্ডিং-এর ফাইল আটকে আছে। ভাগ্যিস কিছু জমিজমা, বাগান-পুকুর বাবা রেখে গিয়েছিলেন।
গাড়িবারান্দা দেখে বোঝা গেল, একসময় রায় পরিবারের গাড়ি ছিল। গাড়িবারান্দার তলা দিয়ে কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে গোলাকার ছোট্ট বারান্দায় উঠলুম। হরিপদ দরজা খুলে দিয়েছিল ততক্ষণে। ভিতরে ঢুকে দেখি প্রশস্ত একটা ঘর। একপাশে পুরোনো সোফাসেট। দেওয়ালে টাঙানো; পূর্বপুরুষদের অয়েলপেন্টিং অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তারপর চোখে পড়ল দুদিকের দেওয়াল ঘেঁষে কয়েকটা আলমারি। তাতে বাঁধানো প্রকাণ্ড সব বই ঠাসা আছে। কর্নেল সোফায় বসে বললেন–আপনার কাকা ওকালতি করতেন শুনেছি। আইনের বইগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।
সুরঞ্জনবাবু বললেন, হ্যাঁ। কাকাবাবু কৃষ্ণনগর জনকোর্টে অ্যাডভোকেট ছিলেন। তাঁর গাড়ি ছিল। এখান থেকে গাড়িতে যাতায়াত করতেন। বাইশ কিলোমিটার দূরত্ব। বাবা নিষেধ করতেন। কৃষ্ণনগরে একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে পরামর্শ দিতেন। কিন্তু কাকা একটু জেদি মানুষ ছিলেন। আমাদের বংশের এই রোগটা আছে। তো শেষ অব্দি গাড়িই তাঁকে খেল।
–অ্যাকসিডেন্ট?
–হ্যাঁ। হরিপদ! বললুম না নান্টুকে খবর দে! আর মোনাঠাকুরকে বলে যা, সায়েবদের জন্য চা-টা শিগগির নিয়ে আসে যেন।
