মিঃ ভাদুড়ি হাসলেন। আবার বলছি, অবাক হচ্ছি না স্যার! পুলিশ সুপার মিঃ রাজেশ কুমার আমাকে প্রায় হুমকি দিয়ে রেখেছেন, আপনার কাছে যা-কিছুই শুনি, যেন মাথা ঠিক রাখি। মাই গুডনেস! এক মিনিট স্যার! আপনাকে একটা ডায়রি করতে বলেছিলুম। ভুলে গেছি। স্বার্থটা আমারই। একটা আইনগত ভিত্তি থাকা দরকার।
তিনি টেবিলের কাছে গিয়ে একটা প্যাড টেনে নিলেন। আপনি সংক্ষেপে চিঠির মতো করে ঘটনাটা লিখে দিয়ে সই করুন। আমাকে অ্যাড্রেস করে লিখবেন। ততক্ষণে আমি রমেনবাবুকে জিপের ব্যবস্থা করতে বলি।…
সেচবাংলোয় ফিরে গিয়ে দেখি, হালদারমশাই নীচের ঘরে সোফায় বসে আছেন। পাশে একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগ। আমাদের দেখে তিনি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন–ওপরে চলেন কর্নেলস্যার। সব কইতাছি।
দোতলায় আমাদের ঘরে ঢুকে তিনি শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বললেন, সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ দুই ভাইয়ে কী লইয়া ঝগড়া বাধছিল। আমি থামাইতে গেছলাম। দুইজনেই আমারে কইলেন, ওনাগো ডিটেকটিভের দরকার নাই। আমিই নাকি ওনাগোর মইধ্যে গণ্ডগোল বাধাইতে আইছি। কর্নেলস্যার! আমারে অকারণে দুইজনে ইনসাল্ট করল। হেভি মিস্ত্রি!…
হালদারমশাইয়ের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল আমাদের পাশের ঘরে। সকাল আটটায় বাসুদেব ঠাকুর বেড-টি এনে আমার ঘুম ভাঙিয়েছিলেন। তিনি বললেন,–বড়সায়েব আর হালদারসায়েব ভোরবেলা বেড়াতে বেরিয়েছেন। ভোঁদাকে সঙ্গে নেননি বলে বেচারা মনমরা হয়ে বসে আছে।
ঠাকমশাই হাসতে-হাসতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বেড-টি খেতে-খেতে মনে পড়েছিল গত রাত্রে কর্নেল ও. সি. মিঃ ভাদুড়িকে আজ সকাল দশটা থেকে তৈরি থাকতে বলেছেন। যে-কোনো সময়ে তাকে সদলবলে রায়বাড়ি যেতে হতে পারে। তা হলে কি আজ হালদারমশাই-কথিত ‘হেভি মিস্ট্রি’-র পর্দা তুলবেন কর্নেল?
উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠেছিলুম। বাথরুম সেরে সেজেগুজে বারান্দায় গিয়ে বসেছিলুম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ও গোয়েন্দাপ্রবরকে গেটে ঢুকতে দেখলুম। ওপরে এসে কর্নেল অভ্যাসমতো সম্ভাষণ করলেন, মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
বললুম,–মর্নিং কর্নেল! হাড়কাঁপানো শীতের ভোরে হালদারমশাইকে ওয়াটারড্যামের হিম খাইয়ে জব্দ করেছেন। তাই না হালদারমশাই?
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন,–আমাদের জব্দ করে কেডা? পঁয়তিরিশ বৎসরের পুলিশ-লাইফে অনেক ড্যাঞ্জারাস হিম খাইছি।
তিনি আমার পাশের চেয়ারে বসলেন। কর্নেল ঘরে ঢুকে গেলেন। বললুম,–প্রাতঃকৃত্য করবেন না?
–প্রাতঃকৃত্য কইরাই বাইরাইছিলাম।
চুপি-চুপি বললুম,–কর্নেল বলেননি, আজ দশটায় রায় বাড়ি যাবেন?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসিমুখে বললেন,–ওয়েট অ্যান্ড সি।
একটু পরে ভোঁদা কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে এনে টেবিলে রাখল। তার মুখটা বেজায় গম্ভীর। সে চলে যাচ্ছিল। কর্নেল বেরিয়ে এসে ডাকলেন,–ভোঁদা! তুমি খেয়েদেয়ে তৈরি থেকো। আমরা সাড়ে ন’টা নাগাদ বেরুব। আর শোনো! আমাকে যে জিনিসগুলো দেখিয়েছিলে, সেগুলো একটা চটের ব্যাগে ঢুকিয়ে নেবে। রাত্রে সুখরঞ্জনবাবুকে বলে রেখেছি। তার কাছে চটের থলে পেয়ে যাবে।
ভোঁদার মুখে হাসি ফুটল। সে বলল,–সুকুবাবু কঁকপুরে পাঁজা কঁত্তে না? ছাঁইকেঁলে না?
–বুঝেছি। নটার মধ্যে উনি এসে যাবেন।
ভোঁদা থপথপ করে চলে গেল। বললুম,–কী ব্যাপার? ভোঁদা চটের ব্যাগে কী নেবে?
কর্নেল চেয়ারে বসে কফির পেয়ালা তুলে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন,–হেভি মিস্ট্রি! কী বলেন হালদারমশাই?
গোয়েন্দাপ্রবর শুধু বললেন,–হঃ!….
বেলা ন’টায় কর্নেলের নির্দেশমতো তৈরি হয়ে নীচে ডাইনিংরুমে গেলুম। আমাদের ব্রেকফাস্টের সময় সুখরঞ্জনবাবু সাইকেলে থলে ভর্তি বাজার করে ফিরলেন। তিনি হাসিমুখে ঘোষণা করলেন,–ঠাকমশাই! আজ সায়েবদের পাতে তাবড় তাবড় পাবদা মাছ সার্ভ করতে পারবেন। ভাগ্যিস, কেতো-জেলেকে বাজারে ঢোকার মুখেই ধরে ফেলেছিলুম।
ভোঁদা বলল,–সুকুবাবু! হুঁ-হঁ-হঁটের ব্যা–
সুখরঞ্জনবাবু কপট চোখ রাঙিয়ে বললেন,–এই ভোঁদড়টাকে নিয়ে পারা যায় না!
ব্রেকফাস্টের পর আমরা বেরিয়ে পড়লুম। ভোঁদার হাতে চটের থলেতে কী আছে কে জানে! সে যে কর্নেলের কাছ ঘেঁষে ভালুকের মতো হেঁটে চলল। আমরা প্রায় অর্ধেক রাস্তায় পৌঁছেছি, একটা জিপগাড়ি আসতে দেখলুম। কাছাকাছি এসে গাড়িটা দাঁড়াল। সাব-ইন্সপেক্টর রমেনবাবু নেমে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাতে নির্দেশ দিলেন। তারপর কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–ও. সি. সায়েব আপনাকে খবর দিতে বলেছেন, যে লোকটার কথা আপনি বলেছিলেন, তাকে গত রাত্রে তিনটে নাগাদ অ্যারেস্ট করা হয়েছে।
–কোথায়?
–কৃষ্ণগঞ্জে। আমাদের সোর্স তাকে পরশু বিকেলে বাসস্ট্যান্ডে কৃষ্ণগঞ্জের বাসে চাপতে দেখেছিল। সেখানে ওর একটা ডেরা আছে।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–হালদারমশাই! আপনি খুশি হতে পারেন।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, আমি যার কথা কইছিলাম, সে ধরা পড়ছে?
–হ্যাঁ। ঠিক আছে রমেনবাবু! আমরা পায়ে হেঁটেই যাব। আপনি মিঃ ভাদুড়িকে আমার ধন্যবাদ জানাবেন।
রমেনবাবু বললেন,–গাড়ি থাকতে হাঁটবেন কেন স্যার?
–একটু সতর্কতা দরকার।
–বেশ তো! পাওয়ার সাবস্টেশনের কাছে আপনাদের নামিয়ে দিয়ে যাব। বলে রমেনবাবু ভোঁদার দিকে তাকালেন। এ কোথায় যাবে? মনে হচ্ছে, ইরিগেশন বাংলোতে একে দেখেছি।
