মিঃ ভাদুড়ি হেসে উঠলেন। কর্নেল বললেন, আপনাদের কি সে বলেছে, কোন লোকটার কথা সে ভেবেছিল?
মিঃ ভাদুড়ি আরও হাসলেন। তারপর বললেন,–শৈলবালা ভেবেছিল সুদর্শনবাবুই তাকে সিঁড়িতে ধাক্কা মেরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বিদ্যুৎ আসার পর তিনিই নাকি বাড়ি ফিরে এসে হইচই বাধান!
কর্নেলও হাসলেন। –নিজেই নিজের ঘরের তালা কেন ভেঙেছিলেন সুদর্শনবাবু, এ বিষয়ে শৈলবালার কী ধারণা?
-আপনাকে বলেছি, শৈলবালার সন্দেহ অনুসারে সুদর্শনবাবুই চোর। জেরার পর শৈলবালা বলেছে, আগে থেকে নিজেকে–শৈলবালার ভাষায় ‘নিদুষি’–অর্থাৎ নির্দোষ সাব্যস্ত করে রাখার মতলবে কাজটা তাদের ছোটবাবু করে থাকতে পারেন।
-ছোটবাবু, মানে সুদর্শনবাবু?
-হ্যাঁ। শৈলবালার কথার অর্থ দাঁড়ায় : এভাবে একটা ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করে রেখেছিলেন ছোটবাবু! পয়েন্টটা অবশ্য উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
হুঁ৷ যায় না।–কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন।–এর সঙ্গে কাঞ্চন সেনের সম্প্রতি কনকপুরে আসার ব্যাপারটা জুড়ে দিলে একটা কেস দাঁড় করানো যায়!
মিঃ ভাদুড়ি আস্তে বললেন, আপনি কাঞ্চন সেনের ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে এসেছেন বলে আমার ধারণা। ভদ্রলোক কলকাতার এক বিখ্যাত জুয়েলারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন।
–চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানির এজেন্ট ছিলেন। চোরাই জুয়েলস কেনা-বেচার যোগসূত্র এই এজেন্টরা। মিঃ ভাদুড়ি! কাঞ্চন সেন এখানে এসে রায়বাড়িতে ওঠেননি, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
–আপনি সিওর?
–হ্যাঁ, আমার হাতে তথ্য আছে, কাঞ্চন সেন গত শুক্রবার এসে সেদিনই কলকাতা ফিরে যান। তারপর আবার শনিবার এখানে আসেন এবং সেদিনই কলকাতা ফিরে যান। রবিবার সন্ধ্যায় তাকে মার্ডার করা হয়। আগেই বলেছি, তার চেনা লোক তাঁকে মার্ডার করেছে।
–খুনিকে আজ রাত্রেই ধরে ফেলব।
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,–অবশ্য যদি সে কনকপুরে থাকে!
–দেখা যাক।
–কাঞ্চন সেনের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আমার একটা অতিরিক্ত দায়িত্ব আছে। আমি অনুশোচনায় ভুগছি মিঃ ভাদুড়ি! সেই কারণে তার খুনি শিগগির ধরা পড়ুক, এটা আমি চাই। হাতের কার্ড আমি নাকি পুলিশকে দেখাই না বলে পুলিশমহলে একটা ধারণা আছে। আমি আপনাকে অন্তত এ ব্যাপারে আমার হাতের কার্ড দেখাতে চাই।
মিঃ ভাদুড়িকে বিস্মিত লক্ষ করছিলুম। আমিও বিস্মিত। কারণ কর্নেলের মধ্যে এমন ভাবাবেগ আমি কখনও দেখিনি। মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–বলুন স্যার! আমার পক্ষ থেকে যতটা করা সম্ভব আমি করব।
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে কাঞ্চন সেনের সেই কার্ডটা মিঃ ভাদুড়িকে দেখতে দিলেন। তারপর তিনি কার্ডটা ফেরত নিয়ে গত রবিবার বিকেলে তার অ্যাপার্টমেন্টে কাঞ্চন সেনের কার্ড ফেরত নিতে আসার ঘটনা সবটাই বললেন। কিন্তু কার্ডটা কীভাবে তার হাতে এসেছিল, সেই অংশটা চেপে গেলেন। মিঃ ভাদুড়ি! কাঞ্চন সেন আমাকে যে নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন, তা এখনই আপনাকে জানাচ্ছি না। আমার বিশ্বাস, এই নাম-ঠিকানা আপনারা নিজেরাই পেয়ে যাবেন। কাঞ্চন সেনের খুনি নিশ্চয় আমার বাড়ি পর্যন্ত গোপনে তাঁকে ফলো করে গিয়েছিল। তারপর সে কাঞ্চন সেনের ঘরে তার সঙ্গে দেখা করার ছলে যায়। আমার পরিচয় খুনি তার মালিকের কাছে আগেই পেয়েছিল।
–আপনি সিওর হলেন কী করে?
যথাসময়ে জানতে পারবেন। এরপর খুনি কাঞ্চন সেনের কাছে যায়। কার্ড হারিয়ে চাকরি যাওয়ার আশঙ্কায় কাঞ্চন সেনের মানসিক অবস্থা সুস্থ থাকার কথা নয়। আমার ধারণা, খুনির সঙ্গে তার বন্ধুতার সম্পর্ক ছিল। কারণ কনকপুর হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন কাঞ্চনবাবু। এমন হতেই পারে, কথায়-কথায় তিনি খুনিকে জানিয়েছিলেন, কার্ড আমার কাছে আছে। তা ফেরত পাওয়ার শর্তও মুখ ফসকে তিনি বলে ফেলেছিলেন। কাজেই মালিকের নির্দেশমতো খুনি চিরকালের জন্য তার মুখ বন্ধ করে দেয়। তারপর–
মিঃ ভাদুড়ি কর্নেলের কথার ওপর বললেন,–তারপর সে চিরকালের জন্য আপনার মুখও বন্ধ করার জন্য ওয়াটারড্যামের কাছে জঙ্গলে ওত পেতে বসে ছিল।
ঠিক তা-ই।–বলে কর্নেল ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়ালেন। একটা কথা। রায়বাড়ির দুই ভাই কে কোথায় চাবি লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা জিজ্ঞেস করেছিলেন কি?
ও. সি. মিঃ ভাদুড়িও উঠে দাঁড়ালেন। একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ। তবে ওঁরা একে অন্যকে লুকিয়ে গোপনে আমাকে জানিয়েছেন। দেখিয়েছেনও।
কর্নেল হাসলেন। বড়বাবু পুরোনো শাস্ত্রীয় বৃহৎ পঞ্জিকার ভিতরে গর্ত কেটে আর ছোটবাবু তাঁর ছড়ির ভিতরে চাবি লুকিয়ে রাখতেন।
–আমি আপনার কথায়.অবাক হচ্ছি না স্যার! শুনেছি, পিছনেও আপনার একটা চোখ আছে।
–নাঃ। প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদার আমার সোর্স, মিঃ ভাদুড়ি!
মিঃ ভাদুড়ি চেয়ার থেকে উঠে এলেন। আপনারা এখন কি সেচ-বাংলোয় ফিরে যাবেন?
–হ্যাঁ। দেখি, কোনো রিকশোওয়ালাকে রাজি করাতে পারি নাকি!
–ওদের তো একটা জিপগাড়ি আছে! আপনি বললেই নিশ্চয় পেতেন।
–ইঞ্জিনিয়ার মিঃ গোস্বামী গাড়িটা দিতে চেয়েছিলেন। আমি নিইনি।
–ঠিক আছে। রমেনবাবুকে বলছি, আমাদের গাড়িতে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবেন। শীতের রাত্রে ইরিগেশন বাংলোতে যেতে কোনো রিকশোওয়ালাই রাজি হবে বলে মনে হয় না।
পা বাড়িয়ে হঠাৎ কর্নেল ঘুরে দাঁড়ালেন। আস্তে বললেন,–কাল সকাল দশটা থেকে তৈরি থাকবেন। যে-কোনো সময় আপনার সদলবলে রায়বাড়ি যাওয়ার দরকার হতে পারে।
