ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন। তার কাছাকাছি বাঁদিকের চেয়ারে একজন পুলিশ অফিসার ফাইল হাতে বসেছিলেন। মিঃ ভাদুড়ি বললেন, রমেনবাবু! স্বনামধন্য কর্নেলসায়েবের কথা আপনাকে বলেছি। আপনি গেস্টদের পথ্য কফি আর স্ন্যাকসের ব্যবস্থা করুন। ফাইল রেখে যান।
রমেনবাবু তখনই উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে কর্নেলকে তারপর আমাকে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন। তারপর মিঃ ভাদুড়ি বললেন, পুলিশ সুপারের মেসেজ পেয়েছি আজ দুপুরে। বিকেলে ভাবছিলুম, ইরিগেশন বাংলোয় আপনার সঙ্গে দেখা করে আসব। আসলে আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল। ও. সি. হাসলেন। আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিলুম আমার এক কলিগের কাছে। তিনি আই. বি.-তে ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–গুজবে কান দেবেন না। তো প্রথমেই একটা কথা জেনে নিই। কলকাতা থেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার এসেছেন। উনি কি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন?
-হ্যাঁ স্যার! আজ দুপুরে এসেছিলেন উনি। ওঁকে প্রয়োজনে সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছি। উনি তো একেবারে ঘটনাস্থলে গেস্ট হয়ে আছেন। ওঁকে সাবধানে থাকতে বলেছি। উনি একটা লোকের চেহারা আর পোশাকের বর্ণনা দিয়েছেন। আমাদের সোর্সকে বলেছি, তাকে শনাক্ত করবে।
-আর-একটা কথা। আপনার এরিয়ায় রানিপুর গ্রামের এক ভদ্রলোক কলকাতায় চাকরি করতেন। কলকাতায় তার ঘরেই কেউ তাকে গত পরশু রবিবার সন্ধ্যায় মার্ডার করেছে।
মিঃ ভাদুড়ি আস্তে বললেন,–হা স্যার। ডি. আই. জি. সায়েবের মাধ্যমে একটা কেস ফাইল হয়েছিল। পুলিশ সুপার ফাইলটা আমার কাছে পাঠিয়েছেন।
-কাঞ্চন সেন সম্পর্কে?
ও. সি. একটু হেসে বললেন, আপনি সম্ভবত আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন স্যার!
–জানি না। শুধু জানতে চাইছি, কাঞ্চনবাবু সম্পর্কে খোঁজখবর আপনারা নিয়েছেন কি না।
–কাঞ্চনবাবু ক’দিন আগে কনকপুর এসেছিলেন। আমাদের সোর্স থেকে এ খবর পেয়েছি।
এই সময় একজন কনস্টেবল ও সেই পুলিশ অফিসার ট্রেতে কফি আর পটাটোচিপস, চানাচুর নিয়ে এলেন। ও. সি. বললেন, রমেনবাবু! আমরা কিছু কনফিডেনশিয়াল কথা সেরে নিই। কেমন?
রমেনবাবু ও কনস্টেবলটি তখনই বেরিয়ে গেল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, –আমার ধারণা, মিঃ হালদার যে লোকটির পরিচয় জানতে চেয়েছেন, রায়বাড়িতে তার অবাধ গতিবিধি আছে। তা ছাড়া, লোকটা সম্ভবত স্থানীয় ব্যবসায়ী বাঞ্ছারাম দত্তের কর্মচারী। আমার ধারণার ভিত্তি আছে মিঃ ভাদুড়ি।
মিঃ ভাদুড়ি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। আস্তে বললেন,–আই সি!
–আরও বলছি। সে রবিবার সকালের ট্রেনে কলকাতা গিয়েছিল। সেদিন সে কলকাতায় ছিল। সন্ধ্যায় কাঞ্চন সেনকে খুন করে সে সেই রাত্রে কনকপুরে ফিরে এসেছিল। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, আমি তাকে দেখেছি।
–মাই গুডনেস! কোথায় দেখেছেন তাকে?
–গতকাল বিকেলে ইরিগেশন বাংলো থেকে ওয়াটারড্যামের বাঁধের পথে আমি যাচ্ছিলুম। আমার সঙ্গে বাংলোর ভোঁদা নামে একটি ছেলে ছিল। লোকটা আমাকে গুলি করে মারার জন্য ডানদিকের ঢালু জমিতে ঝোঁপের আড়ালে বসে পড়ার আগেই তাকে আমি দেখে ফেলেছিলুম। আমার সামরিক জীবনের অভ্যাস মিঃ ভাদুড়ি! বিশেষ করে বনজঙ্গলে চলার সময় আমি ১৮০ ডিগ্রি বরাবর নজর রাখি।
-তারপর?
–সে তৈরি হওয়ার আগেই আমার লাইসেন্সড সিক্সরাউন্ডার রিভলভার থেকে ঝোঁপের গোড়ায় এক রাউন্ড ফায়ার করেছিলুম। অমনই সে গুঁড়ি মেরে ঝোঁপের আড়াল দিয়ে পালিয়ে যায়। বাইনোকুলারে একটু পরে তাকে জঙ্গলে গা ঢাকা দিতে দেখি। ভোঁদা একটু বোকাসোকা। তাকে বলেছিলুম, বনমুরগি মারতে গুলি করলুম। বনমুরগিটা পালিয়ে গেল।
-ও মাই গড! কর্নেলসায়েব! শয়তানটা কে আমি তা বুঝতে পেরেছি। আজ রাতেই তাকে লক-আপে ঢোকাব। আপনি প্লিজ ঘটনাটা উল্লেখ করে একটা ডায়রি করুন। কারণ তার গার্জেন প্রভাবশালী লোক।
–করছি। এবার বলুন, রায়বাড়ির গৃহদেবীর মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস চুরির কেসে কি এগোতে পারছেন না?
–সমস্যা হল, প্রাথমিক তদন্তের পর মনে হয়েছিল ওঁদের দুই ভাইয়ের মধ্যে যে-কোনো একজন চুরি করে জুয়েলস বিক্রি করে দিয়েছেন। দুই ভাইকে জেরা করা হয়েছে প্রথমে পৃথক-পৃথকভাবে। পরে দুজনকে একসঙ্গে পাশাপাশি বসিয়ে জেরা করা হয়েছে। এতটুকু সন্দেহজনক কথার আভাস মেলেনি। দ্বিতীয় দফায় ওঁদের কাজের নোক গোবিন্দ ও হরিপদকে সরাসরি অ্যারেস্ট করেছিলাম। কিন্তু তাদের কাছেও কোনো সন্দেহজনক সূত্র পাইনি। অগত্যা আপাতত জামিনে ছেড়ে দিয়েছি। তবে একটা ক্ষীণ সূত্র ওঁদের কাজের মেয়ে শৈলবালার কাছে পেয়েছিলুম। বছর তিনেক আগের কথা। সন্ধ্যা থেকেই লোডশেডিং ছিল। সুদর্শনবাবুর ঘরের তালা সেই সুযোগে কেউ ভাঙছিল। শৈলবালা নাকি চাপা শব্দটা শুনেই উঠোন পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চুপি-চুপি উঠে যাচ্ছিল। সিঁড়িতে কেউ তাকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়।
–কিন্তু তারপরও তো মহালক্ষ্মীর জুয়েলস চুরি যায়নি।
–যায়নি। তবে শৈলবালার সন্দেহ, সে-ই পরে জুয়েলস চুরি করেছে।
–লোকটাকে কি শৈলবালা চিনতে পেরেছিল?
–আবছা আঁধারে লোকটাকে চেনা মনে হয়েছিল তার। কিন্তু সাহস করে কাউকে বলতে পারেনি। যদি সত্যিই সেই লোকটা না হয়?
