–আমার মাথাখারাপ স্যার? ভোঁদা বলছিল, কদিন আগে নাকি তাকে কার সঙ্গে কনকপুর বাজারে দেখেছে! ভেঁদার স্বভাব বড় বাজে। পুলিশের কানে গেলে ওকে লক-আপে ঝোলাবে না?
-–ঠাকমশাই রানিপুরের লোক। তাকে বলেছেন নিশ্চয়?
–বলেছি। উনিও অবাক।
–উনি ভোঁদার কানে খবরটা তুলবেন না তো?
সুরঞ্জনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, আমি অলরেডি ঠাকমশাইকে সাবধান করে দিয়েছি।
–বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছেন।
সুখরঞ্জনবাবু চলে গিয়েছিলেন। আমি বাথরুমে ঢুকে গরমজলে হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়েছিলুম। কিছুক্ষণ পরে বারান্দা থেকে কর্নেল ডাকলেন,–জয়ন্ত! কফি! নার্ভ চাঙ্গা করে নাও।
বারান্দায় গিয়ে বসলুম। কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম,–প্রশ্নটা করার সুযোগ পাইনি। হঠাৎ আপনার মাথায় বেতের ছড়ির বাতিক চাগিয়ে উঠল কেন? আপনার ঘরে অনেক সুন্দর ছড়ি দেখেছি।.একটাও ব্যবহার করতে আজ পর্যন্ত দেখিনি। সুদর্শনবাবুর ছড়িটা নেহাত ছড়ি।
–কুটিরশিল্পের সৌন্দর্য তুমি বুঝবে না জয়ন্ত! তাই ও নিয়ে কোনো কথা নয়। কফি খেয়ে তৈরি হয়ে নাও। বেরুব।
–সর্বনাশ! আবার কোথায় যাবেন?
–কনকপুর!
–পায়ে হেঁটে!
–পায়ে হেঁটে। নৌকোয় পাঁচ-ছঘণ্টা বসে পায়ে বাত ধরে গেছে। পেশি সচল করা দরকার।
–কিন্তু এখনই তো সন্ধ্যা হয়ে এল!
–তাতে কী? কনকপুর পর্যন্ত দুধারে লাইটপোস্ট আছে। ওই দেখো, আলো জ্বলে উঠল।
–কাল সন্ধ্যায় এই আলোগুলো জ্বলতে দেখিনি!
বোধহয় বিদ্যুতের যে ফেস থেকে এই রাস্তার আলো জ্বলে, সেটা খারাপ ছিল। যাই হোক, আলো নিয়ে আলোচনায় লাভ নেই। কর্নেল হাসতে-হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ঘরে গিয়ে বললেন,–টর্চ নেবে। লোডেড ফায়ার আর্মস সঙ্গে নেবে।
ভিতরে গিয়ে বললুম,–আপনার সেই বনমুরগি বাঁদিকের বন থেকে সাড়া দেবে না তো?
কর্নেল হাসলেন। কাল এসেই বাইনোকুলারে দেখে হিসেব করে নিয়েছি। কনকপুরগামী পিচরাস্তা থেকে বাঁদিকের জঙ্গলের দূরত্ব অন্তত একশো মিটারের বেশি। ডানদিকে অনেকদূর অবধি ধানক্ষেত। তারপর কনকপুরের আগে ডানদিকে বিদ্যুতের সাবস্টেশন। আলোয়-আলোয় ছয়লাপ। তার চেয়ে বড় কথা, চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানির এজেন্ট কাঞ্চন সেন খুন হয়ে যাওয়ার খবর ইতিমধ্যে রটে গেছে। আর কিছু বলার দরকার আছে কি?
–নাঃ! আমাদের প্রতিপক্ষ সতর্ক হয়ে গেছে।…
ভোঁদা আমাদের সঙ্গী হতে চেয়েছিল। সুখরঞ্জনবাবুও বলেছিলেন,–ওকে নিয়ে যান স্যার। যেখানে যেতে চান, ও সেখানে পৌঁছে দেবে। রিকশাওয়ালারা কাছের জায়গাকে দূর বানিয়ে ছাড়বে।
কর্নেল বললেন,–কনকপুর আমার চেনা জায়গা। ভোঁদাকে দরকার হবে না।
প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা একেবারে জনহীন। বিদ্যুতের সাবস্টেশন পেরিয়ে গিয়ে বাঁদিকে খেলার মাঠ। ক্রিকেট ব্যাট হাতে একদল ছেলে তখনও দাঁড়িয়ে কী নিয়ে তর্কাতর্কি করছে। ডাইনে দোতলা বাড়িটার শীর্ষে আলো জ্বলছিল দেখলুম, বড়-বড় হরফে লেখা আছে ‘ফণিভূষণ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়’।
একটু পরে মানুষজন আর সাইকেলরিকশোর আনাগোনা দেখা গেল। একটা সাইকেলরিকশো দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন,–থানায় যাব।
রিকশোওয়ালা বলল,–দশ টাকা লাগবে সার!
কর্নেল উঠে বসলেন। তার তাগড়াই গড়নের জন্য পুরো গদিটাই দরকার ছিল। ঠাসাঠাসি চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে বসলুম। কর্নেল রিকশোর হুড তুলে দিলেন। বসতি এলাকার বড় রাস্তায় এই শীতসন্ধ্যাতেও যানবাহন আর মানুষের ভিড়। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ছোট রাস্তায় একটার পর একটা আঁক নিতে-নিতে যেখানে পৌঁছলুম, সেখানে ঘন বসতি নেই। গাছপালার ফাঁকে বাড়িগুলোকে দেখে সরকারি অফিসের কোয়ার্টার মনে হচ্ছিল। তারপর একটা চওড়া রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে রিকশো থামল। রিকশোওয়ালা বলল,–এসে গেছি সার!
ডাকদিকে থানার গেট। গেটে বেয়নেট লাগানো বন্দুক হাতে সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে ছিল। আগে কর্নেল, তারপর আমি নামলুম। রিকশাওয়ালা টাকা পেয়ে সেলাম ঠুকে বলল,–সায়েবদের দেরি না হলে আমি এখানে অপেক্ষা করব। বলুন সার!
কর্নেল বললেন, তুমি চলে যাও। আমাদের অনেক দেরি হবে।
রিকশোওয়ালা রিকশো ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। কয়েকধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে সদর দরজায় পৌঁছে কর্নেল বেঞ্চে বসে থাকা একজন কনস্টেবলকে বললেন,–ও, সি. মিঃ ভাদুড়ির সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কনস্টেবল তর্জনী তুলে কোনার একটি ঘর দেখিয়ে দিল। সেই ঘরের দরজার পর্দা তুলে কর্নেল বললেন,–আসতে পারি? আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।
–আপনিই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার? আসুন! আসুন স্যার!
কর্নেলের সঙ্গে ভিতরে ঢুকলুম। কর্নেল তাঁর নেমকার্ড এগিয়ে দিলেন। টেবিলের ওধারে একজন মধ্যবয়সি উর্দিপরা অফিসার কার্ডটি দেখার পর উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে কর্নেলের সঙ্গে করমর্দন করলেন। সামনের চেয়ারে একজন ধুতিপাঞ্জাবি পরা স্থূলকায় ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁর গায়ে শাল এবং মাথায় মাফলার জড়ানো। তিনি কর্নেলকে দেখছিলেন। কর্নেল বললেন,–পরিচয় করিয়ে দিই। আমার তরুণ বন্ধু সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি আমার সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, আপনারা বসুন প্লিজ! তারপর সেই ভদ্রলোকের দিকে ঘুরে তিনি বললেন, ঠিক আছে অমলবাবু! আমি দেখব কী করা যায়। আপনি কাল বেলা এগারোটার পর একবার টেলিফোন করবেন। আসবার দরকার নেই। নমস্কার।
