বাঁকের মুখে গিয়ে ডানদিকের ঘাটে নৌকো রাখল বেচু। একটা গাছের গুঁড়িতে দড়ি দিয়ে নৌকোর ডগার দিকটা বেঁধে দিল। কর্নেল একলাফে নেমে গিয়ে বললেন,–ভোঁদা! ব্যাগটা নিয়ে এসো।
নৌকোর ডগা টলমল করছিল। বেচু তার বাঁশের লগি আমাকে ধরতে বলল। টাল সামলে নেমে গেলুম। কর্নেল বললেন, বেচু! তুমি তোমার নৌকোয় বসে থাকে। আমরা বেশি দেরি করব না।
ঘড়ি দেখলুম। একটা বেজে গেছে। ঢালু পাড় বেয়ে উপরে উঠে দেখি, একদল নানাবয়সি নর-নারী, কাচ্চা-বাচ্চা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল একজনকে বললেন, দশরথ কোথায়?
অবাকচোখে কর্নেলকে সবাই দেখছিল। যে লোকটাকে কর্নেল দশরথের কথা জিজ্ঞেস করলেন, সে শুধু আঙুল তুলে একটা কুঁড়েঘরের সামনে একটা গাছের তলায় বাঁশের মাচানে বসে থাকা এক বৃদ্ধকে দেখাল।
আমরা তার কাছে যেতেই সে চোখ তুলে তাকাল। কর্নেল বললেন, তুমি দশরথ?
দশরথের পরনে খাটো ধুতি। খালি গা। মোটাসোটা মানুষ। সে বলল,–কে বলছেন আজ্ঞে? চোখে ভালো দেখতে পাইনে।
সেই লোকটা বলল,–দুই সায়েব তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন দাশুখুড়ো! কর্নেল বললেন,–কলকাতা থেকে এসেছি!
দশরথ মাচা থেকে নেমে ঝুঁকে প্রণাম করে বলল, আমার সৌভাগ্য সার! ও রঘু! সারদের বসতে দে। মাদুরখানা এনে মাচানে পেতে দে শিগগির!
কর্নেল দশরথের কাঁধে হাত রেখে বললেন, তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না দশরথ! আমি বসব না। শোনো! আমার এক বন্ধুর হাতে তোমার তৈরি ছড়ি দেখেছিলুম। সেই ছড়ি দেখে আমার খুব লোভ হয়েছে। বুঝলে? মোটা বেতের ছড়ি। মাথার দিকটা ছাতার বাঁটের মতো বাঁকানো। কালো রঙের বাঁট। বাঁটটা ঘোরালে খুলে যায়। কনকপুরের জমিদারবাড়ির সুদর্শনবাবুকে তুমি ওইরকম একটা ছড়ি তৈরি করে দিয়েছিলে। তাই না?
–আজ্ঞে সার! বুঝেছি! তবে ওরকম বেত খুঁজে পাওয়া আজকাল কঠিন!
–তোমাকে আমি অগ্রিম পুরো টাকাই দিয়ে যাব। বলো, কত টাকা দিতে হবে।
দশরথ হাসবার চেষ্টা করে বলল,–কথা দিয়ে যদি কথা রাখতে না পারি সার?
–তুমি পারবে। ওইরকম বেত খুঁজতে হলে তুমি এ বয়সে একা তো পারবে না।
–আজ্ঞে! আমার নাতি কানু এসব খোঁজখবর রাখে!
–তাকে বখশিস দেব। কোথায় সে?
একজন লোক বলল,–কানু আমার ছেলে সার। উনি আমার বাবা। কানু বেত কাটতেই গেছে। আমাদের সার বেত নিয়েই কাজ। দলবেঁধে ওরা জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। খুব কষ্টের কাজ।
কর্নেল আমাকে অবাক করে দশরথের হাতে একটা একশোটাকার নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, –একশোটাকা রাখো। ছড়ি তৈরি হলে তোমার নাতিকে দিয়ে ইরিগেশন বাংলোর সুখরঞ্জনবাবুকে পৌঁছে দিয়ো। উনি আমাকে কলকাতায় ছড়িটা পৌঁছে দেবেন। ইরিগেশন বাংলো তুমি নিশ্চয় চেনো?
দশরথকে চঞ্চল দেখাচ্ছিল। সে বলল,–চিনি বইকি সার! তবে আগাম টাকা–
কর্নেল তাকে বাধা দিয়ে বললেন,–টাকা নিয়ে ভেবো না। শুনেছি তুমি কমাস আগে কনকপুরের এক ভদ্রলোককেও ওইরকম ছড়ি তৈরি করে দিয়েছ?
দশরথ হাসল।–আজ্ঞে সার! দিয়েছি বটে। অনেক খুঁজে মোটা বেতখানা পেয়েছিলুম।
–কী যেন নাম ভদ্রলোকের?
–দত্তবাবু। বাঞ্ছারাম দত্ত। দশ-বারো বছর আগে ওনাকে মোটা বেতের চেয়ার-টেবিল তৈরি করে দিতুম। নৌকো বোঝাই করে নিয়ে যেতেন। কলকাতায় চালান দিতেন।….
সেচবাংলোয় ফিরতে বিকেল চারটে বেজে গিয়েছিল। সুখরঞ্জনবাবু কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, দশরথের সঙ্গে দেখা হল স্যার? কী বলল?
কর্নেল বললেন,–অ্যাডভান্স দিয়ে এসেছি। ছড়ি তৈরি হলে আপনার কাছে পৌঁছে দেবে। আপনি যখন সময় পাবেন, কলকাতা গেলে আমাকে দিয়ে আসবেন।
আমি বলেছিলুম,লোকটা এখনও গরিব থেকে গেছে কেন, বোঝা গেল না!
সুখরঞ্জনবাবু বলেছিলেন,–বন্যা স্যার! দু-একটা বছর অন্তর বন্যা! বন্যায় ওদের ঘর-সংসারের সবকিছু ভেসে যায়। তবু ওখানে না থেকেও ওদের উপায় নেই। শুধু বেত নয়, ওই এলাকায় বাঁশঝাড়ও প্রচুর। বাঁশ থেকেও ওরা কতরকম জিনিস তৈরি করে। বাঁশ অবশ্য কিনতে হয়। বেত কিনতে হয় না। তবে স্যার বলতে নেই–এই ওয়াটারড্যাম করেই বন্যা বেড়ে গেছে। বেশি বৃষ্টি হলেই জল ছেড়ে দেওয়ার অর্ডার আসে। হিতে বিপরীত হয়েছে। তা স্যার, আপনাদের খাওয়াদাওয়া?
কর্নেল বলেছিলেন,–ডাকিনিতলার ঝিলের ধারে নৌকো বেঁধে লুচি-আলুরদমের শ্রাদ্ধ করেছি। বেচু অবশ্য কাছেই তার বাড়িতে খেতে গিয়েছিল।
সুখরঞ্জনবাবু পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, চাপাগলায় বলেছিলেন, দুপুরে কনকপুর বাজারে গিয়েছিলুম। রানিপুরের একজন চেনা ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার কাছেই একটা সাংঘাতিক কথা শুনলুম স্যার!
-সাংঘাতিক কথা মানে?
-কাঞ্চনকে কলকাতায় কারা নাকি মার্ডার করেছে। আজ সকালে ওর দাদা প্রাণকান্তবাবুর কাছে খবর এসেছিল। উনি খবর পেয়েই কলকাতা গেছেন।
-বলেন কী? কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে আমার তত বেশি চেনাজানা ছিল না। কিন্তু ভদ্রলোক খুন হয়ে গেলেন! আশ্চর্য তো!
–স্যার! আমিও খুব অবাক হয়েছি। খারাপ লাগছে। আফটার অল একসময় আমার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। একটু চাপা স্বভাবের ছেলে ছিল। তবে ওকে ব্যাড বয়দের দলে ফেলা যেত না।
–যাকগে! আমরা ক্লান্ত। ঠাকমশাইকে কফির তাগিদ দিন। হ্যাঁ–একটা কথা শুনে যান। আপনাদের ভোঁদার কানে যেন ওই খারাপ খবরটা না পৌঁছয়।
