ভোঁদা নৌকোর তলা থেকে একটা লম্বা চকচকে দা বের করে রাখল। তার মুখে হাসি।
কর্নেল মুখে ভয়ের ছাপ ফুটিয়ে বললেন,–কী সর্বনাশ! দেখো বাবা ভোঁদা, যেন আমার মাথায় কোপ দিয়ো না।
ভোঁদা বলল,–নাঁ ছাঁর! এ কাঁছ খুঁব পাঁরি। আঁমি নাঁ? আঁমি আঁমনার ছাঁর উলথোঁ দিকে বঁসে নাঁ? কোঁপ–কোঁপ মাঁরব!
নৌকোর পিছনে দাঁড়িয়ে বেচু লগি ডুবিয়ে ঠেলে দিল। তারপর কখনও ছইয়ের বাঁ-পাশ, কখনও ডানপাশ দিয়ে হেঁটে নৌকো এগিয়ে নিয়ে চলল। একটু পরে কর্নেলকে চাপাস্বরে ইংরেজিতে বললুম–অন্য একটা কাজে এসে নিজের বাতিকে মেতে উঠলেন! হালদারমশাইয়ের জন্য আমার উদ্বেগ হচ্ছে! আপনার এই জলজঙ্গলে নৌযাত্রা কি পরে করা যেত না?
কর্নেল চুরুট টানছিলেন। ধোঁয়া ছেড়ে ইংরেজিতে বললেন,–জয়ন্ত! সব চেয়ে সেরা রহস্য প্রকৃতির ভিতরে লুকিয়ে আছে।
–কিন্তু এটা ক্লান্তিকর। একঘেয়ে!
–প্রকৃতিতে কত বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে তুমি জানো না!
সেই সময় খালের ওপর ঝুঁকে পড়া ঝোঁপের ডালে ভেঁদা দায়ের কোপ মারতেই কী একটা পাখি উড়ে গেল। কর্নেল বাইনোকুলার তুলে দেখে নিয়ে উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন,–উডডাক! জয়ন্ত! দেখলে তো?
উডডাক দুর্লভ প্রজাতির পাখি। অবিকল হাঁসের মতো দেখতে। কিন্তু এ পাখি জলচর নয়। কর্নেলের পাল্লায় পড়ে উডডাকের কথা শুধু শুনেছি তা-ই নয়, তার পিছনে কতবার পাহাড়ি বনজঙ্গলে হন্যে হয়ে ঘুরেছি। ভোঁদা তার ভাষায় কী সব আওড়াল বুঝলুম না।
বেচু বলল,–ভাগ্যি ভালো হুজুর! এখন শীতের সময়। অন্যসময় হলে সাপের দেখাও পাওয়া যেত!
কর্নেল বললেন, তুমি কোথায় থাকো?
–শেতলপুরে হুজুর! ওই যে বলছিলুম ডাকিনিতলার ঝিল। তার কাছাকাছি। এই খাল বেয়ে নৌকো আনা সহজ নয় আজ্ঞে! সুখরঞ্জনবাবু বললেন, কলকাতা থেকে সায়েবরা এসেছেন। তাই-অ্যাই ভোঁদা!
ভোঁদা খালে ঝুঁকে পড়া লতাপাতার একটা ঝালর কেটে ফেলল।
কর্নেল বললেন,–ওহে বেচু! তা হলে দেখছি, জঙ্গলের এই খাল বেয়ে নৌকো আনতে তোমার খুব কষ্ট হয়েছে।
বেচু হাসল,–আমার কী কষ্ট বড়হুজুর? আমি পাঁচখালি তল্লাটের লোক। কনকপুর তল্লাটের লোকে আমাদের বলে বুনো। আই ভোঁদা!
ভেঁদা দুদিক থেকে খালে ঝুঁকে পড়া ডাল-লতাপাতায় কোপ মারল। কর্নেল বললেন,–ভোঁদা তুমি এদিকে সরে এসো। আমাকে দা-খানা দাও! যা বলছি শোনো!
বেচু মজা পেয়ে হেসে উঠল। আমি বললুম,–বেচু! উনি একসময় মিলিটারিতে ছিলেন। মিলিটারি বোঝো?
-বুঝব না কেন ছোটহুজুর? পাঁচখালি থেকে বাংলাদেশের বডার তত দূরে নয়। ছোটবেলা থেকে আঁকে-ঝাঁকে মিলিটারি দেখেছি।
কর্নেলকে দেখিয়ে বললুম,–ইনি সেই মিলিটারি অফিসার। ইনি কর্নেলসায়েব। জঙ্গলে-পাহাড়ে যুদ্ধ করে জীবন কাটিয়েছেন। জঙ্গলের মধ্যে যুদ্ধ করতে হলে ঝোঁপঝাড় কেটে এগোতে হয়। কাজেই এ কাজে ওঁর হাত পাকা।
বেচু আরও সমীহ করে বলল, “আজ্ঞে! সুখরঞ্জনবাবু যেন তা-ই বলছিলেন বটে! হ্যাঁ, হ্যাঁ। কল্লেলসায়েব!
ভোঁদা ভুতুড়ে হাসি হেসে বলল,–আঁমি দাঁনি-দাঁনি! কঁনেল সাঁয়েম!
তার ‘কঁনেল সাঁয়েম’ তখনই ডানধারের উঁচুগাছ থেকে ঝুলে পড়া লতার একটা বিশাল ঝালর প্রায় নিঃশব্দে কেটে ফেললেন। আমি জানি ওঁর পিঠে আঁটা কিটব্যাগে ভাঁজ করা ধারালো জঙ্গল-নাইফ আছে, তবে বেচুর দা তার চেয়ে সাংঘাতিক।
ওয়াটারড্যামের উঁচু বাঁধ বাঁদিকে রেখে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর নৌকো চলল ডানদিকে। জঙ্গলের ভিতরে শীতের ঝরাপাতার স্তূপ দেখা যাচ্ছিল। প্রায় এক ঘন্টা ক্লান্তিকর যাত্রার পর বেচু বলল,ডাকিনিতলার ঝিলের কাছে এসে পড়েছি হুজুর!
কিছুক্ষণ পরে সামনে বিশাল আকাশ চোখে পড়ল। ঝিলের গড়ন ধনুকের মতো বাঁকা। কোথাও-কোথাও ঘন কচুরিপানার ঝক। কর্নেল বললেন,–এবার কফির তৃষ্ণা পেয়েছে। ভোঁদা ওই ব্যাগটা এগিয়ে দে বাবা! জয়ন্ত! তুমি ব্যাগ থেকে কাপটা বের করো। ভোঁদা কফি খেতে পারে না। ওকে আর বেচুকে বরং বিস্কুট বের করে দাও।
দুরে ধানখেত আর ধূসর গ্রাম চোখে পড়ছিল। কফি খেতে-খেতে রোদে এতক্ষণে চাঙ্গা হয়ে উঠলুম। ঝিলের জলের একধারে কোথাও জাল পাতা আছে। ডাইনে উঁচু জমির উপর মাঝে-মাঝে কয়েকঘর করে বসতি দেখা যাচ্ছিল। ঝিলের ঘাটে ছেলেমেয়েরা জল ছিটিয়ে স্নান করছিল। আমাদের দেখে–অবশ্য কর্নেলকে দেখেই বলা উচিত, নিস্পন্দ পুতুল হয়ে যাচ্ছিল।
তারপর আবার একটা কচুরিপানাভরা খালে নৌকো ঢুকল। কর্নেল বাইনোকুলারে একটা গাছের ডালে সারসের ঝাক দেখার পর দ্রুত ক্যামেরার টেলিলেন্স ফিট করে ফেললেন। তারপর কয়েকটা ছবি তুললেন। ঘাটে বাঁধা ঘোট-ঘোট নৌকো কোথাও। বিদেশি ছবিতে দেখা অবিকল ক্যাননা। সেই ক্যানো বেয়ে চলেছে কোনও মেয়ে। কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলুম,–এখানে ক্যাননা দেখছি! আশ্চর্য তো!
কর্নেল মিটিমিটি হাসলেন শুধু। বেচু বলল, “হুজুর! ওগুলোকে বলে ডোঙ্গা। তালগাছের গুঁড়ি খোদাই করে তৈরি।
আবার একটা খালে নৌকো ঢুকল। দুধারে ঘন জঙ্গল। কর্নেল বললেন,–বেচু! কালুখালি আর কতদূর?
বেচু বলল,–এসে গেছি বড়হুজুর। এই খাল থেকেই কালুখালি গ্রাম। সামনে যে বাঁক দেখছেন, তার মুখেই ডাইনে-বাঁয়ে দুটো বসতি।
-তুমি দশরথকে চেনো?
কথাটা শুনেই চমকে উঠলুম। বেচু বলল,–খুব চিনি বড়হুজুর। দশরথ কেন যে এখানে পড়ে আছে কে জানে? ওর হাতের বেতের কাজ কলকাতা অব্দি একসময় চালান যেত। কনকপুরের দত্তবাবুরা ওকে দিয়ে নৌকোবোঝাই মাল নিয়ে যেতেন। তা হুজুর, দশরথের অবিশ্যি দোষ নেইকো। বুড়ো হয়ে গেল। এ তল্লাটে বেতের জঙ্গলও কমে এল। বড়জোর ধামা, চুপড়ি এইসব জিনিস তৈরি করে ওরা কনকপুরে চৈত-সংক্রান্তির গাজনের মেলায় বেচতে যায়। এ সব জিনিস সরু বেতে তৈরি হয়। আগে দশরথরা তৈরি করত মোটা বেতের চেয়ার-টেবিল। এখন অমন বেত খুঁজে পাওয়াই কঠিন।
