–তা হলে সে জানত সুদর্শনবাবুর ব্যাগে মহালক্ষ্মীর বাঁধানো ছবি আছে?
–নিশ্চয়ই জানত।
–কর্নেল! এবার বলুন ভোঁদার মুখে শোনা বাঁছুবাবুটি কে?
–তুমি সুখরঞ্জনবাবু বা ঠাকমশাইকে জিগ্যেস করোনি কেন?
–ঠিক আছে। খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করব। কাঞ্চনবাবু আপনাকে যার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন, তিনি নিশ্চয় সেই লোক।
কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–গ্যারান্টি দিতে পারছি না।
–তার মানে এটা আপনার ট্রাম্পকার্ড। তুরুপের তাস?
কর্নেল চোখ বুজে চেয়ারে হেলান দিলেন। কিছুক্ষণ পরে বাইরে থেকে সাড়া দিয়ে সুখরঞ্জনবাবু বললেন,–আসতে পারি স্যার?
বললুম,–আসুন সুখরঞ্জনবাবু!
–আপনারা কখন ডিনার খাবেন জানতে এলুম!
কর্নেল বললেন, শীতের রাত্রে আপনাদের কষ্ট দেব না। নটায় খেয়ে নেব।
সুখরঞ্জনবাবু চলে যাচ্ছিলেন। বললুম,–একটা কথা সুখরঞ্জনবাবু!
–বলুন স্যার?
–তখন ভোঁদা আপনার ক্লাসফ্রেন্ড কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে কাকে দেখেছিল, তা-ই নিয়ে কর্নেলসায়েবের সঙ্গে আমার তর্ক হয়েছে। কর্নেল বলছেন, ভদ্রলোকের নাম বাঞ্ছাবাবু। লোকে বলে বাঙ্কুবাবু। আমি বলছি বাচ্চুবাবু। কারটা ঠিক?
সুখরঞ্জনবাবু হাসতে-হাসতে বললেন,–কনকপুরে বাঙ্কুবাবুও আছেন। বাচ্চুবাবুও আছেন। বাঙ্কুবাবুর নাম বাঞ্ছারাম দত্ত। নামকরা ব্যবসায়ী। আর বাচ্চুবাবুর নাম বিশ্বনাথ সিংহ। বাচ্চুবাবু হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ভোঁদাকে নিয়ে প্রবলেম আছে স্যার। ও কার নাম বলছে, তা বোঝার সাধ্য কারও নেই। লোকটিকে দেখিয়ে দিলে তবে বোঝা যাবে ভোঁদা কার নাম বলছে।
-কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে দুজনের মধ্যে কার সম্পর্ক থাকতে পারে?
-কাঞ্চন বড় চাকরি করে। সায়েব সেজে থাকে, তা-ও শুনেছি। সে ওই দুজনের সঙ্গে এক রিকশোতে বসে কোথায় যাবে? ভোঁদার একটা বদভ্যাস আছে স্যার। ওর সামনে কারও কথা নিয়ে আলোচনা করলে ও বলবে, তাকে অমুক জায়গায় দেখেছে।
কর্নেল হাসলেন। –ভোঁদা দিব্যদর্শী!
আজ্ঞে স্যার! ছেলেটা এমনিতে খুব ভালো। সরল। বিশ্বাসী। শুধু একটাই দোষ। বিশ্বসুন্ধু লোককে ও চেনে।–বলে সুখরঞ্জনবাবু হাসতে-হাসতে বেরিয়ে গেলেন।
একটু পরে বললুম,–কর্নেল! সুখরঞ্জনবাবু দুটো গুলি ছুঁড়ে গেলেন। টার্গেটে কোনটা বিঁধল!
কর্নেল আস্তে বললেন, কোনওটাই টার্গেটে বেঁধেনি।…
প্রচণ্ড শীতের আরামও আছে। সকাল আটটায় আমার ঘুম ভেঙেছিল ঠাকমশাইয়ের ডাকে। তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট। ঠাকমশাই বিনীতভাবে বললেন–বড়সায়েব বলে গেছেন, আপনি বেড-টি খান।
বিছানায় বসে বেড-টি খাওয়ার মতো আনন্দ আর কীসে আসে, বিশেষ করে এমন শীতের সময়? চা নিয়ে বললুম,–বড়সায়েব কখন বেরিয়েছেন!
–আজ্ঞে সেই ছটায়। ফ্লাস্কে কফি তৈরি রেখেছিলুম। উনি ভোঁদাকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন!
–সুখরঞ্জনবাবু কী করছেন?
–উনি নৌকোর ব্যবস্থা করতে গেছেন। বড়সায়েব গতরাত্রে নৌকোর কথা বলছিলেন না?
বলে বাসুদেব ঠাকুর চলে গেলেন। তারপর বাথরুমে গিয়ে দাড়ি কামিয়ে বেরুলুম। রাত-পোশাক ছেড়ে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট পরে বারান্দায় গিয়ে বসলুম। নীল কুয়াশা দূরে সরিয়ে রোদ নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে, যতদূর দেখা যায়।
ন’টা নাগাদ কর্নেল ফিরে এলেন। সঙ্গে অনুগত ভোঁদা। কর্নেল ওপরে এসে যথারীতি সম্ভাষণ করলেন,–মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
–মর্নিং বস! আশা করি আজ কোথাও আরেক রাউন্ড ফায়ার করার দরকার হয়নি?
কর্নেল হাসলেন। ভেঁদা আজ সত্যি একটা বনমুরগি আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু তাকে নিরাশ হতে হয়েছে। ওকে বললুম, দেখছ না বেচারা রোগে ভুগে আধমরা হয়ে গেছে?
বলে তিনি ঘরে ঢুকলেন। বাথরুম সেরে তিনি শুধু প্যান্টটা বদলে নিলেন। হান্টিং বুট ব্রাশ দিয়ে সাফ করলেন। টুপি থেকে মাকড়সার জালের ছেঁড়া কিছু অংশ সাফসুতরো করে বললেন,–এখনও সুখরঞ্জনবাবু ফেরেননি। দেখা যাক। ঠাকমশাইকে বলে এলুম, দশটায় ব্রেকফাস্ট করার পর কফি খাব।
সুখরঞ্জনবাবু ফিরে এলেন প্রায় আধঘন্টা পরে। খবর দিলেন,–ছই নৌকো পাওয়া গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে এসে যাবে। ওই যে বাঁধের ডাইনে খাল আছে, ওই খাল বেয়ে আসবে। বড্ড বেশি দর হাঁকছিল বেচু। ষাট টাকায় রফা হয়েছে।
ব্রেকফাস্টের পর কফি খাওয়া হল। কর্নেলের কথামতো আবার ফ্লাস্কভর্তি কফির ব্যবস্থা করলেন ঠাকমশাই। লক্ষ করলুম, একটা খাবার প্যাকেটও তৈরি হয়ে আছে। ভোঁদা খালের ধারে গিয়ে অপেক্ষা করছিল। পৌনে এগারোটায় সে থপথপ করে ভালুকের মতো হেঁটে এসে খবর দিল, নৌকো এসে গেছে।
নৌকোটা ছোট। বেচুমাঝি কর্নেলকে হাঁ করে দেখছিল। কর্নেল বললেন, “তোমার নাম বেচু?
–আজ্ঞে হুজুর!
–তোমার নৌকোয় তো হাল বা দাঁড় নেই দেখছি!
বেচু একটু হেসে বলল,–ওসবের দরকার হয় না হুজুর। এই যে লগি দেখছেন, এই যথেষ্ট। নৌকো তো ড্যামে ঢুকবে না। এই খাল দিয়ে গিয়ে ডাকিনিতলার ঝিলে পড়বে। ঝিলে তত বেশি জল নেই। তারপর আবার খাল। হুজুর কালুখালি যাবেন শুনলুম। তা আজ্ঞে, দু-ঘণ্টা তো লাগবে।
নৌকোয় ছইয়ের সামনে বসলেন কর্নেল। ভোঁদা বসল তার সামনে নৌকোর ডগায়, আমি ছইয়ের মুখে বসলুম। বেচু ভোঁদাকে চেনে দেখে অবাক হইনি। সে ভোঁদাকে বলল,–এই ভোঁদারাম! তোর নীচে ফাঁক দিয়ে দ্যাখ, একখানা দা আছে। বের করে হাতে রাখ। হুজুরদের মাথায় ঝোঁপঝাড়ের ডাল-লতাপাতা ঠেকতে পারে। আগেই দায়ে কেটে ফেলবি।
