কর্নেল গাড়ির ভেতর ঝুঁকে কী একটা কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, তাতে আমাদের প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে যাই হোক, একটা পালক সময়মতো সরিয়ে ফেলেছিলুম। ওদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। এই দেখো।
কর্নেলের হাতে একটা পালক দেখতে পেলুম। বললুম, কিন্তু ওরা পালকগুলো হাতাতে এসেছিল কেন বলুন তো? এগুলো কী এমন জরুরি ওদের কাছে?
কর্নেল হাসলেন। ওরা আমাকে চেনে। শুনলে না আদর করে বুড়ো ঘুঘু বলে সম্ভাষণ। করল? এই পালকেই সম্ভবত কোনও সূত্র লুকিয়ে আছে।….
ঘুঘুডাঙার মাঠ থেকে দুমাইল দূরের একটা গ্যারাজে খবর দিয়ে ব্রেকভ্যানে করে গাড়ি টেনে এনে এবং ফাঁসা টায়ার কোনওরকমে মেরামত করে কলকাতা ফিরতে সেদিন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।
পরদিন সকালে কর্নেলের বাড়ি গিয়ে দেখি, উনি একগাদা পুরনো বিলিতি খবরের কাগজ ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। আমাকে দেখে বললেন, বোলো ডার্লিং! খবর আছে।
বললুম, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। লন্ডনের ইভনিং স্টার পত্রিকা ঘাঁটছেন!
কর্নেল একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ, ১৮৫৭ সালে ভারতের সিপাহি বিদ্রেহের খবর পড়ছিলুম।
কিন্তু হাট্টিমরহস্যের কী হল?
কর্নেল আরও জোরে হেসে বললেন, বুঝতে পারছি, টায়ার ফঁসিয়ে দেওয়াতে তুমি ওদের ওপর ভীষণ রেগে গেছ। তবে তোমার টায়ার ফাসানোর ঘটনার সঙ্গে সিপাহী বিদ্রোহের সম্পর্ক আছে, জয়ন্ত?
সোজা হয়ে বসে বললুম, তার মানে?
কর্নেল জরাজীর্ণ ইভনিং স্টারের পাতায় লাল চিহ্ন দেওয়া একটা খবর দেখিয়ে বললেন, পড়ে দেখো। এই কাগজগুলো আমি সেবার লন্ডনে গিয়ে সংগ্রহ করেছিলুম একটা নিলামের দোকানে।
খবরটা হল এই : বারাকপুর সেনানিবাসের ক্যাপ্টেন বার্ট জনসনের প্রিয় পাখি দুটি গতকাল লন্ডনে পৌঁছেই মারা পড়েছে। বারাকপুরে সিপাহিরা বিদ্রোহ করায় নিরাপত্তার জন্য ক্যাপ্টেন বার্ট পাখি দুটিকে স্ত্রীপুত্রের সঙ্গে লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পাখিদুটি অত্যন্ত দুর্লভ প্রজাতির। জানা গেছে, ক্যাপ্টেন বার্ট এদের সংগ্রহ করেছিলেন আফ্রিকা থেকে। পাচার মতো মুখের গড়ন, মাথায় শিং আছে এবং দুপায়ে দাঁড়ানো মতো লাগে। এরা প্রায় তিনফুট উঁচু। পিয়ানোর শব্দের মতো টিং টিং করে এরা নাকি ডাকে। পাখি দুটিকে মর্যাদার সঙ্গে ক্লিভল্যান্ড কবরখানায় কবর দেওয়া হয়েছে।….
কর্নেলের মুখের দিকে তাকালে উনি আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিলেন। লাল চিহ্ন দেওয়া আরেকটা খবরে চোখ দেল। এবার খুব অবাক হয়ে গেলুম।
…গতরাতে ক্লিভল্যান্ড কবরখানায় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। কে বা কারা ক্যাপ্টেন বার্টের দুটি পাখির কবর খুঁড়েছিল। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে দেখে, দুটি পাখিরই পেট ধারালো অস্ত্রে চিরে রেখে গেছে তারা। মৃত পাখির পেট চেরার কারণ নিয়ে পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দাদের খবর দেওয়া হয়েছে।…
কর্নেল আরও একটা ইভনিং স্টার এগিয়ে দিয়ে বললেন, এবার আশা করি রহস্য অনেক স্পষ্ট হবে।
…স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ক্যাপ্টেন বার্ট পাখিদুটিকে দুটি বহুমূল্য রত্ন গিলিয়েছিলেন। চোরেরা যেভাবেই হোক সেই খবর জানত। ক্যাপ্টেন বার্টের কাছে এ সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাদের পাঠানো হয়েছিল। তিনি কবুল করেছেন। বিদ্রোহের সময় রত্নদুটি লুঠ হওয়ার ভয়ে তিনি একাজ করেছিলেন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এখন সেই রত্নদুটি উদ্ধারের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। আরও জানা গেছে, রত্নদুটি অযোধ্যার নবাবের কাছ থেকে ক্যাপ্টেন বার্ট উপহার পেয়েছিলেন।…
পড়ার পর বললুম, এতকাল পরে ওইসব ঘটনার সঙ্গে হাট্টিম রহস্যের কী সম্পর্ক আছে, আমার মাথায় আসছে না।
কর্নেল হাসলেন। কালোবাবুর জানালায় রাতবিরেতে সেই পাখিদুটোরই ভূত এসে ভয় দেখাচ্ছে, জয়ন্ত।
কেন?
সেই নবাবি রত্নদুটো তারা ফেরত চায়।
আমি নড়ে বসলুম। অ্যাঁ! বলেন কী? কালোবাবুর কাছে ও জিনিস কীভাবে এল? সে তো সেই লন্ডনের কবরখানা থেকে চোরেরা হাতিয়ে নিয়েছিল। একশো পঁচিশ বছর পরে ঘুঘুডাঙার কালোবরণ মুখুয্যের কাছে…. ধ্যাৎ! আমি এর একবর্ণ বিশ্বাস করি না।
কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে একটা যোগসূত্র আছেই।
হ্যাঁ—সেটা ওই বিদঘুটে আফ্রিকান পাখি দুটোর ব্যাপারে।
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আজ সন্ধ্যায় আমরা আবার ঘুঘুডাঙা যাব, জয়ন্ত। তৈরি থেকো। তবে না—গাড়ি করে নয়। বাসে যাব এবং অন্ধকারে মাঠ ঘুরে স্বর্গপুরীতে ঢুকব।
তিন
দিনটা খুব উত্তেজনার মধ্যে কেটে গেল। পাঁচটায় খবরের কাগজের অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর্নেলের কথামতো লালবাজারের পুলিশ দপ্তরের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইলুম। একটু পরে গেট দিয়ে বেরুতে দেখলুম কর্নেলকে। কাছে এলে বললুম, পুলিশের দফতরে ঢুকেছিলেন দেখছি। আমি ভেবেছিলুম এখান থেকে বুঝি ঘুঘুডাঙার বাস ধরা যায়।
কর্নেল বললেন, বাস ধরব এসপ্ল্যানেডে। এল-২০ নম্বরে বারাকপুর যাব। সেখান থেকে ঘুঘুডাঙার বাস পাব।
লালবাজারে কি কোনও সূত্র পেলেন?
কর্নেল হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, রোখকে! রোখকে! তারপর আমাকে হ্যাচকা টানে সঙ্গে নিয়ে একটা মিনিবাসের দিকে দৌড়ুলেন। পরে বুঝলুম, এই মিনিবাসটা বারাকপুর যাচ্ছে। ভিড়ে ঠাসাঠাসি অবস্থা।
বারাকপুরে একটা বাসস্ট্যান্ডে নামলুম যখন, তখন সাড়ে ছটা বেজে গেছে। সেখানে ঘুঘুডাঙার বাস পাওয়া গেল। ঘুঘুডাঙার স্টপে নেমে দেখি ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। লোডশেডিং। কর্নেল বললেন, পেছনে চর লেগেছিল, ডার্লিং! লালবাজারের উল্টোদিকে একটা লোক দাঁড়িয়েছিল। যাই হোক, মনে হচ্ছে তাকে ফাঁকি দিতে পেরেছি।
