–কিছু ঘটে থাকলে রায়বাড়ি ফিরেই জানতে পারবেন। সুরঞ্জনবাবুর সঙ্গের লোকটার চেহারা, পোশাক নিশ্চয় লক্ষ করেছেন?
–করছি। বয়স তিরিশ-বত্রিশের বেশি না। গোঁফ আছে। মাথায় মাফলার জড়ানো ছিল। গায়ে অ্যাশকালার ফুলহাতা সোয়েটার। পরনে মেটে রঙের টাইট প্যান্ট। জুতা লক্ষ করি নাই।
এই সময় বাংলোর দিকে একটা গাড়ি এগিয়ে আসতে দেখলাম। বাংলোর গেটের কাছে আসতেই চোখে পড়ল একটা জিপগাড়ি। ভোঁদা থপথপ করে এগিয়ে গিয়ে খুলে দিল। জিপগাড়িটা লন পেরিয়ে নীচে এসে থামল। কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–ইঞ্জিনিয়ারসায়েবের গাড়ি। এতক্ষণে বোধহয় মেকানিকরা গাড়িটা সচল করে দিয়েছে।
একটু পরে একজন টাই-স্যুট এবং কানঢাকা টুপি পরা এক ভদ্রলোক এবং তার পিছনে কেয়ারটেকার সুখরঞ্জনবাবু এগিয়ে এলেন। সুখরঞ্জনবাবু বললেন, স্যার! আমাদের ইঞ্জিনিয়ারসায়েব!
ইঞ্জিনিয়ারসায়েব নমস্কার করে কর্নেলকে বললেন-কর্নেলসায়েবের খুব কষ্ট হয়েছে বুঝতে পারছি। কিন্তু সরকারি গাড়ির অবস্থা কী আর বলব?
সুখরঞ্জনবাবু একটা চেয়ার এনে দিলে তিনি বসলেন। কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি। আর ইনি আমার বন্ধু মিঃ কে, কে. হালদার। অবশ্য মিঃ হালদার কনকপুর রায়বাড়ির গেস্ট!
–আমি এ. কে. গোস্বামী। চিফ ইঞ্জিনিয়ার মিঃ কে. এল. বোস আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, আপনার যেন কোনো অসুবিধা না হয়। কিন্তু প্রথমেই অসুবিধা ঘটিয়ে ফেলেছি। ক্ষমা করবেন।
–ও কিছু না। বছর তিনেক আগে ডিসেম্বরে আমি মিঃ জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির সঙ্গে এই বাংলোয় এসে কয়েকটা দিন ছিলুম।
আমি তখন ফরাক্কায় ছিলুম।–বলে মিঃ গোস্বামী ঘড়ি দেখলেন। আপনার সঙ্গে আলাপ করতে আর কৈফিয়ত দিতে এসেছিলুম। মিঃ বোস বলে দিয়েছেন, আপনার গাড়ির দরকার হলে যেন ব্যবস্থা করে দিই। জিপগাড়িটা আমাকে আমার কোয়ার্টারে পৌঁছে দিয়ে বাংলোয় থাকবে।
কর্নেল বললেন,–ধন্যবাদ মিঃ গোস্বামী। আমার গাড়ির দরকার হবে না। আমি জল-জঙ্গলে ঘুরতে এসেছি। আমার কিছু হবি আছে। পাখি, প্রজাপতি, অর্কিডের খোঁজে ঘুরে বেড়াই। নৌকোর ব্যবস্থা করে নেব। আমার এই কার্ডটা রাখুন!
কর্নেল তার নেমকার্ড দিলেন। মিঃ গোস্বামী কার্ডটা দেখে নিয়ে পকেটে ঢোকালেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–রোয়িং করার একটা ছোট্ট বোট আছে। তবে এখন যা অবস্থা, রোয়িং করার রিস্ক আছে। সুখরঞ্জনবাবুকে বললে নৌকোর ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি চলি কর্নেলসায়েব! ফিশারিজ কো-অপারেটিভের একটা আর্জেন্ট মিটিং শেষ করে আসছি। কো-অপারেটিভের প্রেসিডেন্ট এবং সেক্রেটারিকে বসিয়ে রেখে এসেছি। কিছু কাজ এখনও শেষ হয়নি।
কর্নেল বললেন,–মিঃ গোস্বামী! তা হলে একটা অনুরোধ। আমার বন্ধু মিঃ হালদারকে রায়বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দিলে খুশি হব। আপনি না এলে ওঁকে কষ্ট করে হেঁটে যেতে হত।
–নিশ্চয় পৌঁছে দেব। চলুন মিঃ হালদার!
গোয়েন্দাপ্রবরের আরও কিছুক্ষণ হয়তো থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এই শীতে জিপগাড়িতে ফেরার সুযোগ পেয়ে উনি খুশিই হলেন।
একটু পরে আমরা ঘরে গিয়ে বসলুম। কিছুক্ষণ পরে কর্নেলের নির্দেশে এবার ভোঁদা কফির ট্রে রেখে গেল। বোঝা যাচ্ছিল কর্নেলকে তার ভালো লেগেছে। তার সেবা করতে পারলে সে যেন ধন্য হয়ে যাবে।
কফি খেতে-খেতে কর্নেল হালদারমশাইয়ের সেই কাগজটা টেবিলল্যাম্পের আলোতে আতশকাঁচ দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তারপর তিনি টেবিলল্যাম্প নিভিয়ে দরজার পর্দা তুলে বাইরেটা দেখে এলেন। চেয়ারে বসে তিনি আস্তে বললেন–হালদারমশাই সুদর্শনবাবুকে কার্ডটার কথা বলেননি। আবার সুদর্শনবাবুরও কার্ডটা সম্বন্ধে মাথাব্যথা থাকলে হালদারমশাইকে জানাতেন। এ থেকে আমার ধারণা কার্ডটা কেউ ইচ্ছে করেই সুদর্শনবাবুর ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
-কেন?
–প্রশ্নের আগে তুমি চিন্তা করো, কখন কার্ডটা ঢোকানো হয়েছিল? কলকাতা যাওয়ার জন্য উনি ব্যাগে মহালক্ষ্মীর ফোটো এবং কিছু জিনিসপত্র ঢুকিয়েছিলেন। তারপরই কার্ডটা ঢোকানো হয়েছিল। বাড়িতে এটা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। কাজেই স্টেশনে যাওয়ার সময় বাসের ভিড়ে অথবা ট্রেনে ওঠার পর কেউ কার্ডটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয়। তুমি লক্ষ করে থাকবে, দুদিকে বোতাম আঁটা কাপড়ের ব্যাগ। এবার তোমার প্রশ্নের একটা উত্তর দেওয়া যায়। সে জানত, সুদর্শনবাবু কোথায় যাচ্ছেন এবং কেন যাচ্ছেন। বাঁধানো ফোটো বের করলেই কার্ডটা বেরিয়ে পড়ার কথা। ওঁর হইচই বাধানোর স্বভাব। কার্ড দেখতে পেলেই উনি আমাকে দেখাতেন। লোকটা ভেবেছিল, উনি যা-ই বলুন, চন্দ্র জুয়েলার্সের কার্ড দেখলে আমার মনে ওঁর প্রতি সন্দেহ জাগবে। আমি ওঁকে অবিশ্বাস করব। তখনই ঘর থেকে বের করে দেব। নয়তো ওঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেব। কারণ ওঁর ব্যাগ থেকে কার্ডটা ছবির সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছে। আমি কার্ডটা প্রখ্যাত রত্নব্যবসায়ী চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির।
হাসি পেল কথাগুলো শুনে। বললুম,–কার্ডটা ঠিকই বেরিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সুদর্শনবাবুর দৃষ্টি তখন আপনার দিকে ছিল।
কর্নেলও হাসলেন। সুদর্শনবাবুর অজান্তে কার্ডটা পড়ার ফলে তাঁর প্রতি আমার সন্দেহ আরও প্রবল হওয়ার কথা। কিন্তু এটাই অদ্ভুত ব্যাপার জয়ন্ত, চালাকির মাত্রাটা বেশি হলেই চালাক নিজের ফাঁদে নিজেই পড়ে। কার্ড লোকে বুকপকেটে রাখে। সুদর্শনবাবুর বুকপকেটে ভিড়ের মধ্যে কার্ডটা সে ঢুকিয়ে দিতেও পারত। তা দেয়নি। কারণ সে চেয়েছিল, কার্ডটা মহালক্ষ্মীর ফোটোর সঙ্গে থাকলে ওটা ছিটকে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য।
