কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কতদূর এগোলেন বলুন!
প্রাইভেট ডিটেকটিভ চাপা স্বরে বললেন,–সুরঞ্জনবাবু কোথায় চাবি লুকাইয়া রাখেন, তা দেখছি। সুদর্শনবাবু তখন বাইরে গিছলেন। ওনার বউদি ভদ্রমহিলা ছিলেন নীচের তলায়। সুরঞ্জনবাবু আমার ঘরে বইয়্যা ওনাদের ফ্যামিলি হিসটরি কইতাছিলেন। সেইসময় কথাটা তুলছিলাম।
–বাঃ! তারপর?
–উনি নিজের বেডরুমে লইয়া গিছলেন। খাটের মাথার দিকের দেওয়ালে ওনার ঠাকুরদার একখান পোর্ট্রেট টাঙানো আছে। ছবিটার পিছনে দেওয়ালে ছোট্ট তাক আছে। একসময় সেখানে ওনাদের মহালক্ষ্মী দেবীর নকলে তৈরি মাটির ছোট্ট প্রতিমা থাকত। ওনার ঠাকুরদার পোর্ট্রেটখান থাকত অন্য দেওয়ালে। চাবি লুকাইয়া রাখতেন সেই প্রতিমার তলায়। পরে প্রতিমা আলমারির মাথায় রাইখ্যা তাকের মাপে লোহার একখান চৌখুপি বানাইয়া আনছিলেন। বাঁদিকে একখানে আঙুলে চাপ দিলে কপাটের মতন সামনেটা খুইল্যা যাইত। ভিতরে হাবিজাবি জিনিসের মধ্যে চাবি দুইখান লুকাইয়া রাখতেন। চৌখুপির সামনের পাতে দেওয়ালে রঙ করা ছিল। তার ওপরে ঠাকুরদার পোর্ট্রেট। পোর্ট্রেটের তলায় ময়লা দাগ পড়নের কথা। কেউ ছবিখান সরাইলে দাগ দেইখ্যা জানা যাইব। তাই কি না?
–ঠিক বলেছেন। হালদারমশাই বললেন, সুদর্শনবাবুর ঘরের তালা কেউ একবার ভাঙছিল, তা তো অলরেডি শুনছেন! তারপর সুরঞ্জনবাবুও সতর্ক হইয়া তার চাবিদুইখান এমন জায়গায় রাখছিলেন, ভাবা যায় না। বলে হালদারমশাই খিখি করে হেসে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলুম,–কোথায় রেখেছিলেন?
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–ওনার ঘরে বইপত্তরের মধ্যে পুরোনো পঞ্জিকা আছে অনেকগুলি। একখান পুরোনো অ্যাত্তো মোটা পঞ্জিকার মাঝখানে চৌকো এটুখানি গর্ত করছেন।
কর্নেল বললেন,–পাতা কেটে গর্ত?
–ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার। ব্লেড দিয়া এক ইঞ্চিরও বেশি গর্ত করছেন। চৌকো গর্ত। তার মধ্যে দুইখান চাবি।
হালদারমশাই আবার খিখি করে হেসে উঠলেন। বললুম,–অদ্ভুত ব্যাপার তো!
–হঃ! কার সাইধ্য ট্যার পায়, পুরোনো পঞ্জিকার মধ্যে গুপ্তধন লুকাইয়া আছে! হালদারমশাই কণ্ঠস্বর আরও চাপা করলেন। কাজটা কিন্তু সহজ নয়। চিন্তা করেন কর্নেলস্যার! ব্লেড দিয়া অতগুলি পাতা কাটতে সময় কত লাগছে? তিনইঞ্চির বেশি লম্বা আর আধা ইঞ্চি চওড়া কইর্যা পাতা কাটছেন।
বললুম,–এক ইঞ্চিরও বেশি গভীর করতে হলে পঞ্জিকাটা খুবই মোটা হওয়া উচিত।
কর্নেল বললেন, আগের দিনে কিছু প্রকাশক প্রকাণ্ড শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা প্রকাশ করতেন। সঙ্গে জ্যোতিষচর্চা, মেয়েদের ব্রতকথা, শাস্ত্রীয় পাঁচালি পুরে দিতেন। সস্তা নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপা এ সব আট-নশো পৃষ্ঠার পঞ্জিকা আমি দেখেছি। আমার এক বন্ধুর পঞ্জিকাসংগ্রহের বাতিক আছে।
কর্নেলের কথার ওপর হালদারমশাই বললেন–বেশিক্ষণ থাকুম না। দুইখান ইমপর্ট্যান্ট কথা আছে।
–বলুন!
–আইজ সকালে বাজার এরিয়ায় গিছলাম। বড় বেশি ঠান্ডা! রাস্তার ধারে রৌদ্রে খাড়াইয়া চা খাইলাম। তারপর ভিড়ের মধ্যে ক-পাও হাঁটছি, পিছন থেইক্যা কে আমার হাতে কী একখান দিলা। ঘুইর্যা দেখি এক পোলাপান। সে কইল, এক বাবু আমারে দিতে কইছে। তারপরই সে পলাইয়া গেল। তারে তাড়া করলে মাইনরো ভিড় করবে। জিগাইবে কী ব্যাপার। তাই মাথা ঠান্ডা রাখলাম। এই দ্যাখেন কী কাণ্ড!
হালদারমশাই কোটের ভিতর পকেট থেকে ভাজকরা একটুকরো কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল চোখ বুলিয়ে দেখার পর গম্ভীর মুখে বললেন, ক্রমশ একটু-একটু করে ঘটনাটা স্পষ্ট হচ্ছে। রায়বাড়ির গৃহদেবীর জুয়েলস চুরি করে চোর। অথচ তা কনকপুর থেকে নিয়ে যেতে পারেনি এবং বেচতেও পারেনি।
কর্নেলের হাত থেকে প্রায় দলাপাকানো কাগজের টুকরোটা চেয়ে নিলুম। কাগজে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা আছে :
‘টিকটিকির লেজ কাটিয়া দিলেও লেজ গজাইতে পারে। মস্তক কাটিলে কী হইবে?’
হালদারমশাই বললেন,–কর্নেলস্যার! পঁয়তিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করেছি। আমারে কয় টিকটিকি? আইজ বেলা বারোটা পর্যন্ত বাজার এরিয়ায় এখানে-সেখানে ঘুরছি। পোলাটারে খুঁজছি। দেখা পাই নাই!
বললুম,–ভদ্ৰপরিবারের ছেলে, নাকি সাধারণ ঘরের?
-নাঃ! নোংরা পোশাক! পরনে ছেঁড়া হাফপ্যান্ট। জুতা নাই।
কর্নেল বললেন,–ঘটনাটা কি আপনার মক্কেলদের জানিয়েছেন?
–কক্ষনও না। অগো কমু ক্যান?
–ঠিক করেছেন। আর কী কথা বলতে চাইছিলেন, এবার বলুন!
হালদারমশাই সম্ভবত উত্তেজনায় নস্যি নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। এবার একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন–সুদর্শনবাবু বিকালে ওনাগো ক্লাবে যাইতে কইছিলেন। আমি ওনারে কইলাম, বাইরে আপনাগো লগে মেলামেশা করনের অসুবিধা আছে। উনি যাওয়ার পর আমি আবার বাজার এরিয়ায় গেলাম। পোলাটারে খুঁজছিলাম। শেষে ঠিক করলাম, আপনার লগে কনসাল্টের দরকার আছে। তারপর একটা চৌরাস্তার মোড়ে খাড়াইয়া ওয়েট করছিলাম। ক্যান কী, আপনি কইছিলেন সন্ধ্যার পর আমি য্যান গোপনে এই বাংলোয় আসি।
কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই! এবার কথাটা কী বলুন!
গোয়েন্দপ্রবর চাপা স্বরে বললেন,–বাঁ-দিকে মোড়ের মুখে একখান দোতলা বাড়ি থেইক্যা সুরঞ্জনবাবু আর-একটা লোকেরে বারাইতে দেখলাম ওনারা আমারে লক্ষ করেন নাই। ততক্ষণে আলো জ্বলছে। সুরঞ্জনবাবুরে দেইখ্যা মনে হইল, কিছু ঘটছে। দুইজনে সাইকেলরিকশোতে চাপলেন। কিন্তু ওনারা বাড়ির দিকে গেলেন না। উল্টাদিকে গেলেন। আমার খটকা বাধছে।
