কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বলেছিলেন,–কম্বলে ঢুকে ভাতঘুম দিয়ে নিতে পারো।
–ইচ্ছে তো করছে। কিন্তু রোদ দেখে লোভ হচ্ছে।
তা হলে বারান্দায় রোদে বসতে পারো।–বলে তিনি একটা চেয়ার নিয়ে বারান্দায় গেলেন। তারপর দেখলুম, বাইনোলারে তিনি সম্ভবত কনকপুর দর্শন করছেন।
রোদের আরাম না কম্বলের আরাম, এই টানাটানির খেলায় শেষপর্যন্ত কম্বল জিতে গেল। আমি কম্বলের ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলুম।
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি। ঘুম ভেঙেছিল ঠাকমশাইয়ের ডাকে। তিনি চায়ের কাপ-প্লেট হাতে নিয়ে ডাকছিলেন। দেখেই বুঝেছিলুম কর্নেলের নির্দেশ। ঠাকমশাই সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। বললেন,–বড়সায়েব ভোঁদাকে নিয়ে পাখি দেখতে বেরিয়ে গেছেন।
চায়ের কাপ-প্লেট নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখি, দূর পশ্চিমে অর্ধবৃত্তাকার গাঢ় নীল সুর্য যথাসাধ্য রং ছড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু প্রাকসন্ধ্যার ধূসরতা দ্রুত লাল রংটা মুছে ফেলছে। পূর্ব-দক্ষিণে সেই সরকারি জঙ্গলের গায়ে দেখতে-দেখতে ঘন নীল কুয়াশা জমে উঠল। চা শেষ করতে-করতে দক্ষিণে কনকপুরের আলোর বিন্দু ফুটে উঠতে দেখলুম। বারান্দার চেয়ারে বসে আমার প্রকৃতি দর্শনের একটু পরেই বাংলোর নীচের তলায় আলো জ্বলে উঠল। গেটের দিকে আলো পড়তেই কর্নেল আর ভোঁদাকে দেখতে পেলুম।
একটু পরে কর্নেল উঠে এসে যথারীতি সম্ভাষণ করলেন,–গুড ইভনিং জয়ন্ত! আশা করি ভাতঘুমটা ভালোই হয়েছে।
বললুম,–গুড ইভনিং বস! ভোঁদাকে নিয়ে কতদূর ঘুরলেন?
কর্নেল বারান্দার আলোর সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন। তারপর ভিতরে তাঁর কিটব্যাগ, ক্যামেরা আর বাইনোকুলার রেখে একটা চেয়ার নিয়ে এলেন। তিনি চেয়ারে বসে আস্তে বললেন,–ইচ্ছে করেই একটা রিস্ক নিয়েছিলুম। সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেতে পারত। তৈরি ছিলুম বলে ঘটেনি। অবশ্য ভোঁদা ছেলেটি সত্যিই যাকে বলে হাঁদারাম। কী ঘটল তা বুঝতে পারেনি।
কথাটা শুনেই চমকে উঠেছিলুম। বললুম, কেউ হামলা করেছিল। তাই না?
কর্নেল হাসলেন। ড্যামের ধারে উঁচু বাঁধের পথে হাঁটছিলুম। বাঁধের দুধারেই গাছপালা ঝোঁপঝাড়। ডাইনে খানিকটা ঢালু জমির নীচে:সেই খালটা। আসবার সময় খালটা তুমি দেখেছ। তো আগেই ঢালু জমিতে একটা বটগাছ লক্ষ করেছিলুম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা লোককে গুঁড়ির ওধারে আড়ালে যেতে দেখেছিলুম।ভোঁদা হাঁটছিল আমার বাঁদিকে। বটগাছটার কাছাকাছি বাঁধের পথে পৌঁছুনোর আগেই দেখি, লোকটা গুঁড়ি মেরে ঢালু জমিতে ঝোঁপের মধ্যে বসে পড়েছে। তার হাতে কী একটা ছিল–সম্ভবত দেশি পিস্তল। আমার উপায় ছিল না, ঝোঁপটার গোড়া লক্ষ্য করে এক রাউন্ড ফায়ার করতেই হল। অমনই লোকটা বটগাছের আড়াল দিয়ে উধাও হয়ে গেল। ভোঁদা ভেবেছিল, আমি পাখি মারবার চেষ্টা করলুম। তার কথায় পরে আসছি। নেমে গিয়ে বটগাছটার কাছে বাইনোকুলারে দেখলুম, লোকটা খালের ধারে-ধারে ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিয়ে পড়ি-কি-মরি করে দৌড়ে পালাচ্ছে। কাঁচারাস্তায় পৌঁছে সে একবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তারপর আমাকে দেখতে পেয়ে আবার দৌড়ে উধাও হয়ে গেল। ভোঁদা তখনও বাঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখার মতো মূর্তি। চোখ বড়। জিভ খানিকটা বেরিয়ে আছে। ফিরে গিয়ে বললুম, পাখিটা মারতে পারলুম না ভোঁদা! ভোঁদা তার বুলিতে যা বলতে চাইছিল, তা বুঝলুম। এদিকটায় বনমুরগি চরে বেড়ায়। কিন্তু তারা বেজায় চালাক।
এইসময় কফি আর স্ন্যাক্স ট্রেতে করে নিয়ে এলেন ঠাকমশাই। তার পিছনে ভেঁদা। ভোঁদা ঘর থেকে বেতের টেবিল এনে রাখল। ঠাকমশাই সহাস্যে বললেন,–বড়সায়েব বনমুরগিকে গুলি করেছিলেন শুনলুম। ভোঁদা তো হেসে অস্থির। বনমুরগি ফাঁদ পেতে ধরতে হয়। বুঝলেন স্যার? আগের দিনে মুমহররা এসে বনমুরগি ধরত। আজকাল আর তাদের দেখতে পাই না!
ভোঁদা অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ভুতুড়ে হাসি হাসল। তারপর ঠাকমশাইয়ের তাড়া খেয়ে চলে গেল।
ঠাকমশাই বনমুরগি এবং মুমহরদের সম্পর্কে আরও কিছু বলতেন। গেটের দিকে তাকিয়ে কর্নেল বললেন,–ঠাকমশাই! আমার সঙ্গে এক ভদ্রলোকের দেখা করতে আসার কথা। মনে হচ্ছে, তিনি এসে গেছেন। ওঁকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। পটে যা কফি আছে, এতেই হবে। আপনি শুধু একটা কাপ-প্লেট পাঠিয়ে দেবেন।
বাসুদেব ঠাকুর চলে গেলেন। গেটের কাছে হালদারমশাইকে দেখা যাচ্ছিল। মাথায় হনুমানটুপি, পরনে প্যান্ট আর গায়ে সোয়েটারের ওপর কোট চাপানো।
আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি হাত নাড়ছিলেন। একটু পরে ভোঁদা তাকে পৌঁছে দিয়ে গেল। তারপর ঠাকমশাই কাপ-প্লেট নিয়ে এলেন। হালদারমশাইকে বিনীতভাবে নমস্কার করে চলে গেলেন।
গোয়েন্দাপ্রবরকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। কর্নেল বললেন,–কফি খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিন হালদারমশাই।
আমি বললুম,–আপনি এলেন কীসে? হালদারমশাই বললেন,–রিকশোওলারা সন্ধ্যার পর এদিকে আইতেই চায় না। একজন হাঁকল তিরিশ টাকা লাগব। হঃ! দুইখান পাও থাকতে অগো সাধাসাধি করুম ক্যান?
কর্নেল তার হাতে কফির কাপ তুলে দিয়ে বললেন,–উঠেছেন কোথায়?
–উঠছি তো রায়বাড়িতে। সুদর্শনবাবু ওনার দাদা সুরঞ্জনবাবুর লগে আমার পরিচয় দিছেন। উনিও খুশি হইয়া কন্ট্রাক্ট ফর্মে সই করছেন। প্রথমে এটুখানি হেজিটেট করছিলেন ভদ্রলোক। তখন সুদর্শনবাবু মিঃ রায়চৌধুরির লেটারখান ওনারে পড়তে দিছিলেন। দোতলায় সুদর্শনবাবুর পাশের ঘরে আছি।
