গেটের সামনে একাগাড়ি দাঁড় করাল মকবুল। একজন প্যান্ট-শার্ট সোয়েটার পরা ভদ্রলোক ততক্ষণে গেটের কাছে এসে গেছেন। তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন,–ভেরি-ভেরি সরি স্যার। ইঞ্জিনিয়ারসায়েব স্টেশনে জিপগাড়ি পাঠাতে বলেছিলেন। কিন্তু গাড়িটা মাঝপথে বিগড়ে গিয়েছিল। মেকানিক ডেকে আনতে দেরি দেখে পাঁচুবাবুর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে ফোন করেছিলুম। ওরা বলল,–এত শিগগির গাড়ি দিতে পারব না। আমার অপরাধ নেবেন না স্যার!
কর্নেল হাসলেন। –না। আপনার উদ্বেগের কারণ নেই। আমরা মকবুলের গাড়িতে চেপে খুব আনন্দ পেয়েছি। আপনি বুঝি বাংলোর কেয়ারটেকার?
–আজ্ঞে! আমার নাম সুখরঞ্জন দাশ। বলে তিনি হাঁক দিলেন,–অ্যাই ভোঁদা। ওখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস হতভাগা? সায়েবরা এসে গেছেন! মালপত্তর নিয়ে যা!
কর্নেল মকবুলের হাতে একটা ভাজকরা নোট গুঁজে দিলেন। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে সেলাম ঠুকে কর্নেল ও আমার ব্যাগদুটো নামাল। ভোঁদা নামে বেঁটে একজন যুবক এসে ব্যাগদুটো নিয়ে এগিয়ে গেল। গেটের পর মোরামবিছানো পথ। সরকারি বাংলো যেমন হয়। ফুলে ও সুন্দর গাছপালা-লতা-গুল্মে সাজানো। পশ্চিমপ্রান্তে তিনটে একতলা ঘর। তার মধ্যে একটা গাড়ি রাখার গ্যারেজ।
একজন মালি খুরপি দিয়ে একটা ঝোঁপের গোড়ার মাটি খুঁড়ছিল। সে সটান উঠে দাঁড়িয়ে কর্নেলের উদ্দেশে সেলাম ঠুকল। একতলা ঘরের বারান্দায় সম্ভবত তার বউ পা ছড়িয়ে বসে ভাত খাচ্ছিল। বউটি ঘোমটা টেনে পিছন ফিরে বসল।
দোতলা বাংলোর বাঁদিকে সিঁড়ি। সুখরঞ্জনবাবু, তাঁর পিছনে ভোঁদা সবেগে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যাওয়ার পর আস্তে-সুস্থে কর্নেল ও আমি ওপরে গেলুম। ওপরে শেষপ্রান্তের ঘরটিতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন–সুখরঞ্জনবাবু! বছর তিনেক আগে আমি আর আমার বন্ধু এই ঘরে ছিলুম।
সুখরঞ্জনবাবু বললেন,–আজ্ঞে স্যার! আমি একবছর হল জয়েন করেছি। তখন কেয়ারটেকার ছিলেন নিত্যগোপাল মুখুজ্যে।
-হ্যাঁ। নিত্যগোপালবাবু। নামটা মনে পড়ল।
-হঠাৎ স্ট্রোকে উনি মারা যান। বলে সুখরঞ্জনবাবু তেড়ে গেলেন ভোঁদার দিকে।–হাঁ করে দেখছিস কী? ঠাকমশাই বোধ করি লেপের তলায় ঢুকে পড়েছে। গিয়ে বল সায়েবরা এসে গেছেন। দুটো বাজতে চলল।
ভোঁদা তখনই দুপদাপ শব্দ করতে-করতে চলে গেল। হোঁকা মোটা বেঁটে যুবকটিকে দেখে ন্যালা-ভোলা মনে হচ্ছিল। কর্নেল বললেন,–সেবার রান্নার লোক ছিল না। মুখুজ্যেমশাই নিজেই আমাদের রান্না করে খাইয়েছিলেন।
–আজ্ঞে স্যার! অমন মানুষ আজকাল খুঁজে পাওয়াই কঠিন। যাক্গে। এত বেলায় স্নান না করাই ভালো। বাথরুমে গিজার আছে। গরমজলে হাত-মুখ ধুয়ে নিন। খাবার এখানে পাঠিয়ে দেব, নাকি…
কর্নেল হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।–আমরা নীচের ডাইনিং ঘরেই খাব। আপনার ব্যস্ত হওয়ার কারণ নেই।
সুখরঞ্জন বেরিয়ে গেলেন। বললুম,বাপস! এ যে বিহারের পাহাড়ি শীত! জানলাও খোলা যাবে না।
কর্নেল বাথরুমে ঢুকে গেলেন। আমি উত্তরের পর্দা সরিয়ে কাঁচের জানলা একটুখানি ফাঁক করে দেখে নিলুম। নীচের দিকে জলাধারের তীরে বাঁধানো ঘাট। সেখানে একটা সাদা রঙের বোট বাঁধা আছে। কিন্তু ঠান্ডা হিম জলাধারে রোয়িং করা অম্ভব। অবশ্য কর্নেলের কথা আলাদা। তাঁর মিলিটারি শরীর।
একটু পরে আমরা ঘরের দরজায় তালা এঁটে নীচে ডাইনিংরুমে গেলুম। ঠাকমশাই করজোড়ে নমস্কার করলেন। কর্নেল প্রশ্ন করে জেনে নিলেন, তার নাম বাসুদেব ঠাকুর। তার বাড়ি রানিপুর। কথায়-কথায় জানা গেল, প্রাণকান্ত সেনকে তিনি চেনেন। প্রাণকান্তবাবুর ভাই কাঞ্চন সেন কলকাতায় বড় একটি চাকরি করে। গরিব দাদাকে পাইপয়সা সাহায্য করে না। দাদার বাড়ি আসেও না।
সুখরঞ্জনবাবু একটু তফাতে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বললেন, আমার বাড়ি কনকপুরে। কাঞ্চন কনকপুর হাইস্কুলে আমার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল স্যার! আপনি তাকে চেনেন?
কর্নেল বললেন, আমার এক বন্ধুর কোম্পানিতে ভদ্রলোক চাকরি করেন। সেই সূত্রে একটু আলাপ হয়েছিল। আমার তো পাখিটাখি দেখার বাতিক আছে। কাঞ্চনবাবু বলেছিলেন, তাদের গ্রামের ওদিকে বিশাল বিল আছে। সেখানে শীতের সময় প্রচুর জলচর পাখি আসে। তার কাছে খবর পেয়েই সেবার আমি এখানে পাখি দেখতে এসেছিলুম। তুবে উনি বিল বলেছিলেন। আমি এসে দেখেছিলুম, ওয়াটারড্যাম।
ভোঁদা বারান্দায় রোদে বসেছিল। সে জড়ানো গলায় অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে বলে উঠল,–কাঁছনবাবু না? এই তো সেদিন–কঁকপুরে এসেছিল। বাঁছুবাবু না? বাঁচুবাবুর সঙ্গে বাজারে না? একসঙ্গে রিকশাতে চেঁপেছিল।
সুখরঞ্জনবাবু হাসতে-হাসতে তাকে ধমক দিলেন।–চুপ হতভাগা! স্পষ্ট করে একটা কথা বলতে পারে না। জানেন স্যার? রাতবিরেতে ওর কথা শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। আস্ত ভূত!
কর্নেল বললেন,–ওর বাড়ি কোথায়?
ঠাকমশাই বললেন, আমার গ্রামের ছেলে স্যার! বাবা-মা নেই। কনকপুর বাস্ট্যান্ডে মোট বইত। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে ফাইফরমাশ খাটত। ইঞ্জিনিয়ারসায়েব ওকে এখানে চাকরি দিয়েছিলেন।
খাওয়ার পর ওপরের ঘরে গিয়ে বসেছিলুম,–কর্নেল! ভোঁদা কোন বাঁছুবাবুর সঙ্গে ক’দিন আগে কনকপুর বাজারে কাঞ্চন সেনকে দেখেছে। বাঁছুবাবুটি কে জেনে নিলেন না কেন?
