একটা নাগাদ কনকপুর স্টেশনে নেমে দেখলুম, পিছনের চত্বরে বাস, সাইকেলরিকশার ভিড়। এক্কা ঘোড়ার গাড়িও চোখে পড়ল। ছোট্ট একটা বাজার আছে। কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত! আমাদের পক্ষে একাগাড়িই ভালো। সাইকেলরিকশায় ঠাসাঠাসি হবে। তা ছাড়া, লক্ষ করো, বেচারা এক্কাওয়ালারা যাত্রী পাচ্ছে না। ক্রমশ গ্রামাঞ্চলের মানুষ নেহাৎ দায়ে না ঠেকলে সেকেলে যানবাহনের প্রতি অবহেলা দেখাতে শুরু করেছে।
ট্রেনে আসবার সময় শীতের হিম টের পাচ্ছিলুম। চত্বরে নেমে রোদ্দুর আরাম দিল। তারপর যা হয়, বিদেশি ট্যুরিস্ট ভেবে সাইকেলরিকশাওয়ালারা ঘিরে ধরেছিল। কর্নেল সোজা গিয়ে একটা এক্কাগাড়িতে উঠে বসলেন। বিহার অঞ্চলে কর্নেলের সঙ্গে একাগাড়িতে চাপার অভিজ্ঞতা আমার আছে। ঘোড়াটার পাঁজরের হাড় গোনা যায়। কিন্তু এক্কাওয়ালা মহানন্দে তাকে পক্ষিরাজে রূপান্তরিত করতে চাইছিল। কর্নেল তাকে বললেন,–তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। ইরিগেশন বাংলোয় যেতে কনকপুরের বাইরে দিয়ে একটা রাস্তা আছে শুনেছি। সেই রাস্তায় চলো।
এক্কাওয়ালা কর্নেলের মুখে বাংলা কথা শোনার আশা করেনি। সে একবার ঘুরে কর্নেলকে দেখে নিয়ে বলল,–সায়েবরা কি বলকাতা থেকে আসছেন সার?
–হ্যাঁ। তোমার নাম কী?
–আমার নাম মকবুল সার।
–কনকপুরের লোক তুমি?
–না সার! ডুবো জায়গায় বাড়ি ছিল। বানবন্যায় নাকাল হয়ে ইস্টিশানের কাছে বসত করেছি।
–ডুবো জায়গাটা কোথায়?
–পাঁচখালি। এখান থেকে অনেকটা দূর। খালবিল নদীনালা আর জঙ্গল। গরমেন বাঁধ বেঁধেছিল। বাঁধ বারবার ভেঙে যায়। কনটেকটারবাবু টাকা লুঠেপুটে খায়। বেশি কী বলব সার?
–লোকজনের বসতি নেই ওই অঞ্চলে?
–তা আছে সার! বেদে আছে। সাঁওতাল আছে। আমার মতো কত গরিব-গুরবোও আছে।
-–আচ্ছা, ওদিকে শুনেছি বেতের জঙ্গল ছিল একসময়। বেতের আসবাবপত্র নাকি কলকাতায় চালান যেত?
–এখনও আছে! কালুখালিতে কয়েকঘর ডোম আছে। তারাই বেতের কাজ করে।
–মকবুল! তুমি তো একসময় ওই এলাকায় ছিলে। কালুখালিতে দশরথ নামে একটা লোক ছিল জানো?
মকবুল হাসল।–সায়েবরা তা হলে আগে এসেছেন এ তল্লাটে?
–হ্যাঁ। আমার এক শিকারি বন্ধুর সঙ্গে এসেছিলুম। উনি দশরথকে আমার জন্য একটা বেতের চেয়ার তৈরি করে দিতে বলেছিলেন। লোকটার হাতের কাজ খুব সুন্দর!
–দশরথ এখন বুড়ো হয়ে গেছে। তা হলেও তার হাতের কাজ খুব পাকা।
–ওহে মকবুল! আমার মনে হচ্ছে, ডাইনের রাস্তায় যেতে হবে।
–সার! দুধারে জঙ্গল। কাঁচা রাস্তায় ঘোড়াটার কষ্টও হবে।
-–ঠিক আছে। একটু আস্তেই না হয় চলো। আমরা তো জল-জঙ্গলে ঘুরতেই এসেছি। বখশিস পাবে!
বখশিসের লোভে এক্কাগাড়ি ডাইনের রাস্তায় নিয়ে গেল মকবুল। কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে হয়তো পাখি-প্রজাপতি বা গাছের ডালে পরজীবী অর্কিড খুঁজতে মন দিলেন। মাটির রাস্তাটা সংকীর্ণ। মাঝবরাবর হলুদরঙের ঘাস এবং তার দুপাশে ধুলোয় মোটরগাড়ির টায়ারের দাগ। জিজ্ঞেস করলে মকবুল আমাকে বলল,–চোরেরা রাতবিরেতে জঙ্গলের গাছ কাটে। কাঠগোলা থেকে লরি এসে সেই কাঠ নিয়ে যায়। কখনও থানাপুলিশ হয় সার! অভাবী লোকেরা পেটের দায়ে চোর হতেই পারে। কিন্তু আসল চোর তো কড়ি-কাঁড়ি টাকা নিয়ে বসে আছে। তাদের ধরে কে?
প্রায় এক কিলোমিটার চলার পর কাঁচারাস্তাটা ডাইনে বাঁক নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। এক্কাগাড়িটা এবার পিচরাস্তায় উঠল। কর্নেল বাইনোকুলারে সামনেটা দেখে নিয়ে বললেন,–ইরিগেশন বাংলো দেখা যাচ্ছে। জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির সঙ্গে বছর তিনেক আগে ওই বাংলোতে উঠেছিলুম।
বললুম,–তা হলে তো আপনার চেনা জায়গা!
–কতকটা। নৌকো করেই ঘুরেছিলুম। সেটা ছিল ডিসেম্বর মাস। সাইবেরিয়ান হাঁস দেখেছিলুম। ছবি তোলার সুযোগ পাইনি। তা ছাড়া, কনকপুরেও যাওয়া হয়নি। মিঃ রায়চৌধুরিও বলেননি, কনকপুরে তার আত্মীয় আছেন। গত পরশু তার টেলিফোন পেয়ে সেটা জেনেছি।
–ভদ্রলোক সম্ভবত তার মাসতুতো দাদাদের এড়িয়ে চলেন। তাই না? কর্নেল চাপাস্বরে বললেন,–তা-ই বা বলি কেমন করে? রায়বাড়ির রহস্যজনক চুরির ঘটনা সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ লক্ষ করেছি। পুলিশের উঁচুতলায় তার প্রভাব সত্ত্বেও সুদর্শনবাবুকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন।
এবার আমাদের ওপর উত্তরের বাতাস এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। মকবুলের মন এখন তার হাড়জিরজিরে টাটুর দিকে। প্রবল বাতাস ঠেলে পা বাড়াতে বেচারার কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। কর্নেল মকবুলকে বারবার বলছিলেন, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ইচ্ছেমতো ওকে চলতে দাও!
বললুম,–জঙ্গল এলাকাটা বিশাল মনে হচ্ছে।
কর্নেল বললেন, সরকারি বনসৃজন স্কিমের ব্যাপার। এখানকার মাটি খুব উর্বর। সেবার এসে এত ঘন জঙ্গল দেখিনি।
–তা হলে ফরেস্টবাংলো নিশ্চয় কোথাও আছে?
–আছে। ওই কাঁচারাস্তা দিয়ে এগোলে কমপক্ষে তিন কিলোমিটার দূরে। রাস্তার অবস্থা তো দেখলে! রাস্তা পাকা হতে কত বছর লাগবে কে জানে! সরকারি ব্যাপার।
পিছন ফিরে দেখে নিয়ে বললুম,–কনকপুর দেখা যাচ্ছে। জঙ্গল ঘুরে না এলে কখন পৌঁছে যেতুম।
কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। রাস্তার বাঁদিকে পশ্চিমে বিস্তীর্ণ ধানখেতে পাকা ধান কাটছে লোকেরা। ডানদিকে জঙ্গল থেকে একটা জলভরা খাল বেরিয়ে রাস্তার সমান্তরালে চলেছে। বাংলোটা মনোরম। পিছনের দিকে, উত্তরে ও পূর্বে বিশাল জলাধার। বাতাসে উত্তরঙ্গ সেই জলাধারে দূরে কয়েকটা নৌকো দেখা যাচ্ছিল।
