কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ধনবান রত্নব্যবসায়ীর কর্মচারী। কাজেই ফরেন্সিক এক্সপার্টরা আসবেন বইকি। আমি নিছক হাতুড়ে এসব ব্যাপারে।
–হাতের তাস আপনি দেখাবেন না। তা জানি!
কর্নেল হাসলেন।–দেখলুম, লোকটার কাপ থেকে একটুখানি চা পড়ে গিয়েছিল। খুব গরম চা ফুঁ দিয়ে খেতে গেলে এমনটা হতেই পারে। আসলে সে শিগগির চা খেয়ে নিয়ে হাতের কাজ শেষ করতে চেয়েছিল।
নরেশবাবু বললেন,–কাঞ্চনবাবু নিজেই চা তৈরি করে খেতেন। কেরোসিন কুকার আর চায়ের সরঞ্জাম দেখেই তা বোঝা যায়। খেতেন হোটেলে। কারণ চাল-ডাল বা রান্নার পাত্র দেখছি না।
কর্নেল ঘরের ভিতর আবার একবার ঘুরে দেখে নিয়ে বললেন,নরেশবাবু! কেউ কাঞ্চন সেনের ঘর থেকে কিছু নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে খুন করেনি। সে কাঞ্চনবাবুকে খুন করতেই এসেছিল। আর-একটা কথা। সে এই কাজের জন্য রবিবার সন্ধ্যাটা বেছে নিয়েছিল। খুনের নিরাপদ জায়গা কাঞ্চনবাবুর এই ঘর, তা সে বুঝতে পেরেছিল।
–আপনি কি বলতে চান, খুনি আগে থেকে টেলিফোনে কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করেই এসেছিল?
–তা আর বলতে? আচ্ছা, চলি নরেশবাবু! বলে কর্নেল ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকলেন। তাকে অনুসরণ করতে আমার অবস্থা শোচনীয় বললে ভুল হয় না।…
.
সে-রাত্রে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পর তাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, কাঞ্চন সেনকে কারও খুন করার মোটিভ কি থাকতে পারে? আমার ধারণা, কেউ কোনো বিষয়ে তার মুখ চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। তাই না?
কর্নেলকে বড় বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি অন্তর্যামী নই, জয়ন্ত!
–কী আশ্চর্য, আপনি যেন কোনো কারণে বেজায় চটে গেছেন! খুনির প্রতি, নাকি আমার প্রতি?
আমি কৌতুকের মেজাজেই বলেছিলুম কথাটা। লক্ষ করেছিলুম, কর্নেলের স্বভাবসিদ্ধ কৌতুকের মেজাজও নেই। তিনি বলেছিলেন,জয়ন্ত! আমি নিজের প্রতি নিজেই চটে গেছি।
–সে কি!
–একচক্ষু হরিণের গল্পটা নিশ্চয় তুমি জানো! আমি হঠাৎ কী করে একচক্ষু হরিণ হয়ে গিয়েছিলুম বুঝতে পারছি না।
–একটু খুলে বলবেন কি?
–খিদে পেয়েছে। ষষ্ঠী! এগারোটা বাজতে চলল! খেয়াল আছে?
ষষ্ঠী পর্দার পিছনেই ছিল। উঁকি মেরে বলল,–আপনি বসে-বসে চুরুট খাচ্ছেন বাবামশাই! আপনিই বলেন, চুরুট খাওয়ার সময় আমি যেন আপনাকে ডিসটাপ না করি।
কর্নেল তখনই চুরুট অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।–চুপ হতভাগা! খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেলে এবার থেকে ডিসটাপ করবি। উঠে পড়ো জয়ন্ত! নাকি তোমাকে ডিসটাপ করে ফেললুম?
এবার স্বাভাবিক আবহাওয়া ফিরে এসেছিল। বলেছিলুম,–ষষ্ঠীকে আপনি বাংলা পড়িয়েছেন। ইংরেজিও নাকি পড়াতে চান। তার আগে ওর ডিসটাপ-টা শুধরে দেবেন।
–তোমাকে ওই দায়িত্বটা দিলুম। বলে কর্নেল বাথরুমে ঢুকেছিলেন।
সে-রাতে বিছানায় শুয়ে কাঞ্চন সেনের হত্যাকাণ্ডে কর্নেলের নিজের প্রতি চটে যাওয়া এবং নিজেকে একচক্ষু হরিণ বলার কারণ খুঁজতে নাকাল হয়েছিলুম। শুধু এটুকু বোঝা যায়, কাঞ্চন সেনকে কেউ খুন করতে পারে, কর্নেল নিশ্চয় তা ভাবেননি। কিন্তু কাঞ্চন সেন খুন হওয়ার পর তাঁর হয়তো মনে হয়েছে, এরকম একটা শোচনীয় সম্ভাবনার কথা তার মাথায় এলেও যে-কোনো কারণে হোক, সেটা তিনি তখন গ্রাহ্য করেননি। পরে তাই তার অনুশোচনা হয়েছে।
কর্নেল তার অ্যাপার্টমেন্টে আমার রাত্রিবাসের সময় একবার বলেছিলেন,–ডার্লিং! ইংরেজিতে একটা প্রবচন আছে, তার মোদ্দা মানেটা হল : রাত্রিকালে যে-সব চিন্তাভাবনা আসে, সেগুলোর বিরুদ্ধে সতর্ক থেকো “Beware of the thoughts, come in night।” সতর্ক না থাকলে অনিদ্রার রোগে ভুগবে।
লাইনটা মনে পড়ে গেলে সতর্ক হয়েছিলুম বটে, কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ নয়। সকাল থেকে রাত্রি–পুরো একটা রবিবার ঘটনার পর ঘটনার ধাক্কায় এ যাবৎ অসংখ্যবার বিপর্যস্ত হয়েছি। এটা নতুন কিছু নয়। তবু শুধু মনে ভেসে উঠছিল, কাঞ্চন সেনের করুণ মুখে বলা শেষ কথাটা : স্যার! দয়া করে শুধু একটা কথা মনে রাখবেন। আমার প্রাণ এখন আপনার হাতে।
কর্নেলের একসময় একটা লালরঙের ল্যান্ডরোভার গাড়ি ছিল। গাড়িটা কবে বেচে দিয়েছেন। কিন্তু গ্যারেজটা কাউকে ভাড়া না দিয়ে খালি রেখেছেন। আমার ফিয়াট গাড়িটা সেখানেই রাত্রিযাপন করে। গ্যারেজের চাবি ষষ্ঠীর জিম্মায় থাকে।
পরদিন সকাল নটায় ব্রেকফাস্টের পর কর্নেল বললেন, তুমি তোমার সল্টলেকের ফ্ল্যাটে গিয়ে সোয়েটার-জ্যাকেট-টুপি-মাফলার এইসব গরম পোশাক-আশাক নিয়ে এসো। তোমার লাইসেন্সড আর্মস সঙ্গে থাকা দরকার। তোমার গাড়িতেই ফিরে আসব। গাড়িটা আমার গ্যারেজ থাকবে। ট্যাক্সির ওপর ভরসা করা ঠিক হবে না…..
শেয়ালদা স্টেশনে এগারোটা পঁচিশের ট্রেনে তত বেশি ভিড় ছিল না। কর্নেলের সেই চিরাচরিত ট্যুরিস্টের বেশ। পরনে জ্যাকেট, পায়ে হান্টিং বুটজুতো। গলা থেকে ঝুলন্ত ক্যামেরা আর বাইনোকুলার পিঠে সাঁটা সেই কালো কিটব্যাগ, যেটার মাথার দিকে প্রজাপতিধরা জালের হাতল বেরিয়ে তার বাঁ-কাঁধের ওপর দিয়ে বেখাপ্পা খুদে ছড়ির মতো দেখাচ্ছিল। আর-একটা ব্যাগ তার পোশাক-আশাক ইত্যাদিতে ঠাসা। লক্ষ করছিলুম, যাত্রীরা তাকে লক্ষবস্তু করে ফেলেছে। এটা অবশ্য সবখানেই দেখে আসছি।
