পুলিশের একটা বেতার ভ্যান আর দুটো জিপ ডানদিকে একটা ছ’তলা বাড়ির সামনে দাঁড় করানো ছিল। কর্নেলকে দেখে সেই পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে নমস্কার করলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, স্যার! আপনি এখানে?
–প্রণব! তোমাদের বড়বাবু আর লালবাজারের ও. সি. হোমিসাইড কোথায়?
-–ওঁরা একটু আগে চলে গেছেন স্যার!
–ভিকটিমের বডি?
–আধঘণ্টা আগে মর্গে পাঠানো হয়েছে।
-–আমি ভিকটিমের ফ্ল্যাটটা দেখতে চাই। লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কেউ আসেননি?
প্রণববাবু কথা বলতে-বলতে সিঁড়িতে উঠছিলেন। বললেন,–ডি. ডি. থেকে এস. আই. নরেশবাবু আর দুজন অফিসার এসেছেন। ভিকটিম বিখ্যাত জুয়েলারি কোম্পানির কর্মচারী। কাজেই কর্নেলসায়েবের আবির্ভাবে আমি অবাক হইনি। নরেশবাবুরাও হবেন না!
বললুম–ছ’তলা বাড়ি। লিফট নেই?
–প্রাচীন আমলের বাড়ি। তবে ভিকটিম ভদ্রলোক থাকতেন তিনতলার একটা ঘরে। ফ্ল্যাটবাড়ি বলা যায় না। তবে অ্যাটাচড বাথরুম আছে।
তিনতলার টানা বারান্দা দিয়ে এগিয়ে যেতেই নরেশ ধরকে দেখতে পেলুম। তিনি কর্নেলকে দেখে বললেন,–, যা ভেবেছিলুম। চন্দ্ৰসায়েবের একটা কেসে স্বনামধন্য কর্নেলসায়েব লড়েছিলেন। অতএব এই কেসে তাঁকে দেখতে পাব, এটা স্বাভাবিক।
কর্নেল হাসলেন। আশা করি অরিজিতের কানেও খবরটা মিঃ চন্দ্র তুলেছেন?
–ডি. সি. ডি. ডি. সায়েবের তাড়া খেয়েই আমাদের ছুটে আসতে হয়েছে। উনি আপনাকেও নিশ্চয় একটু উঁকি মারতে বলেছেন?
–না নরেশবাবু। অরিজিৎ লাহিড়ি এই বৃদ্ধের দাড়ি ধরে টানেননি। যাকগে। চলুন। ঘরটা একটু দেখে নিই।
নরেশবাবুর পিছনে কর্নেল ও আমি মোটামুটি চওড়া ঘুরে ঢুলুম। দুজন অফিসার ঘরের ভিতর কিছু করছিলেন। আমাদের দেখে তারা ভুরু কুঁচকে তাকালেন। নরেশবাবু বললেন–ওহে
আলম! এঁকে চিনতে পারছ কি?
একজন অফিসার কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন-আমার সৌভাগ্য! কর্নেলসায়েবের সঙ্গে আলাপের সুযোগ পেলুম।
অন্যজন নমস্কার করে বললেন,–কর্নেলসায়েব আমাকে হয়তো চিনতে পারবেন। আমি মানিক দত্ত। এন্টালি থানায় ছিলুম।
কর্নেল ঘরের ভিতর চোখ বুলিয়ে বললেন,–কাঞ্চনবাবু একা থাকতেন?
নরেশবাবু বললেন, হ্যাঁ। কথায় বলে, একা না বোকা!
কর্নেল ডানদিকে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,–মার্ডার এখানেই হয়েছে। নরেশবাবু! বডি কী অবস্থায় ছিল?
–বাথরুমের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়েছিলেন ভদ্রলোক। পা-দুটো বাথরুমের দরজার বাইরে। মাথার পিছনে প্রায় পয়েন্টব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি করেছে খুনি।
–পাশের ঘরের কেউ গুলির শব্দ শোনেনি?
–পাশের দুটো ঘরে দুজন করে চারজন থাকেন। ও দুটো ঘরকে মেস বলা যায়। চারজনই বাঙালি। হুগলি, হাওড়া, বর্ধমানে বাড়ি। বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী ওঁরা। শনিবার বিকেলে বাড়ি চলে যান। ফেরেন সোমবার সকালে। তার ওপাশে সিঁড়ি। তারপর চারটে ঘরে এক মারোয়াড়ি ফ্যামিলি থাকেন। কাঞ্চনবাবুর ঘরে সকাল-সন্ধ্যা লোজন আসতে দেখেছেন ওঁরা। আর গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া এই এলাকায় আজ রোববারেও সম্ভব নয়, তা নিজেই বুঝে নিন। মোটরসাইকেলের শব্দ তো সব সময়। তার ওপর নীচের তলায় একটা লোহালক্কড়ের দোকান। রোববারেও লোহার পাত কাটার শব্দ শুনছিলুম। বিরক্ত হয়ে বন্ধ করতে বলেছি।
কর্নেল কোণের দিকে খাটের পাশে টেবিলে একজন মহিলার ছবি দেখে বললেন,–কাঞ্চনবাবুর স্ত্রী সম্ভবত।
নরেশবাবু বললেন,–হ্যাঁ, সম্ভবত। কাঞ্চনবাবুর দেশের বাড়ির ঠিকানায় খোঁজ নিলে জানা যাবে।
–দেশের বাড়ির ঠিকানা পেয়েছেন তা হলে?
–একটা চিঠি থেকে পাওয়া গেছে। কাঞ্চনবাবুর দাদা প্রাণকান্তবাবুর চিঠি। ভাইকে পুজোর সময় বাড়ি যেতে লিখেছেন। টাকাকড়িও চেয়েছেন।
-–ঠিকানাটা দিতে আপত্তি আছে?
নরেশবাবু হাসলেন।–কক্ষনও না। ডি. সি. ডি. ডি. সায়েব শুনলে আমার চাকরি যাবে। লিখে নেবেন কি?
কর্নেল পকেট থেকে খুদে নোটবই আর জুটপেন বের করলেন।–বলুন।
–গ্রাম রানিপুর, পোস্ট অফিস কনকপুর, জেলা নদিয়া।
কনকপুর শুনে আমি চমকে উঠেছিলুম। কর্নেল নির্বিকারমুখে নাম-ঠিকানা লিখে বললেন, –ছোট একটা সোফাসেট আছে দেখছি। সেন্টার টেবিলে দুটো চায়ের কাপ। চা শেষ করে কাঞ্চনবাবু বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর গেস্ট তাকে গুলি করেছে। তো ডেডবডি প্রথম কে দেখেছিল?
নরেশবাবু বললেন,–মারোয়াড়ি ফ্যামিলির একটা বাচ্চা ওদের বারান্দায় খেলনা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে খেলছিল। তার দিদি সিঁড়ির মাথা থেকে বল ছুড়ছিল। তারপর বলটা এই ঘরের বারান্দায় এসে পড়েছিল। কিন্তু এখানে বারান্দায় তখন আলো ছিল না। তাই ওরা এখানে আসতে ভয় পাচ্ছিল। তখন মেয়েটির দাদা মোহনলাল বল কুড়াতে আসে। দরজা অর্ধেক খোলা। অথচ ভিতরে অন্ধকার। তার সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক।
কর্নেল টেলিফোন দেখিয়ে বললেন,–ওটা কি ডেড?
নরেশবাবু টেবিলের পিছন থেকে ছেঁড়া তার তুলে দেখলেন।–খুব হুঁশিয়ার খুনি। ঘরের আলোও নিভিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দরজার কপাট পুরো লাগানোর হয়তো সময় পায়নি।
কর্নেল সোফার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে টর্চ জ্বাললেন। তারপর আতশকাঁচ দিয়ে কিছুক্ষণ কী সব পরীক্ষা করলেন, তিনিই জানেন। নরেশবাবু মুচকি হেসে বললেন,–ফরেন্সিক এক্সপার্টদের জন্য অপেক্ষা করছি। দেখা যাক, তার আগে কর্নেলসায়েবের শ্যেনচক্ষুতে খুনির কোনো ক্ল মেলে কি না।
