কর্নেল সেচদফতরের এক কর্তাব্যক্তির বাড়িতে টেলিফোন করে কনকপুর ইরিগেশন বাংলোয় থাকার ব্যবস্থা করে নিলেন।
পাঁচটায় দ্বিতীয় দফার কফি দিয়ে গেল ষষ্ঠীচরণ। তখন আলো জ্বলে উঠেছে। শীত না পড়লেও ততক্ষণে সন্ধ্যার আমেজ এসে গেছে। কফি খেতে-খেতে বললুম,–আচ্ছা কর্নেল, আপনি কাঞ্চন সেনের কথার সত্যতা যাচাই করবেন বলছিলেন। কীভাবে করবেন?
কর্নেল হাসলেন।–করব না।
–সে কী! তা হলে ভদ্রলোককে কার্ডটা তখনই ফেরত দিলেই পারতেন।
–জয়ন্ত! কাঞ্চন সেন আমাকে মিথ্যা ঠিকানা দিলে আমার শর্ত শোনার পর দ্বিধায় পড়ে যেতেন। ওঁর মুখে কোনো দ্বিধার চিহ্ন দেখতে পাইনি। তা ছাড়া, উনি ওঁর মালিকের কাছে আমার পরিচয় পেয়েছেন। আমার সঙ্গে ছলচাতুরির সাহস ওঁর নেই।
–কী আশ্চর্য! তা হলে কার্ডটা…
আমাকে থামিয়ে দিয়ে কর্নেল বললেন,–তবু আমি রিস্ক নিতে চাইনি। যেন সত্যিই আমি ওঁর দেওয়া নাম-ঠিকানার সত্যতা যাচাই করব, এ জন্য আমার সময় দরকার–এই কৌশলটুকু এক্ষেত্রে প্রয়োগ করতেই হয়েছে।
একটু ইতস্তত করে বললুম–কাঞ্চন সেন সুদর্শনবাবুর নাম-ঠিকানা দেননি এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–তোমার নিশ্চিত হওয়ার কারণ?
–কার্ড রাখার কথা পকেটে। ব্যাগের ভিতরে কেউ কার্ড রাখে না।
–কিন্তু সুদর্শনবাবুর ব্যাগ থেকেই কার্ডটা নীচে পড়েছিল।
–কনকপুর গিয়ে সুদর্শনবাবুকে জিজ্ঞেস করা উচিত।
–চেপে যাও জয়ন্ত! এর পর সুদর্শনবাবুর সঙ্গে দেখা হলে যেন কখনও কার্ডের কথা তুলবে না।
–হালদারমশাইকে নিষেধ করেননি। কিন্তু উনি যদি জিগ্যেস করেন?
–হঠকারী হলেও হালদারমশাই বুদ্ধিমান। বিচক্ষণ পুলিশ অফিসার ছিলেন। তুমি ওঁকে নিয়ে যতই কৌতুক করো, নিজের কাজে উনি যথেষ্ট সিরিয়াস।
বলে কর্নেল ড্রয়ার থেকে প্রজাপতির রঙিন ছবির খাম বের করলেন। সকালে এই ছবিগুলো আমাদের তিনি দেখাচ্ছিলেন। বক্তৃতা শোনার ভয়ে আমি সটান বাথরুমে গেলুম। তারপর ফিরে আসার সময় একটা বুকশেলফের উপর অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকা কয়েকটা বই খুঁজে অবিশ্বাস্যভাবে একটা মলাটছেঁড়া ইংরেজি গোয়েন্দা উপন্যাস পেয়ে গেলুম।
কিন্তু কর্নেল নিজের কাজে ব্যস্ত। একেকটা ছবি টেবিলল্যাম্পের আলোয় রেখে আতশকাঁচ দিয়ে কী দেখে-টেখে একটা প্যাড়ে কী সব লিখে চলেছেন। বুঝলুম, এর পর সময়মতো একটা প্রবন্ধ লিখে ছবিগুলো সঙ্গে দিয়ে কোনো বিদেশি পত্রিকায় পাঠাবেন। শুনেছি, তার এসব প্রবন্ধের বাজারদর কমপক্ষে একশো মার্কিন ডলার।
রাত নটার মধ্যে তার কাজ শেষ হল। তারপর ছবি ও কাগজপত্র গুছিয়ে ড্রয়ারে ভরার পর তিনি চুরুট ধরালেন। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে কিছুক্ষণ চুরুট টানার পর হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন এবং টেলিফোনটা কাছে টেনে আনলেন। বুকপকেট থেকে ভাজকরা একটা কাগজ খুলে দেখে রিসিভার তুলে কর্নেল ডায়াল করতে থাকলেন।
বুঝলুম, এনগেজড টোন। কর্নেল কয়েকবার ডায়াল করার পর বিরক্ত হয়ে রিসিভার রেখে দিলেন। বললুম,–সম্ভবত কাঞ্চন সেনকে ফোনে পাচ্ছেন না।
কর্নেল ঘুরে আমার দিকে তাকালেন। তুম্বো মুখে বললেন, আমার হাতে ব্যথা ধরে গেছে জয়ন্ত! এখানে এসো। এই নাম্বারটা ধরে দাও।
তাঁর কাছাকাছি সোফায় বসে তার নির্দেশমতো একটা নাম্বার ডায়াল করলুম। এনগেজড। মিনিট তিনেক পরে আবার ডায়াল করলুম। এনগেজড। তৃতীয়বার চেষ্টার পর বললুম–টেলিফোনটা খারাপ।
কর্নেল এবার নিজে রিসিভার তুলে একটা নাম্বার ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বললেন,–মিঃ এ. এম. চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলতে চাই।…আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…মিঃ চন্দ্র! আপনার কোম্পানির এজেন্ট কাঞ্চন সেন…ও মাই গড! বলেন কী? কখন?…জাস্ট আ মিনিট মিঃ চন্দ্র। পুলিশকে কি আপনি তার কার্ড সম্পর্কে কিছু বলেছেন?…আপনি বুদ্ধিমান। …ও. কে.! ও. কে.! আমি দেখছি।..হ্যাঁ। আমি ওঁর বাড়িতে এখনই যাচ্ছি। …হ্যাঁ। পুলিশকে জানিয়েই যাচ্ছি।… আপনি ভাববেন না। কার্ড আপনি যথাসময়ে ফেরত পাবেন। রাখছি।
হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। বললুম,–কাঞ্চন সেনের কী হয়েছে?
কর্নেল ডায়াল করতে-করতে বললেন,–কাঞ্চনবাবুকে কেউ তার ঘরে গুলি করে মেরেছে।
তারপর তিনি টেলিফোনে সাড়া পেয়ে বললেন,–কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি! ও. সি. হোমিসাইড মিঃ সান্যালের সঙ্গে কথা বলতে চাই। … বেরিয়েছেন? ঠিক আছে।
টেলিফোন ছেড়ে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,–জয়ন্ত! রেডি হয়ে নাও। কুইক! আমি পোশাক বদলে নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণ পরে আমরা নীচে গেলুম। তারপর গাড়িতে চেপে বললুম,–কনকপুরের রায়বাড়ির অদ্ভুত কেসে হাত দিতে না দিতেই একটা বডি পড়ে গেল!
কর্নেল আমার কথা কানে নিলেন বলে মনে হল না। বললেন,–পার্ক স্ট্রিট হয়ে ডাইনে ঘুরে গিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ হয়ে চলো। তারপর হ্যারিসন রোডসরি, পুরোনো নামটা মাথায় গেঁথে আছে–
–বুঝেছি। মহাত্মা গান্ধী রোডে পৌঁছে চিৎপুরের দিকে এগোব। তবে ওই এলাকায় রবিবারে বলে কিছু নেই। জ্যামে পড়তেই হবে।
কর্নেল কোনো কথা বললেন না। আপার চিৎপুর রোড এখন রবীন্দ্র সরণি। কর্নেল নাম্বার লক্ষ করছিলেন। সংকীর্ণ রাস্তায় ট্রাম বাস ট্রাক ঠেলাগাড়ি রিকশার ভিড়। কর্নেল রাস্তায় একটা লোককে রামপদ শেঠ লেনের কথা জিজ্ঞেস করলে সে সামনের দিকে তর্জনী তুলল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে গলিটার মোড়ে পৌঁছলুম। গলির ভিতরে ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে আলো। কিন্তু পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে প্রাণপণে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার গাড়িতে ‘প্রেস’ স্টিকার লাগানো দেখে একজন কনস্টেবল বাঁ-দিকের এক চিলতে ফুটপাতের উপর গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। বা-দিকে দুটো চাকা সেই ফুটপাতে ওঠালুম। কর্নেল নেমে গিয়ে বললেন,–গাড়ি লক করে এসো! একজন চেনা পুলিশ অফিসারকে দেখতে পাচ্ছি।
