কাঞ্চন সেন এবার চাপাস্বরে বললেন,–অসম্ভব ব্যাপার স্যার। জোর দিয়ে বলছি, এটা অসম্ভব। আমাকে যিনি গোপনে খবর দিয়ে যেতে বলেছিলেন, আপনার কাছে তার আসবার কথা নয়। মিঃ চন্দ্রের কাছে আপনার পরিচয় পেয়েছি স্যার!
–ঠিক আছে। আপনি সেই ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা এই কাগজে লিখে দিন। আপনার টেলিফোন নাম্বারও লিখবেন। আমি আজ রাত্রের মধ্যে আপনার কথার সত্যতা আমার বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে কোনো কৌশলে যাচাই করে নেব। আপনার কথা সত্য হলে আপনি কার্ড পাবেন। আমি আপনার টেলিফোনে আপনাকে খবর দেব।
কাঞ্চন সেন ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু ভেবে নিলেন। তারপর কর্নেলের দেওয়া কাগজে কিছু লিখে কর্নেলকে দিলেন। তারপর করুণ মুখে ভাঙা গলায় বললেন, স্যার! দয়া করে শুধু একটা কথা মনে রাখবেন। আমার প্রাণ এখন আপনার হাতে।
কথাটা বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল কাগজটা ভাঁজ করে বুকপকেটে ঢোকালেন। তারপর হালদারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে সকৌতুকে বললেন–আপনার কথা ঠিক হালদারমশাই! হেভি মিস্ত্রি।
কাঞ্চন সেন চলে যাওয়ার পর আমি ও হালদারমশাই কর্নেলের কাছে সেই নাম-ঠিকানা জানতে চেয়েছিলুম। কিন্তু কর্নেল গম্ভীর মুখে বলেছিলেন,–ভদ্রলোককে কথা দিয়েছি এটা গোপন থাকবে। কাজেই এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নয়।
হালদারমশাই বলেছিলেন–আপনিও কইলেন হেভি মিস্ট্রি। তা হইলে এবার আমি কী করুম কন কর্নেলস্যার!
এ কথা শুনে কর্নেলের গাম্ভীর্য চিড় খেয়েছিল। সহাস্যে বলেছিলেন, আমার মতো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ঠিক হবে না হালদারমশাই! অবশ্য বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে দুর্লভ প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি বা অর্কিডের খোঁজ পেলে আমার বরং লাভই হয়। তো আপনার সাহায্য নিশ্চয় আমার দরকার। এক মিনিট।
বলে তিনি টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করেছিলেন। তারপর সাড়া পেয়ে বলেছিলেন–মিঃ রায়চৌধুরি? কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। …হ্যাঁ। সুদর্শনবাবু এসেছিলেন। ফেরার সময় আপনার সঙ্গে দেখা করেও গেছেন। …না। উনি আমাকে বলেননি। তবে আমার হাতে সে-খবরও আছে। বলে কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর বললেন,–যথাসময়ে বলব। এখন একটা জরুরি কাজের কথা বলতে চাই। আপনি তো বুঝতেই পারছেন, আমার বয়স থেমে নেই। এই বৃদ্ধ বয়সে আগের মতো একা কোনো কাজে নামতে ভরসা পাই না। আমাকে সাহায্য করেন একজন ধুরন্ধর ডিটেকটিভ। তিনি প্রাক্তন পুলিশ অফিসার। রিটায়ার করার পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এজেন্সি খুলেছেন। তাঁর নাম মিঃ কে. কে. হালদার। …তা হলে সুদর্শনবাবু তার কথা আপনাকে বলেছেন? এবার শুনুন। সুদর্শনবাবুকে তখনই যে-কথা বলা দরকার ছিল, বলিনি। কিন্তু ইতিমধ্যে কিছু তথ্য আমার হাতে এসে গেছে। তাতে মনে হচ্ছে, কেসটা জটিল।…বললুম তো! যথাসময়ে জানতে পারবেন। আপনাকে আমি একটা অনুরোধ করছি। সুদর্শনবাবুকে ট্রাঙ্ককলে জানিয়ে দিন, কাল সোমবার যে-কোনো সময়ে মিঃ হালদার তার সঙ্গে দেখা করবেন। মিঃ হালদারের ডিটেকটিভ এজেন্সির কনট্র্যাক্ট ফর্মে তাকে একটা সই করতে হবে। এই ফর্মালিটিজ উভয়ের স্বার্থেই মেনে চলা দরকার। তবে চুক্তিপত্রে সইয়ের ব্যাপারটা গোপনে হওয়া উচিত। ঘুণাক্ষরে কেউ যেন টের না পায়। চুক্তিপত্রে সই করলে সুদর্শনবাবু হবেন মিঃ হালদারের ক্লায়েন্ট। …হ্যাঁ, টাকার প্রশ্ন আছে। তবে টাকার অঙ্ক যাই হোক, সুদর্শনবাবু যেন সই করতে দ্বিধা না করেন। তবে নেহাৎ অ্যাডভান্স হিসেবে আপাতত একশো টাকা না দিলে মিঃ হালদারের অসুবিধে হবে।..হা। তা হলে আপনি বরং একটা চিঠি লিখে দেবেন মিঃ হালদারকে। এখনই আপনার কাছে মিঃ হালদারকে পাঠাচ্ছি। তবে আপনি ট্রাঙ্ককলে সুদর্শনবাবুকে শুধু জানিয়ে রাখবেন, তার পরিচিত এক ভদ্রলোক আমার পক্ষ থেকে তার কাছে যাবেন। ব্যস!… ধন্যবাদ মিঃ রায়চৌধুরি। মিঃ হালদার তাঁর সরকারি আইডেন্টিটি কার্ড নিয়েই আপনার কাছে যাচ্ছেন।…ঠিক আছে। রাখছি।…
ইতিমধ্যে ষষ্ঠীচরণ কফি এনেছিল। কফি পানের পর হালদারমশাই যথেষ্ট চাঙ্গা হয়ে উঠেছিলেন। কর্নেল বলেছিলেন,–মিঃ জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির বাড়ি আপনি ভবানীপুরে দেখে এসেছেন।
হঃ। দেখছি। বলে গোয়েন্দাপ্রবর সবেগে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।
কর্নেল বলেছিলেন,–একটা কথা হালদারমশাই!
-–কন কর্নেলস্যার!
–আপনার আর আমার কাছে আসবার দরকার নেই। মিঃ রায়চৌধুরির সঙ্গে দেখা করার পর বাড়ি ফিরে আমাকে টেলিফোনে শুধু জানিয়ে দেবেন, কনকপুরে কাল কোন ট্রেনে যাচ্ছেন। কীভাবে যেতে হবে, তা মিঃ রায়চৌধুরির কাছে জানতে পারবেন। কনকপুরে হোটেল থাকা সম্ভব। না থাকলে সুদর্শনবাবুর বন্ধু হিসেবে রায়বাড়িতে থাকতে পারবেন। আমরা দুজনে উঠব সেচদফতরের বাংলোতে। দরকার হলে গোপনে সেখানে যোগাযোগ করবেন। কিন্তু সাবধান হালদারমশাই! কনকপুরে আমরা আপনার অপরিচিত। এই কথাটা সবসময় মনে রাখবেন। বুঝলেন তো?
–বুঝেছি কর্নেলস্যার।
বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ পর্দা ফুঁড়ে উধাও হয়ে গেলেন।
.
বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ হালদারমশাইয়ের ফোন এল। জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরি তাঁকে সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের ট্রেনে কনকপুর যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। কনকপুর স্টেশন থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। সাইকেলরিকশা, বাস, অটো সবই পাওয়া যায়।
