কর্নেল প্যাডটা দিলেন। দেখলুম, লেখা আছে ১৩-বি, রামপদ শেঠ লেন, কলকাতা ৭। বললুম,–কলকাতা ৭ কোন এলাকা?
–বড়বাজার। বলে কর্নেল হাত বাড়িয়ে টেবিলের কোনায় রাখা টেলিফোন গাইডের উপর থেকে একটা আকার ছোট কিন্তু মোটাসোটা বই টেনে নিলেন। লক্ষ করলুম, বইটার নাম কলকাতার পথ নির্দেশিকা। কর্নেল পাতা উল্টে খুঁজে দেখার পর বললেন,–গলিটা আপার চিৎপুর রোড থেকে শুরু হয়েছে। এটা অনেক পুরোনো স্ট্রিট গাইড। তা হোক। রামপদ শেঠ লেন খুঁজে বের করার অসুবিধে নেই। আপার চিৎপুর রোডে ঢুকলেই ~য়ে যাব।
অবাক হয়ে বললুম,–কাঞ্চনবাবু তো আসছেন। তার বাড়ি খুঁজতে যাওয়ার কথা বলছেন কেন?
কর্নেল গাইড বুকটা যথাস্থানে রেখে আস্তে বললেন,–দরকার হতেও পারে।
এই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল অভ্যাসমতো হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!
একটু পরে যিনি সবেগে ঘরে ঢুকলেন, তিনি কাঞ্চন সেন নন। আমাদের হালদারমশাই। তিনি সোফায় বসে বললেন,–সুদর্শনবাবুকে ফলো করছিলাম। উনি ট্যাক্সি ধরছিলেন। আমিও একখান ট্যাক্সি ধরলাম। উনি কইছিলেন শেয়ালদা স্টেশনে ট্রেন ধরবেন। কিন্তু উনি চললেন উল্টাদিকে। এক্কেরে ভবানীপুরে। বাড়িটার নাম…
কর্নেল বললেন,–মাতৃধাম?
অবাক হয়ে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–আপনি জানলেন ক্যামনে?
কর্নেল হাসলেন। ওটা ওঁর মাসতুতো ভাই ঝন্টু অর্থাৎ আমার বন্ধু জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরির বাড়ি। বোঝা যাচ্ছে, আমার এখান থেকে বেরিয়ে সুদর্শনবাবু শেষপর্যন্ত আমার কথা মেনে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তো আপনি এখন সম্ভবত শেয়ালদা স্টেশন থেকে আসছেন?
হালদারমশাই শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হুঁঃ!
–আপনার খাওয়াদাওয়া?
–স্টেশনের কাছে একটা হোটেলে খাইয়া লইলাম।
আবার ডোরবেল বাজল। কর্নেল ষষ্ঠীর উদ্দেশে হাঁক দেওয়ার পর আস্তে বললেন, –হালদারমশাই! সম্ভবত এমন কেউ আসছেন, যাঁর সঙ্গে শুধু আমিই কথা বলব। আপনারা দুজনে বরং ডিভানে বসে পত্র-পত্রিকা পড়ার ভান করুন।
হালদারমশাই ও আমি ডিভানে গিয়ে বসলুম। হালদারমশাই দেওয়ালে হেলান দিয়ে খবরের কাগজ খুলে পা ছড়িয়ে বসলেন। আমি একটা রঙিন পত্রিকা খুলে বসলুম। তারপর দেখলুম, একজন রোগাটে গড়নের টাই-স্যুট পরা ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। তার বাঁ-হাতে ব্রিফকেস। তিনি নমস্কার করে বললেন, আমি কে. কে. সেন। মিঃ এ. এম. চন্দ্রের কাছ থেকে আসছি। এই তার চিঠি।
কর্নেল চিঠিটা পড়ে দেখে বললেন,–দাঁড়িয়ে কেন? বসুন মিঃ সেন!
ইনিই তাহলে সেই এজেন্ট। সোফায় বসে তিনি মৃদুস্বরে বললেন,–গত শুক্রবার আমাকে একটা কাজে বাইরে যেতে হয়েছিল। যে ভদ্রলোকের বাড়িতে ছিলুম, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তার বাড়িতেই আমার কার্ডটা কীভাবে দৈবাৎ পড়ে গিয়েছিল। পরদিন অর্থাৎ গতকাল শনিবার ফিরে গিয়ে তাকে ব্যাপারটা জানালুম। তিনি তন্নতন্ন খুঁজলেন। বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু কার্ডের খোঁজ মিলল না। সেই কার্ড আপনার হাতে কীভাবে এল?
কর্নেল বললেন,–যেভাবেই আসুক, আপনার কার্ড আপনি ফেরত পাবেন। কিন্তু আগে আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিন।
–বলুন!
–এই ধরনের সাধারণ কার্ডের বদলে কোম্পানি আপনাদের আইডেন্টিটি কার্ড দেয় না কেন?
–অসুবিধে আছে। কী ধরনের অসুবিধে, তা আপনি মিঃ চন্দ্রের কাছে জেনে নিতে পারেন। এজেন্টদের অনেকসময় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।
–মিঃ চন্দ্রের কাছে জানবার দরকার মনে করছি না। তবে আমার ধারণা, চোরাই জুয়েলারি বেচা-কেনার ক্ষেত্রে এজেন্টদের ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রাখা উচিত। দৈবাৎ পুলিশ এজেন্টের আইডেন্টিটি কার্ড পেয়ে গেলেই বিপদ। তাতে এজেন্টের ছবি থাকে। কাজেই এই কার্ড নিরাপদ।
–ঠিক বলেছেন স্যার।
–এবার আমি জানতে চাই, আপনি শুক্রবার কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার কাছে গিয়েছিলেন! মুখে বলার দরকার নেই। আপনি লিখে দিন। মিঃ চন্দ্রের খাতিরে একথা আমি গোপন রাখব।
কাঞ্চন সেনের মুখে উদ্বেগ ও অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। বললেন, কোম্পানির স্বার্থে এসব কথা আমাদের গোপন রাখতে হয়। প্লিজ স্যার, কার্ড ফিরে না পেলে আমাকে মিঃ চন্দ্র কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবেন। এ বাজারে এমন বেশি মাইনের চাকরি–তা ছাড়া, কমিশনেরও ব্যবস্থা আছে, এটা চলে গেলে বিপদে পড়ব।
আপনি কেন বা কী কাজে সেই ভদ্রলোকের কাছে গিয়েছিলেন, আমি তা জানতে চাইছি না। আপনাকে তো কথা দিচ্ছি, মিঃ চন্দ্র আমার খুব চেনাজানা মানুষ–তার খাতিরে আমি ওকথা গোপন রাখব। হা–আগে আপনাকে কার্ডটা দেখাই।–বলে কর্নেল বুকপকেট থেকে কার্ডটা বের করে দেখালেন।
কাঞ্চন সেন একটু ইতস্তত করে বললেন,–কার্ডটা আপনি কি কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছেন স্যার?
-হ্যাঁ। কুড়িয়ে পেয়েছি।
–কোথায় বলুন তো স্যার?
–যদি বলি, আপনি যেখানে পাদুটো রেকেছেন, সেখানে?
কাঞ্চন সেন নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বললেন,–এটা স্যার অসম্ভব ব্যাপার।
–কেন অসম্ভব? ধরুন, শুক্রবার আপনি যে ভদ্রলোকের কাছে গিয়েছিলেন, তিনি কোনো কারণে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এবং দৈবাৎ পকেট থেকে কিছু বের করতে গিয়ে কার্ডটা পড়ে গিয়েছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি ওটা দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে রেখেছি। তারপর মিঃ চন্দ্রের কাছে গিয়েছি।
