আতঙ্কে টর্চের সুইচ থেকে আঙুল সরে গিয়েছিল। ফের সুইচ টিপে দেখেন, বিদঘুটে মুখটি আর নেই। সাহস করে জানালায় দিয়ে টর্চের আলো ফেলে দেখেন। কিন্তু তাদের কোনও পাত্তা পাননি। শেষে ব্যাপারটা স্বপ্ন ভেবে আর বিশেষ গা করেননি। কিন্তু সকালে ঘরের মেঝেয় ওই ছড়ালেখা একটুকরো কাগজ কুড়িয়ে পান।
তারপর থেকে কিছুদিন অন্তর-অন্তর ওই বিদঘুটে জীবদুটি দুপুররাতে ঘরের জানালায় আবির্ভূত হচ্ছে। ভূতুড়ে গলায় ডিম চাইছে। অনামিকা ভয় পাবে ভেবে তাকে সবটা খুলে বলেননি। শুধু এটুকুই বুঝতে পেরেছেন যে, জীবদুটির ডানা আছে। তা না হলে দোতলায় জানালায় কীভাবে তারা উঁকি দিতে পারে?
এইসময় অনামিকা বলল, গত সপ্তাহে ওদের আমি বাগানে দেখেছি, দাদু। তুমি আরও ভয় পাবে বলে বলিনি। তিনটে পালকও কুড়িয়ে পেয়েছি বাগানে।
কালোবাবু আঁতকে উঠে বললেন, অ্যাঁ! বলিস কী রে?
বুঝলুম দাদু ভেবেছেন নাতনিকে সব খুলে বললে ভয় পাবে এবং নাতনিও ভেবেছে, দাদুকে সব খুলে বললে দাদু ভয় পাবেন।
কর্নেল বললেন, কিন্তু আপনি বাগানের দিকে দৌড়ে যান কেন বলুন তো মুখুয্যেমশাই? কোথায় যান?
কালোবাবু বিকৃত মুখে বললেন, যাব না কেন? ব্যাটারা আমাকে ভয় দেখাবে, আর আমি তাদের ছেড়ে দেব? প্রথমে ভয় পাই বটে, কিন্তু তারপর মাথায় খুন চেপে যায়। তাই লাঠি নিয়ে খুঁজতে যাই ওদের। পেলে এক্কেবারে হাড় গুঁড়ো করে দেব না বুঝি?
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একটু হেসে বললেন, তাহলে বলতে চাইছেন, অত্যন্ত মরিয়া হয়েই বেরিয়ে পড়েন। তাই না?
আলবাত। মরিয়া হব না? রোজ অমনি করে জ্বালাতে আসবে, আর মুখ বুজে সয়ে যাব?
কিন্তু প্রথমে ভীষণ আতঙ্কে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন তো?
কালোবাবু মাথা নেড়ে বললেন, তা পড়ি। আপনি হলে আপনিও পড়তেন।
কালোবাবুর চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল। তারপর নিজেকে শান্ত করে বললেন, হঠাৎ ওকথা, আসছে কেন? আপনার মশাই দেখছি, খালি লোকের মনে খোঁচা দেওয়ার অভ্যেস!
কর্নেল বললেন সরি। কিছু মনে করবেন না মুখুয্যেমশাই। আচ্ছা, আমরা উঠি।
কালোবাৰু গম্ভীর মুখে বসে রইলেন। কোনও কথা বললেন না। আমরা বেরিয়ে এলুম ঘর থেকে। সিঁড়ির কাছে এসে কর্নেল অনামিকাকে বললেন, অনি, সেই পালকগুলো কাগজে মুড়ে আমাকে এনে দাও। পরীক্ষা করা দরকার।
অনামিকা তার ঘর থেকে একটা মোড়ক এনে কর্নেলকে দিল। আমরা ওর কাছে বিদায় নিয়ে কলকাতা ফিরে চললুম। কর্নেল ওকে প্রচুর আশ্বাস দিতে ভুললেন না অবশ্য।
পথে কর্নেল পালকগুলো বের করে দেখতে দেখতে বললেন, পাখিটখি নিয়ে আমিও বিস্তর ঘাঁটি। কিন্তু এ পালক যে কোন পাখির হতে পারে, মাথায় আসছে না।
বললুম, আবার কোন পাখির? হাট্টিম পাখির। আপনি দেখেননি বলে কি হাট্টিম পাখি থাকতে পারে না? পৃথিবীতে বিস্তর আজগুবি জীব থাকতে পারে।
কর্নেল হাসলেন। পারে। কিন্তু লিখতেও পারে কি? কিংবা নিজের ছবি আঁকতে? নিজের নামে ছড়া বানাতে?
হ্যাঁ-সেও একটা কথা। অর্থাৎ পেছনে মানুষ আছে। ধরুন, মানুষটা হাট্টিম দুটোর মালিক।
বেশ তো। কিন্তু কালোবাবুকে সে ভয় দেখাবে কেন?
ভয় কোথায় দেখাল? রসিকতা করছে। আর কালোবাবু রসিকতায় ভয় পাচ্ছেন।
কিন্তু কেন রসিকতা করছে?
এমনি। মানুষের স্বভাব রসিকতা করা। বুড়ো মানুষ—তাতে হয়তো বদরাগী। তাই–
আমার কথায় বাধা পড়ল। পাশ দিয়ে হঠাৎ একটা কালোরঙের মোটর গাড়ি এগিয়ে সামনে চলে এল এবং আমি দুর্ঘটনার আতঙ্কে ব্রেক কষে গাড়ি থামালুম। সামনের গাড়িটাও থেমে গেল। তারপর দুদিক থেকে দুজন মুখোশপরা লোক বেরিয়ে একজন আমার পাশে এবং অন্যজন কর্নেলের পাশে এসে দাঁড়াল। তাদের দুজনের হাতেই রিভলভার। কর্নেলের দিকের লোকটা হিসহিস করে বলল, এই বুড়ো ঘুঘু! শিগগির মোড়কটা দে। নইলে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।
কর্নেল নিরীহ মুখ করে বললেন, কিসের মোড়ক চাইছ বাবা?
মুখোশপরা লোকটা গাড়ির জানালা দিয়ে কর্নেলের কানে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে বলল, ন্যাকা! তখনও কর্নেলের হাতে হাট্টিম পাখির পালকের মোড়কটা রয়েছে। সে সেটা খপ করে অন্য হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। তারপর শাসিয়ে বলল, ফের যদি স্বর্গপুরীতে নাক গলাতে গেছ তো দেখবে কী হয়!
মোড়কটা হাতিয়ে লোকটা করল কী, আমার গাড়ির সামনের টায়ারে রিভলভারের গুলি ছুড়ল। হিস করে শব্দ হল। বুঝলুম, রিভলভারে সাইলেন্সার লাগানো আছে। আমার পাশের লোকটাও আরেকটা টায়ার ফাসিয়ে দিল গুলি ছুড়ে। তারপর কালো গাড়িটাতে চেপে চলে গেল। রাগে দুঃখে অস্থির হয়ে ওই গাড়ির নম্বর টুকতে যাচ্ছি, কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ডার্লিং! ওটা আসল নম্বর নয়। গাড়িতে আসল নম্বর ঝুলিয়ে কেউ এসব কাজ করতে আসে না!
গনগনে রোদে রাস্তার মধ্যে গাড়িটা নিয়ে বিপদে পড়লুম দেখছি। দুধারে ফাঁকা মাঠ। বেরিয়ে টায়ারের অবস্থা দেখতে দেখতে বললুম, কর্নেল! হাট্টিমাটিম টিমের পাল্লায় পড়ে দুটো নতুন টায়ার গচ্চা যাবে জানতুম না। ওঃ! হাত নিসপিস করছে—সঙ্গে আমারও রিভলভার আছে। অথচ টায়ার দুটো ফেঁসে গেল!
যাবে না! কর্নেল বললেন। তোমার দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার কর্তৃপক্ষ কিনে দেবে। কারণ এই হাট্টিমরহস্য কাগজের প্রচার আরও বিশহাজার বাড়িয়ে দেবে। কলম বাগিয়ে তৈরি হও বৎস!
বিরক্ত হয়ে বললুম, আপনার কাছেও তো রিভলভার আছে নিশ্চয়। আমি না হয় হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলুম। আপনি কেন রিভলভার বের করলেন না? ওরা গুলি ছোড়ার আগেই…..
