মিঃ চন্দ্র কর্নেলের কথার উপর একটু থেমে বললেন,–খুলেই বলি। গত বছর আমাদের দোকানে অতবড় একটা চুরির কিনারায় পুলিশ যখন হিমশিম খাচ্ছিল, তখন আপনার সাহায্য নিলুম। আপনি দুদিনেই পাঁচলক্ষ টাকার নেকলেস-সহ চোরকে ধরে দিয়েছিলেন। আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ কর্নেলসায়েব!
কর্নেল দ্রুত বললেন,–ও কথা থাক। কী খুলে বলতে চাইছিলেন, বলুন।
–নানা দেশের রত্নকারবারিদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। খাঁটি মুক্তো আমরা এজেন্ট মারফত কুয়েত, আবু ধাবি, কাতার এইসব আরব দেশ থেকে আমদানি করি। আপনার কাছে লুকোনোর কারণ নেই। কাস্টমসের চোখ এড়িয়ে গোপনে এই লেনদেন হয়। এজেন্টের কাছে। আমাদের কার্ড থাকে। আবার হংকংয়ে আমাদের এজেন্ট আছে। হংকং সবরকমের রত্নের বাজার। হংকংয়ের এজেন্টের কাছে আমাদের কার্ড আছে।
–তা হলে আপনার কোম্পানির কার্ডের একটা গুরুত্ব আছে। সেই কার্ড যে-ভাবে হোক, আমার হাতে এসে গেছে। দেখাচ্ছি, তবে কার্ডটা আপনাকে দেব না। আগেই সেটা বলে রাখলুম।
বলে কর্নেল বুকপকেট থেকে সেই কার্ডটা বের করে মিঃ চন্দ্রের হাতে দিলেন। মিঃ চন্দ্র কার্ডটা দেখার পর বললেন,–কী আশ্চর্য! এই কার্ডটা আমাদের কোম্পানির কার্ড। এই যে দেখছেন, তলার দিকে ছোট্ট গোল রবার সিলের ছাপ, তার উপর আমার হাতে এ এম সি সই করা আছে কালো কালিতে। এটা কোনোভাবে মোছা যাবে না। কারণ পেনের এই কালিটা বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি। কর্নেলসায়েব! এই কার্ড নিশ্চয় আমার কোম্পানির কোনো এজেন্টের কাছে ছিল। এতে একটা নাম্বার আছে, খালি চোখে তা দেখা যাবে না। হাতে সময় কম। তা না হলে নাম্বার পরীক্ষা করে রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে এই এজেন্টের নাম-ঠিকানা বলে দিতুম।
–এজেন্টের কার্ড দৈবাৎ হারিয়ে গেলে তিনি নিশ্চয় আপনাকে জানাবেন? মিঃ চন্দ্র জোর দিয়ে বললেন, অবশ্যই জানাবেন। কিন্তু এখনও তো কেউ জানাননি! এটাই অবাক লাগছে।
–তিনি বা আপনি কার্ড হারানোর জন্য পুলিশকে নিশ্চয় জানাবেন। ডায়রি করবেন থানায়।
মিঃ চন্দ্র হঠাৎ একটু দমে গেলেন যেন। আস্তে বললেন,–না, তার অসুবিধে আছে। কারণ আপনি আশা করি অনুমান করতে পারছেন। রত্নব্যবসায়ীদের অনেক ঝক্কি আছে। অনেকসময় এজেন্ট জেনে বা না জেনে এমন জুয়েলস বিক্রেতার খবর দিল, যিনি আয়কর ফাঁকি দিতে চান কিংবা জুয়েলস চোরাই মাল। তা ছাড়া, বিদেশ থেকে গোপনে রত্ন আমদানির কথাও আপনাকে বলেছি। কাস্টমস বা রেভেনিউ ইনটেলিজেন্সের গোয়েন্দাদের সূত্রে পুলিশ ওই এজেন্টের খবর পেলে বিপদের ঝুঁকি আছে।
কর্নেল তার হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে বললেন,–সব বুঝলুম। আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি উঠি। শুধু একটা অনুরোধ। কোন এজেন্টের কার্ড কোথায় কীভাবে হারিয়েছে, সেই খবর আপনি নিশ্চয় পাবেন। পাওয়ার পর আমাকে তা জানাবেন। আমি কথা দিচ্ছি, এতে আপনাদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেই দায়িত্ব আমার। চলি মিঃ চন্দ্র। নমস্কার…..
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে স্নানাহারের পর ড্রয়িংরুমের ডিভানে গড়িয়ে পড়েছিলুম। ভাত-ঘুমের অভ্যাস। কর্নেল যথারীতি ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন।
আমার চোখে ভাসছিল, আমরা চলে আসবার সময় অবনীমোহন চন্দ্রের গম্ভীর ও উদ্বিগ্ন মুখ। এটা স্পষ্ট, তার এজেন্টরা আসলে কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করেন। অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে রিপ্রেজেন্টেটিভ। কিন্তু বিদেশি অনেক কোম্পানির মতো চন্দ্র জুয়েলার্স এজেন্ট শব্দটাই ব্যবহার করেন। তা ছাড়া, তারা চোরাই জুয়েলারিও কেনেন। কনকপুরে রায়বাড়ির গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর রত্নখচিত সোনার মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস যে-ই চুরি করুক, সুদর্শনবাবুর সঙ্গে চন্দ্র জুয়েলার্সের কোনো এজেন্ট গোপনে যোগাযোগ করেছে, নাকি সুদর্শনবাবু নিজেই সবার অগোচরে চন্দ্র জুয়েলারি কোম্পানির এজেন্ট? অমন ধোপদুরস্ত পোশাক-আশাক আর চেহারা দেখে মনে হয় না তিনি জমিজমা সম্পত্তির দেখাশোনা করেন। চাষবাস-পুকুর-বাগান নিয়ে যাঁরা থাকেন, তাদের চেহারায় রুক্ষ ছাপ পড়তে বাধ্য।
উত্তেজনায় আমার ভাত-ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল। কথাটা কর্নেলকে বলার জন্য উঠে বসলুম। সেই সময় টেলিফোন বাজল।
কর্নেল হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। …হ্যাঁ। বলছি।… বলুন মিঃ চন্দ্র! …এক মিনিট! আমি লিখে নিচ্ছি। কর্নেল টেবিল থেকে ছোট্ট প্যাড আর ডটপেন নিয়ে বললেন-বলুন। কে, কে, সেন! পুরো নাম বললে ভালো হয়। কাঞ্চনকুমার সেন। ঠিকানা? মানে ওঁর বাড়ির ঠিকানা…ঠিক আছে। এখন আপনি কোথায় আছেন?… মিঃ সেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন কীভাবে?… বুঝেছি। ব্যবসার স্বার্থে এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের একটা ব্যবস্থা করে রাখতেই হয়। …হ্যাঁ। আমি আছি। মিঃ সেনকে আমার কাছে পাঠাতে পারেন। তার সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে চাই। …না, না। আপনার আসবার দরকার হবে না। আপনি একটা চিঠি লিখে দেবেন ওঁকে। আপনার হাতের লেখা চিনতে অসুবিধে হবে না। …ঠিক আছে। রাখছি।
কর্নেল রিসিভার রেখে আমার দিকে ঘুরলেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। উঠে গিয়ে তার কাছাকাছি সোফায় বসলুম। বললুম,–সব বুঝে গেছি। এখন শুধু কাঞ্চনকুমার সেন নামে চন্দ্র জুয়েলার্সের এজেন্টের প্রতীক্ষা। তবে শুধু একটা প্রশ্ন। এই ভদ্রলোকের ঠিকানা কী?
