গোয়েন্দাপ্রবর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ভদ্রলোকরে ফলো করুম!
তারপর তিনি সবেগে বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল কিছু বললেন না। আমি ব্যস্তভাবে বললুম, –হালদারমশাইকে নিষেধ করা উচিত ছিল। আপনার কথা নিশ্চয় শুনতেন। অথচ আপনি এঁকে বাধা দিলেন না?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, তুমি তো জানো, হালদারমশাই গোয়েন্দাগিরির সুযোগ পেলে ছাড়তে চান না। তা ছাড়া, ইদানীং ওঁর হাতে কোনো কেস নেই। এমন একটা অদ্ভুত রহস্যের গন্ধ পেয়ে উনি চুপচাপ বসে থাকার পাত্র নন। তা ছাড়া, হালদারমশাই পঁয়ত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করেছেন। ওঁকে নিয়ে তোমার উদ্বেগের কারণ নেই।
বললুম, কিন্তু সুদর্শনবাবুদের মহালক্ষ্মীদেবীর মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস চুরি গেছে। এই অবস্থায় সুদর্শনবাবুর কাছে একজন বিখ্যাত রত্নব্যবসায়ীর কার্ড!
–আবার বলছি। কার্ড সবাই পকেটে রাখে। সুদর্শনবাবু কার্ডটা তার ব্যাগে ছবিটার সঙ্গে খুঁজে রেখেছিলেন। কেন ওখানে রেখেছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনিই দিতে পারেন। বরং চলো! এগারোটা বাজে। আমরা এক চক্কর ঘুরে আসি।
–কোথায় যাবেন?
–আমি পোশাক বদলে আসি। তারপর বলব।
কর্নেলের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে নীচে নেমে আমার গাড়িতে উঠে বসলুম। কর্নেল যথারীতি আমার বাঁদিকে বসলেন। গেট পেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বললেন,–পার্ক স্ট্রিট হয়ে চৌরঙ্গি। তারপর সোজা দক্ষিণে।
রবিবার বলে রাস্তায় গাড়ির ভিড় ছিল না। চৌরঙ্গিতে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে বললুম,–সোজা দক্ষিণেই যাচ্ছি। কিন্তু পৌঁছুব কোথায়? কর্নেল বললেন, ভবানীপুরে।
-–তাই বলুন। সুদর্শনবাবুর মাসতুতো ভাইয়ের বাড়ি!
–নাঃ! চলো তো! আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।
হাজরা রোডের মোড় পেরিয়ে কর্নেলের নির্দেশে ডাইনে একটা রাস্তায় গাড়ি ঘোরালুম। তারপর বাঁদিকে আঁকাবাঁকা গলি রাস্তায় ঘুরতে-ঘুরতে একটা চওড়া রাস্তার মোড়ে পৌঁছুনোর পর কর্নেল বললেন,–এসে গেছি। ডানদিকের ওই বড় বাড়িটা। গেটের সামনে হর্ন বাজাবে।
গেটে দারোয়ান ছিল। সে গেট খুলে দিল। নুড়িবিছানো পথের দুধারে দেশি-বিদেশি গাছপালা, আর মরশুমি ফুলের উজ্জ্বলতা। গাড়িবারান্দার তলায় পৌঁছুলে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম। কর্নেল নামতেই তিনি নমস্কার করে সহাস্যে বললেন, আমার সৌভাগ্য! অনেকদিন পরে আপনার দর্শন পেলুম।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–সৌভাগ্য আমারই। কারণ টেলিফোন যিনি ধরেছিলেন, তিনি বললেন, আপনি সাড়ে বারোটার মধ্যে বেরোবেন। তাই আমার তরুণ সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্তের গাড়িতে এসে গেলুম।
আমি গাড়ি পার্ক করার জন্য একটু এগিয়ে যেতেই ভদ্রলোক বললেন, আপনি গাড়ি থেকে নেমে আসুন। আমার লোক গাড়ি ঠিক জায়গায় রেখে আপনাকে চাবি ফেরত দেবে।
গাড়ি থেকে নেমে গেলুম। কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। জয়ন্ত! ইনি কলকাতা কেন, সারা ভারতের শ্রেষ্ঠ রত্নবিশারদ মিঃ অবনীমোহন চন্দ্র। চৌরঙ্গিতে এঁদের চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানি প্রায় দুশো বছর ধরে ব্যবসা করছেন। তুমি শুনলে অবাক হবে, ব্রিটেনের রাজপরিবারে এঁর পূর্বপুরুষ প্রাচীন ভারতীয় ডিজাইনের অনেক অলঙ্কার সাপ্লাই করতেন।
ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি, হঠাৎ কর্নেলের এখানে আসবার উদ্দেশ্যটা কী। পোশাক বদলাতে ঘরে ঢুকে কর্নেল টেলিফোন করেই এখানে এসেছেন। চার ধাপ সিঁড়ির উপর বারান্দায় উঠেছি, সেই সময় উর্দি পরা একটা লোক আমার গাড়ির চাবি দিয়ে গেল। আধুনিক রীতিতে সাজানো প্রশস্ত ঘরে মিঃ চন্দ্র আমাদের বসিয়ে কর্নেলের মুখোমুখি বসলেন। তিনি বললেন,–সাড়ে বারোটা নাগাদ আমার বেরুনোর কথা। যাই হোক, আপনার জন্য কফি করতে বলেছি। কফি খেতে-খেতে কথা হবে।
দেখলুম, পাশের ঘরের পর্দা তুলে একজন পরিচারক এগিয়ে এল। সে সেলাম ঠুকে সোফার সেন্টার টেবিলে একটা ট্রে রেখে গেল। আমার আর কফি পানের ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কফির পেয়ালা তুলে নিতেই হল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে আস্তে বললেন, আপনার কোম্পানির একটা কার্ড পেয়েছি। কোথায় পেয়েছি বা কী করে পেয়েছি, এখন তা বলতে চাইনে। সময়মতো নিশ্চয় তা আপনাকে জানাব।
মিঃ চন্দ্র যেন একটু অবাক হয়েছিলেন। বললেন, আমাদের কোম্পানির কার্ড তো আমরা যাকে-তাকে দিই না। কেউ কোনো অলঙ্কার যত বেশি টাকারই কিনুন না কেন, তাকেও আমরা কার্ড দিই না। ক্যাশমেমোই যথেষ্ট। তবে বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রে কার্ড দিতে হয়।
–কোন ক্ষেত্রে?
–ধরুন, কোথাও গিয়ে কোনো পয়সাওয়ালা লোকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হল এবং তিনি তাঁর পরিবারে কারও বিয়ে উপলক্ষে বিশেষ অর্ডার দিয়ে অলঙ্কার কিনতে চান, তাঁকে কার্ড দিই, আবার কলকাতার কোনো ধনী পুরুষ বা মহিলা আমাদের দোকানে এলেন এবং তাদের টাকার দরকার আছে বলে দামি অলঙ্কার বিক্রি করতে চাইলেন, তাদের কার্ড দিতে হয়। তারা তো সঙ্গে করে সেই অলঙ্কার নিয়ে যান না। কারণ আজকাল সঙ্গে দামি অলঙ্কার নিয়ে বেরুনোর রিস্ক আছে। তারা কার্ড চেয়ে বলেন টেলিফোনে তারা জানাবেন, কখন আমার কোম্পানির এক্সপার্টরা গিয়ে সেই অলঙ্কার পরীক্ষা করে দরদাম স্থির করবেন।
–বুঝলুম। এ ছাড়া আর কাউকে…..
