সুদর্শনবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন–আমি ঘরে থাকলে ছড়িটা ব্র্যাকেটে ঝোলানো থাকে। দোতলা থেকে নীচে কোনো কাজে নামলে ঘরে নতুন দামি তালাটা এঁটে দিই। বাড়ি থেকে বাইরে বেরুলে ছড়িটা আমার হাতেই থাকে। সেদিও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
কর্নেল এতক্ষণ পরে চুরুট ধরালেন। তারপর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন–তা হলে আপনার এবং আপনার দাদার চাবি প্রতিবছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন ওই একবার বের। করতে হয় দুজনকে। তাই তো?
–হ্যাঁ। ওই একবার।
–বছরের অন্যসময়, ধরুন গত একবছরে কখনও কি আপনি ছড়ির বাঁট খুলে চাবিদুটো আছে কি না দেখে নিয়েছেন?
–খুলে দেখার দরকার হয় না। কেন জানেন? ছড়িটা হাতে নিয়ে মাটিতে ঠেকিয়ে হাঁটতে হয়। আমি অভ্যাসবশে ঠিক বুঝতে পারি ভিতরে চাবি আছে কি না।
–তার মানে, আবছা শব্দ শুনতে পান?
–ঠিক ধরেছেন কর্নেলসায়েব!
–আর-একটা কথা। আপনি দোতলায় থাকেন। আপনার দাদা-বউদি?
–দোতলায়। বুঝিয়ে বলি। দোতলায় মোট ছখানা ঘর। সিঁড়িটা মাঝখানে। তিনটে করে ঘর তার দুধারে। টানা বারান্দা আছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে, মানে পূর্বের প্রথম ঘরটাতে থাকেন মহালক্ষ্মী। পরের ঘরে জমিদারি আমলের দামি আসবাবপত্র রাখা আছে। পূর্বের শেষ ঘরটাতে থাকে দাদা-বউদি। কনকপুরে বিদ্যুৎ আসবার পর বারান্দার ওদিকটায় দেওয়াল তুলে অ্যাটাচড় বাথরুম করা হয়েছে। আর আমি থাকি পশ্চিমের একেবারে শেষ ঘরটাতে। বাকি দুটো ঘরের মধ্যে আমার পাশের দুটো ঘর আত্মীয়স্বজন বা কোনো বিশেষ অতিথি এলে তাদের জন্য রাখা হয়েছে। ঝন্টু গেলে আমার পাশের ঘরে শোয়।
-এবার কোজাগরী পূর্ণিমার কদিন আগে আপনার দাদার মেয়ে-জামাই-নাতনি এসেছিলেন?
–দুর্গাপুজোর আগেই এসেছিল। ষষ্ঠীর দিন।
-–তারা আপনার পাশের ঘরে, নাকি অন্য ঘরে ছিলেন?
–আমার পাশের ঘরে। দাদার নাতনি পিংকি আমার কাছে ভূতের গল্প শুনতে চায়। সে আমার বিছানায় শুতে।
–তার পরের ঘরে কেউ ছিলেন ওই সময়?
–আমাদের মামাতো ভাই পরেশ। সে থাকে রাঁচিতে। ল্যাব রিসার্চের অফিসে চাকরি করে। সত্যি বলতে কী, মহালক্ষ্মীপুজোর সব কাজের ঝামেলা সে-ই সামলায়।
–পরেশবাবু সম্পর্কে আপনার কোনো সন্দেহের কারণ নেই তা হলে?
–না। পুলিশ তাকে খুব জেরা করেছিল। কিন্তু তাকে অ্যারেস্ট করেনি।
–তা হলে পুলিশ কাকে অ্যারেস্ট করেছে?
–পুলিশের যা নিয়ম। খামোকা গোবিন্দ আর হরিপদকে দিন পাঁচেক আটকে রেখেছিল। দাদা আর আমি বড়বাবুকে ধরাধরি করে বেচারাদের ছাড়িয়ে এনেছিলুম।
–আচ্ছা সুদর্শনবাবু, আপনাদের গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর কি কোনো ছবি তোলা হয়েছিল?
–হ্যাঁ। কনকপুর এখন প্রায় টাউন হয়ে উঠেছে। ছবি তোলার স্টুডিয়োও আছে। গতবছর কোজাগরী পূর্ণিমার দিন দাদা কমলা স্টুডিয়ো থেকে রামবাবুকে ডেকে এনেছিল। প্রতিমার ছবি খুব সুন্দর তুলেছিল রামবাবু। রঙিন ছবি। অনেকগুলো কপি করে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে দাদা বিলি করেছিল। আর নীচের তলায় বসার ঘরের জন্য একটা ছবি বড় করে বাঁধানো হয়েছিল। আমার কপিখানা দেখাচ্ছি।
বলে সুদর্শনবাবু তার ব্যাগ থেকে বাঁধানো প্রায় ৯ ইঞ্চি লম্বা আর ৬ ইঞ্চি চওড়া ফ্রেমে বাঁধা একটা রঙিন ছবি বের করে দিলেন। ছবিটা কর্নেল দেখে নিয়ে হালদারমশাইকে দিলেন। তিনি দেখার পর আমাকে দেখতে দিলেন। দেখে মনে হল, মূর্তিটা প্রাচীন। কষ্টিপাথরে তৈরি। মাথায় রত্নখচিত মুকুট। গলায় জড়োয়ার হার।
কর্নেল বললেন,–একমিনিট। আমি এই ছবি থেকে আমার ক্যামেরায় ছবি তুলে নিচ্ছি। দরকার হতে পারে।
কর্নেল তার ক্যামেরায় ছবি তুলে নেওয়ার পর বললেন, ঠিক আছে সুদর্শনবাবু! আমি আপনাদের গৃহদেবী মহালক্ষ্মীর চুরি যাওয়া অলংকার উদ্ধারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব। বাড়ি ফেরার পথে আপনি মিঃ রায়চৌধুরিকে জানিয়ে যেতে পারেন, আমি আপনাদের সাহায্য করতে চেয়েছি।
সুদর্শনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–ঝন্টুর বাড়ি গেলে শেয়ালদা স্টেশনে সাড়ে এগারোটার ট্রেন ফেল করব। মাঠে পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। আমাকে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছতে হবে। আপনি কবে কনকপুর যাচ্ছেন তাই বলুন!
কর্নেল বললেন,–যত শিগগির পারি, যাব। কিন্তু একটা শর্ত। আপনার দাদা আর আপনি ছাড়া ওখানকার কেউ যেন জানতে না পারে, আমি কেন কনকপুরে গেছি। আর-একটা কথা। আপনাদের বাড়িতে আমরা উঠব না। মিঃ রায়চৌধুরির কাছে শুনেছি, কনকপুরের কাছাকাছি ইরিগেশন বিভাগের একটা বাংলো আছে। সেখান থেকে আপনার সঙ্গে যথাসময়ে যোগাযোগ করব।
সুদর্শনবাবু বললেন, আপনার ইচ্ছা। তারপর আমাদের সবাইকে নমস্কার করার পর ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বেতের ছড়িটা মুঠোয় ধরে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন-হেভি মিস্ত্রি।
কর্নেল এইসময় একটু ঝুঁকে সোফার নীচে থেকে একটা ছোট্ট কার্ড কুড়িয়ে নিলেন। তারপর সেটা দেখে নিয়ে পকেটস্থ করে বললেন, হ্যাঁ। হেভি মিস্ত্রিই বটে। সুদর্শনবাবুর ব্যাগ থেকে ছবি বের করার সময় এই কার্ডটা ছিটকে পড়েছিল মনে হচ্ছে। কার্ডটা কলকাতার এক জুয়েলারি কোম্পানির।
হালদারমশাই ও আমি দুজনেই চমকে উঠেছিলুম। দুজনে একই সঙ্গে বলে উঠলুম, –জুয়েলারি কোম্পানির কার্ড?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ, চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানি। চৌরঙ্গিতে এঁদের বিশাল দোকান। এই কোম্পানি কলকাতার অন্যতম সেরা রত্নব্যবসায়ী। কিন্তু এঁদের কার্ড সুদর্শনবাবু পকেটে না রেখে ব্যাগে রেখেছিলেন কেন?
