সুদর্শনবাবু বিষমুখে বললেন,–কর্নেলসায়েব! আপনিও থানার বড়বাবুর মতো কথা বলছেন!
–না। এটা নিছক একটা প্রশ্ন। তা ছাড়া, আমি কখনওই বলছি না আপনার দাদা কোথায় চাবি রাখতেন, তা আপনার জানা ছিল। যাই হোক, এবার বলুন আপনার চাবি আপনি কোথায় রাখতেন?
সুদর্শনবাবু তাঁর বেতের মোটা ছড়িটা হাতে নিয়ে বললেন,–এই ছড়ির ভেতরে। বলে তিনি কালো রঙের অর্ধবৃত্তাকার বাঁটটা ঘোরাতে শুরু করলেন। বাঁটটা খুলে গেল। তারপর ছড়িটা তুলে তিনি একটু নাড়া দিতেই খুদে রিঙে আটকানো দুটো চাবি ছিটকে নীচে পড়ল। চাবিদুটো কুড়িয়ে নিয়ে তিনি বললেন,–কী ধাতুতে তৈরি জানি না। তবে চাবি দুটোর ওজন আছে।
কর্নেল বললেন,–চাবি দুটো একটু দেখতে চাই।
সুদর্শনবাবু তার হাতে চাবি দিলেন। চাবিদুটোর গড়ন দুরকমের। একটা ইঞ্চিতিনেক লম্বা, অন্যটা তার চেয়ে ছোট। কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতশকাঁচ বের করে টেবিলল্যাম্প জ্বেলে দিলেন। তারপর আতশকাঁচ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চাবিদুটো সুদর্শনবাবুকে ফেরত দিলেন। সুদর্শনবাবু চাবিদুটো ছড়ির গর্তে ঢুকিয়ে ঘোরালো বাঁটটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে আঁট করে দিলেন।
কর্নেল বললেন,–এই বেতের ছড়িটা আপনি কতদিন আগে কিনেছিলেন? আমার ধারণা এটা অর্ডার দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন। তাই না?
-ঠিক ধরেছেন। আগে চাবিদুটো আমি আমার ঘরে আলমারির লকারে রাখতুম। বছর তিনেক আগে পাঁচখালি এলাকার একটা বসতিতে দশরথ নামে একটা লোককে দিয়েছড়িটা তৈরি করিয়েছিলুম। ওদের ডোম বলা হয়। পাঁচখালি এলাকায় বেতের জঙ্গল আছে। ডোমেরা বেতের তৈরি ধামা, ধান-চাল মাপবার পাত্র, চুপড়ি, দোলনা এইসব জিনিস তৈরি করে কনকপুরে চৈত্রসংক্রান্তির গাজনের মেলায় বেচতে আসে। দশরথ খুব পাকা কারিগর। আমাদের ছোটবেলায় বাবা দশরথকে দিয়ে বেতের এক সেট টেবিল-চেয়ার তৈরি করিয়েছিলেন। সেগুলো এখনও আছে।
-আপনি বেতের ছড়িতে চাবি রাখা নিরাপদ মনে করেছিলেন। এর কি কোনো বিশেষ কারণ ছিল?
সুদর্শনবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন,–গ্রামে আমার ঠাকুরদার প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুল আছে। একটা লাইব্রেরিও আছে। ঠাকুরমার নামে নাম। রত্নময়ী পাঠাগার। বাবা লাইব্রেরিঘরের সঙ্গে আরও একটা ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। ওই ঘরে তাস, ক্যারাম, দাবা এইসব খেলার আসর বসত। বিকেল চারটে থেকে রাত্রি নটা অবধি সেখানে খেলা চলত। দাবা খেলার নেশা আমার আছে। এদিকে আমার শোওয়ার ঘরে সেই আলমারি আছে। বছর দিনেক আগে রাত সাড়ে নটায় বাড়ি ফিরে দেখি, শোওয়ার ঘরের দরজার তালা ভাঙা। আমার যা স্বভাব। চিৎকার-চাচামেচি করে হুলস্থূল বাধিয়েছিলুম। দাদা এসে আমাকে বললেন, ঘরে ঢুকে দেখেছ কিছু চুরি গেছে কি না? তারপর নিজেই ঘরে ঢুকে সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন। আমি ঘরে ঢুকে দেখলুম, সবকিছু ঠিকঠাক আছে।
হালদারমশাই একটু হেসে বললেন,–চোর তালা ভাঙছিল। কিন্তু চুরির সময় পায় নাই।
কর্নেল বললেন, আপনার ফ্যামিলি, মানে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা?
সুদর্শনবাবু আস্তে বললেন,–আমি বিয়ে করেছিলুম। কিন্তু আমার স্ত্রী ব্লাডক্যান্সারে মারা যান। তারপর আর বিয়ে করিনি। জমি-পুকুর-বাগান দেখাশোনা এসব নিয়েই থাকতুম। শুধু সন্ধ্যা থেকে দাবা।
–তা হলে আপনি সেই ঘটনার পর এই ছড়ি তৈরি করিয়েছিলেন?
–ঠিক ধরেছেন। ছড়িটা বাইরে গেলে সবসময় হাতে থাকবে। আবার দাবার আসরে বসলেও ছড়িটা আমার হাতের পাশে রাখা থাকবে। কোলে ফেলে রাখতেও অসুবিধে নেই।
–আপনার দাদা কী করেন?
–আপনাকে বলেছি, জমিসম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলুম। কারণ ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় আমার মন ছিল না। ঝন্টুকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন। আর দাদার কথা জিজ্ঞেস করছেন? দাদা পড়াশুনায় খুব ভালো ছিল। কনকপুর হাইস্কুলে দাদা মাস্টারি করত। দুবছর আগে রিটায়ার করেছে। শোভা-বউদিকে আমি মায়ের মতো শ্রদ্ধা করি।
–আপনার দাদার ছেলেমেয়ে?
–এক মেয়ে এক ছেলে। মেয়ের বিয়ে হয়েছিল বহরমপুরে। তার স্বামী সরকারি অফিসার। তার বদলির চাকরি। এখন সুনন্দা শিলিগুড়িতে থাকে। তার একটি মেয়ে আছে। দাদার ছেলে গৌতম ঝন্টুর বাড়িতে থেকে কোনো কলেজে পড়ত। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। ঝন্টুর তদ্বিরে সে আমেরিকাতে পড়তে গেছে। কর্নেলসায়েব! দাদা-বউদির প্রতি আমার এতটুকু ঈর্ষা নেই। অথচ বজ্জাত লোকেরা এখন কতরকম আজেবাজে কথা রটাচ্ছে।
-এবার কোজাগরী পূর্ণিমার দিন কি আপনার দাদার মেয়ে-জামাই-নাতনি সবাই এসেছিল?
–হ্যাঁ। তা ছাড়া, আরও কিছু আত্মীয়স্বজনও এসেছিল। প্রতিবছর ওই একটা দিন আমাদের রায়পরিবারে একটা বড় উৎসব। পরদিন কাঙালিভোেজন, বস্ত্রদান এসবও হয়। এবার কিছুই হয়নি।
-এখন বাড়িতে কারা আছে?
–দাদা-বউদি। বাবার আমলের কাজের লোক হরিপদ আর গোবিন্দ। গোবিন্দ জমিসম্পত্তি দেখাশোনার কাজে আমাকে সাহায্য করে। সে আমার বিশ্বস্ত লোক। হরিপদ বাড়ির সব ফাইফরমাশ খাটে। রান্না করে মোনাঠাকুর। সে-ই হাটবাজার করে। আর আছে কাজের মেয়ে শৈলবালা। আমি দুধের জন্য একটা গাইগরু পুষেছি। গোরুর দেখাশোনা, দুধ দোহানো এসব কাজও শৈল করে।
–একটু ভেবে বলুন সুদর্শনবাবু! কোজাগরী পূর্ণিমার দিন আপনি ঘুম থেকে ওঠার পর সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত আপনার এই ছড়িটা কোথায় ছিল?
