এমন একটা অবস্থায় কোন কনকপুরের সুদর্শন রায় এসে বাঁচালেন। ভদ্রলোক বয়সে প্রৌঢ়। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ আছে। সিঁথি-করা কাঁচাপাকা চুল আর পুরু গোঁফে শৌখিনতার ছাপও স্পষ্ট। গায়ে সার্জের পাঞ্জাবি, পরনে ধুতি। হাঁটু অবধি পশমের মোজা। কাঁধে ভাঁজ করা নকশাদার কাশ্মীরি শাল। অনুমান করলুম, নভেম্বরের শেষাশেষি কলকাতায় ফ্যান চললেও তাঁদের কনকপুরে জাঁকিয়ে শীত পড়েছে এবং টুপি বা মাফলার নিশ্চয় তার কাঁধের সুদৃশ্য পুষ্ট ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছেন। শুধু তাঁর ছড়িটা সাদাসিধে রকমের। দেখে বোঝা যায় মোটা বেতের ছড়ি এবং মাথাটা ছাতার বাঁটের মতো ঘোরালো। কালো রঙের বাঁট। হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে হাসি পেল। কিন্তু এখন আবহাওয়া গুরুগম্ভীর।
যাই হোক, ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে কর্নেল বললেন,–জয়কৃষ্ণবাবু কিছুটা জানিয়েছেন। তবে টেলিফোনে শুধু ওইটুকু জানা যথেষ্ট নয়। উনি আমার পুরোনো বন্ধু। আমার মতো ওঁরও কিছু বাতিক আছে। পাখি দেখা, অর্কিড সংগ্রহ, ক্যাকটাসের বাগান করা।
সুদর্শনবাবু বললেন, হ্যাঁ, জয়কৃষ্ণ একসময় নাম করা শিকারিও ছিল। আমার ঠাকুরদা ছিলেন কনকপুরের জমিদার। কনকপুরের পূর্বে পাঁচখালি নামে একটা মহাল ছিল তার আমলে। ওই মহালটা জলজঙ্গলে কিছুটা দুর্গম ছিল। এখনও ওদিকটায় তত উন্নতি হয়নি। জয়কৃষ্ণ বাইশ বছর বয়সে পাঁচখালির জঙ্গলে একটা বাঘ মেরেছিল। তারপর তো পশুপাখি মারা আইন করে নিষিদ্ধ হল। তবু জয়কৃষ্ণ–ওর ডাকনাম আপনি হয়তো জানেন…
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–ঝন্টুবাবু।
–তো ঝন্টু পাঁচখালির জঙ্গলমহলে যাওয়া ছাড়েনি। ওই তল্লাটের মানুষজন ওকে দেবতার মতো ভক্তি করে। আজকাল আর তত যায় না।
এই সময় ষষ্ঠীচরণ কফি আনল। কর্নেল বললেন,–কফি খান সুদর্শনবাবু। কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।
সুদর্শনবাবু কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–ঝন্টু আপনাকে কতটুকু জানিয়েছে জানি না। তবে ব্যাপারটা অত্যন্ত গোপনীয়।
কথাটা বলে সুদর্শনবাবু আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিলেন। কর্নেল বললেন,–আলাপ করিয়ে দিই। এ আমার তরুণ বন্ধু খ্যাতিমান সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরি। আর উনি মিঃ কে. কে. হালদার। প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর। রিটায়ার করার পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। এঁরা দুজনেই আমার বিশ্বস্ত সহচর।
সুদর্শনবাবু আমাদের নমস্কার করলেন। তারপর বললেন, ঘটনার পর আমি কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে যাওয়ার কথা ভেবেছিলুম। কিন্তু আমার দাদা সুরঞ্জন পুলিশের উপরতলায় কাকেও ধরার পক্ষপাতী। ঝন্টুর পুলিশমহলে জানাশোনা আছে। কিন্তু সে আপনার কাছে আসবার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল।
কর্নেল বললেন, আপনি এঁদের সামনে স্বচ্ছন্দে ঘটনাটা জানাতে পারেন।
সুদর্শনবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আমাদের রায়পরিবারের গৃহদেবী মহালক্ষ্মী। কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে ঘরে-ঘরে লক্ষ্মীপুজো হয়। আমাদের দেবী মহালক্ষ্মীরও ওই রাত্রে পুজো হয়। সারা বছর ওই রাত্রিটা বাদে প্রতিমা রাখা হয় আমাদের দোতলা বাড়ির ওপরতলায় বিশেষভাবে তৈরি একটা ঘরের দেওয়ালসংলগ্ন আয়রনচেস্টে। ঘরের দরজার তালা আর ওই আয়রনচেস্টের তালার দুটো করে চারটে চাবি ছিল। বাবা মৃত্যুর আগে দুটো চাবি আমাকে আর দুটো চাবি আমার দাদা সুরঞ্জনকে দিয়েছিলেন। এবার ব্যাপারটা খুলে বলি। দরজার তালা খুলতে হলে প্রথমে দাদার চাবিটা ঢুকিয়ে একপাক ডাইনে ঘোরাতে হবে। তারপর আমার চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে বাঁদিকে একপাক ঘোরাতে হবে। তবেই দরজার তালা খুলবে।
হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন,–কন কী? একখান চাবি দিয়া তালা খুলব না?
-না। এরপর আয়রনচেস্ট খুলতে হলেও আগে দাদার চাবি তারপর আমার চাবি ঢুকিয়ে একইভাবে ঘোরাতে হবে। তবেই আয়রনচেস্ট খুলবে। তারপর আমরা দুভাই রুপোর থালায় মহালক্ষ্মীকে বের করব। আয়রনচেস্ট একইভাবে বন্ধ করব। ঘর থেকে বেরিয়ে দেবীকে তুলে দেব আমাদের পুরুতঠাকুর দেবনারায়ণ মুখুজ্যের হাতে। দুভাই মিলে এবার ঘরের দরজার তালা আটকে দেব। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি বাড়ির মাঝামাঝি জায়গায়। সিঁড়ির নীচে অপেক্ষা করবে বাড়ির লোকজন। আমরা সবাই যাব ঠাকুরবাড়িতে। সেখানে মন্দিরের বেদিতে দেবীকে রেখে পুজোআচ্চা শুরু হবে। মোটামুটি এতবছর ধরে এটাই নিয়ম।
কর্নেল বললেন,–বুঝলুম। কিন্তু ঘটনাটা কী?
সুদর্শনবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–অক্টোবর মাসে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে দাদা আর আমি আয়রনচেস্ট থেকে দেবীকে বের করে দেখি, মাথার মুকুট নেই। গলার জড়োয়া নেকলেস নেই। দেখামাত্র আমাদের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। দাদা ঠান্ডামাথার মানুষ। কিন্তু আমি মাথার ঠিক রাখতে পারিনি। চিৎকার, চ্যাঁচামেচি করে হইচই বাধিয়ে দিলুম। খবর রটতে দেরি হয়নি। পাড়ার ভদ্রলোকেরা ছুটে এসেছিলেন। তারপর পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল। থানার অফিসার ইন-চার্জ আমাদের দুভাইকে পৃথকভাবে জেরা করে শেষে খুব হম্বিতম্বি শুরু করলেন। দাদা, না হয় আমি, যে-কোনো একজন চুরি করেছি–এই তাঁর মত।
কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, আপনার দাদা কোথায় চাবি রাখতেন, সে কথা আপনি নিশ্চয় জানতেন না?
