–প্রবোধবাবু আপনাকে দেখতে পেয়েছিলেন?
–হ্যাঁ বড় মুখুজ্যে তাকে পেট ভরে মদ খাইয়ে ছেড়ে দিলেন!
–তাই তিনি আপনার বোনকে বলে গেছেন, ‘গোপাল আছে শিবের কোলে। প্রমথ শিবের একটি নাম।
ও.সি. বাসুদেব ঘোষ বললেন,–প্রমথ মুখুজ্যের বিরুদ্ধে ‘রংফুল কনসাইনমেন্ট’-এর বেআইনি আটকের চার্জে এফ. আই. আর. করেছি। জয়গোপালবাবুর কথা শুনেই বুঝেছিলাম, ভদ্রলোক ওঁর সরলতার সুযোগ নিয়েছিলেন।
জয়গোপালবাবু করজোড়ে বললেন,–মামলা করে কী হবে? ঠাকুরদার জুতো তো কেউ হিমির কাছ থেকে হাতাতে পারবে না। হিমি! বিশ্বাস কর আমাকে। আমি কখনও তোকে ঠাকুরদার সিন্দুকের কথা জিজ্ঞেস করব না।
ও.সি. বললেন,–ঠাকুরদার সিন্দুক। সেটা কী?
কর্নেল বললেন,–পরে সব বলব। আমি সেচ-বাংলোয় আরও একটা দিন থাকছি। দোয়োহানি ড্যামে সাইবেরিয়ান হাঁসের ছবি না তুলে যাচ্ছি না। যাই হোক, আপাতত ভাই-বোনকে আশা করি একটু প্রোটেকশন দেবেন। অবনী মুখুজ্যে কেমন লোক আমি জানি না।
হালদারমশাই কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। বুঝলুম, গতরাতে অবনী মুখুজ্যের দুটো লোকের পাল্লায় পড়ে হেনস্থা হওয়ার কথা বলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তাকে থামতে হল ও. সি. বাসুদেববাবুর কথায়,সম্ভবত ইনিই সেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ? আপনার বিরুদ্ধে অবনীবাবু নালিশ করতে গিয়েছিলেন।
হালদারমশাই স্মার্ট হয়ে পকেট থেকে তার ডিটেকটিভ এজেন্সির পরিচয়পত্র দেখিয়ে বললেন, –আমারে দাও দিয়ে অ্যাটাক করছিল অবনীবাবুর দুইজন লোক। লোক না গুণ্ডা! আমি প্রোফেশনের কাজে যেখানে ঘুরি, অগো কী?
ও.সি. হাসতে-হাসতে জিপে উঠে বললেন,–দিনে সময় হবে না। সন্ধ্যা সাতটায় কর্নেলসাহেবের সঙ্গে সেচ-বাংলোয় গিয়ে ঠাকুরদার সিন্দুকের গল্প শুনব! নমস্কার!
.
ও.সি. চলে গেলে হৈমন্তী বললেন,–কর্নেলসায়েব! দাদাকে বলে দিন, কখনও যেন আর ঠাকুরদার সিন্দুকের নাম না করে।
জয়গোপালবাবু করুণমুখে বললেন, কিন্তু ঠাকুরদার দু-পাটি জুতোর একপাটি আমার প্রাপ্য কি না বল হিমি।
হৈমন্তী বললেন,–জুতো নিয়ে কী করবে তুমি? তার চেয়ে অবনী মুখুজ্যের জবরদখল জমিটা তুমি আর আমি আইনত মালিক হিসেবে গার্লস স্কুলে . •মে দান করে দেন!
–দিলুম! তারপর?
–দু’পাটি জুতো বিক্রি করে সেই টাকায় গার্লস স্কুলের বাড়ি তৈরি করে দেব।
–জুতো বিক্রি করে? হ্যাঁ? বলিস কী হিমি? কর্নেলসায়েব! এ কী অদ্ভুত কথা!
সুবিমল মুখ ফসকে বলতে যাচ্ছিল জুতোর হিলের মধ্যে কী আছে, কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–জয়গোপালবাবু। অদ্ভুত কথার মানে যথাসময়ে জানতে পারবেন। কিন্তু আপনি নিজের জুতো নিজে চুরি না করলেও প্রমথবাবুর প্ররোচনায় একটা খারাপ কাজ করেছেন।
জয়গোপালবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন,–আজ্ঞে?
–কালু নামে কুকুরটা আপনাকে দেখলে বা আপনি তার কাছে গেলে চাঁচাত না। কারণ আপনাদের বাড়িরই পোষা কুকুর। এবার বলুন কালুকে আপনি কি কোলে তুলে বা কোনোভাবে প্রমথবাবুর লোক দিয়েছিলেন? জয়গোপালবাবু! আপনার সাহায্য ছাড়া কারও সাধ্য ছিল না যে কালুর মুণ্ডু কাটবে।
জয়গোপালবাবু ভেউ-ভেউ করে কেঁদে উঠলেন। তারপর বললেন, আমি কেমন করে জানব গণশা আমার কোল থেকে তাকে আচমকা কেড়ে নেবে আর কেষ্টা তার মুণ্ডু কাটবে? অন্ধকার রাত্তির। আমাকে গণশা আর কেষ্টা ক্লাব থেকে এগিয়ে দেওয়ার ছলে সঙ্গে এসেছিল। তারপর বলল, কালুকে নিয়ে একটা মজার খেলা খেলবে! আমি কি জানতুম কী মজা?
হৈমন্তী বললেন, তুমি কেন একথা লুকিয়ে রেখেছিলে?
–ভয়ে। তোর দিব্যি। কর্নেলস্যারের দিব্যি। গণশা-কেষ্টা শাসিয়ে গিয়েছিল, তাদের নাম বলে দিলে আমার মুণ্ডু কাটবে।
কর্নেল বললেন,–হৈমন্তীদেবী! দাদাকে বাড়ি নিয়ে যান। যথাসময়ে এসে আপনার ঠাকুরদার সিন্দুক আর জুতো দেখব। চিন্তা করবেন না। আপনার প্ল্যানটা ভালো। বাবুগঞ্জে সৎ-ভদ্রমানুষও তো কম নেই। তারা আপনাকে সাহায্য করবেন। গার্লস হাইস্কুল হবে আপনার ঠাকুরদার নামে। আচ্ছা চলি।
৪.৮ রায়বাড়ির প্রতিমা রহস্য
ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে কর্নেলকে নমস্কার করলেন। নমস্কারের সময় তাঁর ছড়িটা ডানদিকে বগলের সঙ্গে আটকে রেখেছিলেন। তারপর বললেন, আমি সুদর্শন রায়। গতরাতে কনকপুর থেকে আপনাকে ট্রাঙ্ককল করেছিলুম।
কর্নেল বললেন, বসুন সুদর্শনবাবু।
সুদর্শন রায় সোফায় বসলেন। তার ছড়িটা পাশে ঠেস দিয়ে রেখে বললেন,–ট্রাঙ্ককলে একটা কথা বলা হয়নি। একে তো বিচ্ছিরি কীসব শব্দ। তারপর হঠাৎ লাইনটা কেটে গেল। ভবানীপুরে আমার মাসতুতো ভাই জয়কৃষ্ণ রায়চৌধুরিই আমাকে আপনার কাছে আসতে বলেছিল।
–হ্যাঁ। জয়কৃষ্ণবাবু আমাকে গতকাল টেলিফোনে আপনার কথা বলেছেন।
বলেছে?–ভদ্রলোক উৎসাহে একটু চঞ্চল হয়ে উঠলেন।–তা হলে আপনার কাছে আমার আসবার কারণও নিশ্চয় জানিয়েছে?
কর্নেলের হাতে অনেকগুলো পোস্টকার্ড সাইজের রঙিন ছবি ছিল। ছবিগুলো প্রজাপতির। গত অক্টোবরে সরডিহার জঙ্গলে অনেক ঘোরাঘুরি করে ক্যামেরায় দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির প্রজাপতির ছবি তুলে এনেছিলেন। এতক্ষণ সেই ছবিগুলো দেখিয়ে তিনি আমাদের কান ঝালাপালা করছিলেন। অবশ্য প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্তকুমার হালদার–আমাদের প্রিয় হালদারমশাই মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনছিলেন। কী বুঝছিলেন তা তিনিই জানেন!
