বলে তিনি সাদা খামের ভিতর থেকে আরেকটা জীর্ণ খাম বের করলেন। তার ভিতর থেকে সাবধানে এক পাতার একটা পুরু কাগজ বের করলেন। ওপরের দিকটায় স্ট্যাম্প আছে। কত টাকার স্ট্যাম্প দেখতে পেলুম না। হলুদ হয়ে যাওয়া এবং ভাঁজ ছিঁড়ে যাওয়া কাগজটা যে উইল, তা বোঝা গেল। রেজেস্ট্রি করা উইল। কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে আতশ কাঁচ বের করে একটা অংশ পড়লেন।
‘…এতদ্ব্যতীত দালানবাটীর পশ্চিমে শেষাংশে দ্বিতলের নিম্নতলে সুরক্ষিত সিন্দুক এবং তন্মধ্যে সংরক্ষিত যাবতীয় দ্রব্য আমার পুত্র শ্রীমান হরগোপাল রায় পাইবে।‘
কর্নেল বললেন,–হরগোপাল রায় আপনার বাবা। আপনার ঠাকুরদা ‘দ্বিতলের’ লিখে ‘নিম্নতল’ লিখেছেন। কিন্তু শেষাংশ দ্বিতল নয়। দোতলা নয়। একতলা। তাহলে নিম্নতল’ কথাটার একটাই মানে হয়। তাই না হৈমন্তীদেবী?
হৈমন্তী মুখ নামিয়ে বললেন,–কিছু বুঝতে পারছি না।
–পশ্চিমে শেষাংশে আপনার ঘর। প্লিজ! আপনার ঘরে চলুন।
হৈমন্তী একটু ইতস্তত করে নিজের ঘরে গিয়ে তালা খুলে দিলেন। তারপর ভিতরে ঢুকে পশ্চিম, উত্তর এবং দক্ষিণের জানালা খুললেন। আমরা বারান্দায় জুতো খুলে ঘরে ঢুকলুম। দেখলুম, দেওয়ালের পশ্চিমে সেকেলে একটা উঁচু পালঙ্ক। অন্যদিকে আলমারি। র্যাকে সাজানো বই। এককোণে ছোট্ট বেঞ্চিতে কভারে ঢাকা বাক্স-প্যাঁটরা।
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–”দ্বিতলের নিম্নতল’ কথাটা আমি বুঝতে পেরেছি হৈমন্তীদেবী! এই ঘরের তলায় একটা ঘর আছে। ইংরাজিতে যাকে বলে বেসমেন্ট। আগের দিনে বলা হত তিয়খানা। সেখানে দামি জিনিস রাখা হত। আপনার খাটের মাথার দিকে ছোট্ট বেঞ্চে বাক্স-প্যাটরা রাখা আছে।
বলে কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে তাঁর খুদে কিন্তু জোরালো আলোর টর্চ বের করে জ্বাললেন। তারপর একটু ঝুঁকে দেখে নিয়ে বললেন,–বেঞ্চের তলায় পেতলের বালতিটা সরাচ্ছি। আমাকে বাধা দেবেন না প্লিজ!!
কর্নেল পেতলের বালতি সরাতেই দেখা গেল একটা মোটা লোহার আংটা। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–হৈমন্তীদেবী! লোহার ওই আংটা ধরে জোরে টান দিলে লোহার চৌকো একটা পাত উঠে আসবে। নীচে সিঁড়ি আছে। নেমে গেলেই সিন্দুকটা পাওয়া যাবে।
হৈমন্তী কান্নাজড়ানো গলায় বললেন,–কিন্তু গোপালদাকে সিন্দুকের খোঁজ দিলে সে ঠাকুরদার জুতো দুটো বের করবে। জুতো দুটোর হিলে কী আছে তা কি আপনি জানেন?
কর্নেল বললেন,–জানি! তার মানে, এই সুবিমলের মুখে একটা ঘটনা শোনার পর তা আমি যুক্তিসঙ্গতভাবেই অনুমান করেছি। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে ঝড়বৃষ্টির রাতে স্বদেশি বিপ্লবীরা জমিদারের খাজাঞ্চিখানা লুঠ করেছিলেন। আপনার ঠাকুরদা ছিলেন খাজাঞ্চি। তাকে বেঁধে রেখে ধনরত্ন লুঠ করা হয়েছিল। যেভাবে হোক, বাঁধন খুলে আপনার ঠাকুরদা পালিয়ে আসার সময়–হ্যাঁ, আমার অনুমান ঠিক, দৈবাৎ দুটি দামি রত্ন দেখতে পান। আমার দৃঢ় বিশ্বাস রত্নদুটি হিরে। তাই বিদ্যুতের আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য হিরের দুটি খণ্ড আপনার ঠাকুরদা কুড়িয়ে পান। এর পরের কাহিনি আপনার জানা। সুবিমল আমাকে বলেছে, আপনার ঠাকুরদাকে জেল খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন জমিদারবাবু। আট বছর তিনি লুকিয়ে থাকার পর ফিরে আসেন।
হৈমন্তী বললেন, আমি সব জানি। বাবার কাছে শুনেছি। কিন্তু দাদা এতদিনে রেলের চাকরি থেকে রিটায়ার করে আসার পর মুখুজ্যেদের পাল্লায় পড়েছে, তা বুঝতে পেরেছিলুম। দাদাকে টাকার লোভ দেখিয়ে মুখুজ্যেরা হিরে দুটো হাতাতে চায়। তাই মিথ্যা করে জুতোচুরির গল্প শোনায়।
কর্নেল হাসলেন,–আপনি জানেন তাহলে?
হৈমন্তী চোখ আঁচলে মুছে বললেন,–আগে একটু সন্দেহ হয়েছিল। গতরাতে ওই পদ্য পড়েই বুঝেছিলুম, এটা দাদার পদ্য। হাতের লেখা অন্যের। দাদার পদ্য লেখার অভ্যাস আছে।
হালদারমশাই ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–খাইসে!
এই সময় বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। কর্নেল বললেন,–আপনার দাদা নিখোঁজ হয়েছিলেন। ওঁকে প্রমথ মুখুজ্যের ফার্ম থেকে পুলিশ উদ্ধার করে এনেছে। শিগগির এ ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে তালা এঁটে দিন। আমি বাইরে যাচ্ছি।
পুলিশের জিপ থেকে একজন অফিসার নেমে এসে করজোড়ে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–আমার সৌভাগ্য, কিংবদন্তি পুরুষ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। আমি ও. সি. বাসুদেব ঘোষ।
কর্নেল বললেন,–জয়গোপালবাবুকে এনেছেন তো?
–হ্যাঁ। প্রমথবাবুর ফার্মে দিব্যি বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আমাদের দেখে অবাক হয়ে, পরে বললেন, আমি নিখোঁজ হব কোন দুঃখে? বড় মুখুজ্যেবাবু জামাই-আদরে রানাঘাট স্টেশন থেকে গাড়ি চাপিয়ে ফার্মে নিয়ে এসেছেন। খাচ্ছি-দাচ্ছি! দিব্যি আছি!
জয়গোপালবাবু জিপের পিছনদিক থেকে একলাফে নেমে এলেন। হাসিমুখে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন, আপনি এসে পড়েছেন তাহলে?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–পাঁচজোড়া জুতোর মধ্যে প্রথমজোড়া ছিল আপনার। বাকি চারজোড়া জুতো কি বড় মুখুজ্যে কিনে দিয়েছিলেন?
জয়গোপালবাবু জিভ কেটে বললেন,–ছ্যা-ছ্যা! আমার কি জুতো কেনার পয়সা নেই? আপনার দিব্যি! মা কালীর দিব্যি! পুলিশস্যারের দিব্যি! আমার পাঁচজোড়া জুতো সত্যি চুরি গিয়েছিল। সেই জুতোগুলো আজ সক্কালে বড় মুখুজ্যের ফার্মের পাঁচিলের গোড়ায় ঘাসের মধ্যে দেখেছি। সবগুলোর হিল ওপড়ানো। খাপ্পা হয়ে বললুম, বড় মুখুজ্যেদা! এ কী করেছ? বড় মুখুজ্যের এক কথা। ঠাকুরদার জুতোজোড়া এনে দাও। তবে ছাড়া পাবে! তারপর কাল দুপুরবেলা আমাকে দিয়ে পদ্য লিখিয়ে ছাড়ল। না লিখলে অ্যালসেশিয়ান দিয়ে আমাকে খাওয়াবে বলল। শেষে বলল, কালুর মতো মুণ্ডু কেটে এই বাড়ির দরজায় ঝুলিয়ে রাখব। করি কী বলুন?
