কর্নেল এবং তার পিছনে আমি একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালুম। তারপর কর্নেল ধমক দিয়ে বললেন, –এ কী হচ্ছে? এক্ষুনি অ্যারেস্ট করব বলে দিচ্ছি। কুকুর নিয়ে ফার্মে চলে যাও। গিয়ে দেখো, এতক্ষণ সেখানে পুলিশ বড় মুখুজ্যেবাবু আর জয়গোপালবাবুকে পাকড়াও করেছে।
লোকটা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলল,–কে আপনি? ওই বাবুর মতো আপনাকেও টমকে দিয়ে গাছে চড়িয়ে ছাড়ব। ওসব পুলিশ-টুলিশ আমি পরোয়া করি না!
এবার কুকুরটা আমাদের দিকে ঘুরে গজরাতে থাকল। কর্নেল এক পা এগিয়ে গিয়ে বললেন,–তাহলে আগে কুকুরটা তারপর তোমার মুণ্ডুটা গুলি করে উড়িয়ে দিই।
বলে তিনি সত্যিই জ্যাকেটের ভিতর থেকে রিভলভার বের করলেন। গাছের ওপর থেকে গোয়েন্দাপ্রবর চেঁচিয়ে উঠলেন,–আমার রিভলভারটা সঙ্গে আনি নাই। হালার কুত্তার মাথা ফুটা কইর্যা দ্যান কর্নেলস্যার!
লোকটা রিভলভার দেখে আঁতকে উঠে কুকুরের চেন ছেড়ে দিয়ে গুলতির মতো উধাও হয়ে গেল। কুকুরটাও কী বুঝল কে জানে, তখনই তার পিছনে দৌড়ে অদৃশ্য হল। কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই! আপনি শালগাছে চড়লেন কী করে?
হালদারমশাই সোজা গুঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে এসে সামনে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলুম, –আপনার পেট অত মোটা কেন?
হালদারমশাই সোয়েটারের ভিতর থেকে তাঁর বাঘছালটা বের করে সহাস্যে বললেন,–কুত্তার তাড়া খাইয়াও বাঘছাল ফেলি নাই। শুধু একখান ভুল, ফায়ার আর্মস আনি নাই।
কর্নেল বললেন, আপনি বাঘছাল খুঁজতে কি প্রমথবাবুর ফার্মে গিয়েছিলেন?
–না! বাঘছাল ঠিক জায়গায় ছিল। কুড়াইয়া লইয়া ভাবছিলাম, এই জঙ্গলের ওধারে বড় মুখার্জির ফার্ম। তাই সেখানে গিয়া আড়াল থেইক্যা লক্ষ রাখছিলাম। অমনই কুত্তাটা ট্যার পাইছিল।
বুঝেছি।–বলে কর্নেল ঘুরে মোরামরাস্তার দিকে পা বাড়ালেন।
হালদারমশাই আমাদের অনুসরণ করলেন। আমি বললুম,–ভাগ্যিস গাছে চড়েছিলেন। নইলে কুকুরটা আপনার অবস্থা শোচনীয় করে ফেলত।
হালদারমশাই হাসিমুখে বললেন,–কইছিলাম না? পঁয়তিরিশ বৎসর পুলিশের চাকরি করছি। তো কর্নেলস্যার পুলিশের কথা কইছিলেন ক্যান?
সুবিমল বলল,–হিমিদি স্কুলে চলে গেলে ওঁকে ডেকে আনতে হবে।
কর্নেল বললেন,–না। উনি ক’দিনের জন্য ছুটি নিয়েছেন।
মোরামরাস্তা যেখানে পিচরাস্তার সঙ্গে মিশেছে, তার আগে শালের জঙ্গলটা শুরু হয়েছে। তাই আমাদের সামনে জঙ্গলের কিছুটা আড়াল ছিল। কিন্তু গাছের ফাঁক দিয়ে দেখলুম, পিচরাস্তায় একটা পুলিশের জিপ আর পিছনে কালো রঙের পুলিশভ্যান দ্রুত বাবুগঞ্জের দিকে চলে গেল। বললুম,–কর্নেল! পুলিশের গাড়ি গেল।
কর্নেল একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, এখন পুলিশ নয়, ঠাকুরদার সিন্দুক। আর সিন্দুকের মধ্যে জুতো।
পিছন থেকে হালদারমশাই বললেন,–কী কইলেন? কী কইলেন?
-–আগস্ট বিপ্লব। সুবিমলকে জিজ্ঞেস করুন! সে জানে।
হালদারমশাই সুবিমলকে নিয়ে পড়লেন। সুবিমল তাকে বাবুগঞ্জের বাড়িতে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে ঝড়বৃষ্টির কাহিনি শোনাতে থাকল।
বাজারে এখনই ভিড়। হালদারমশাইকে একটা খাবারের দোকানের কাছে নামিয়ে দিলুম। সুবিমল বলল,মিঃ হালদার! হিমিদির বাড়ি চিনতে পারবেন তো?
হালদারমশাই বললেন,–হঃ। চিন্তা করবেন না। কুত্তার তাড়া খাইয়া ক্ষুধা পাইছে। কিছু খাইয়া লই।
কর্নেল সুবিমলকে শর্টকাটে পৌঁছনোর পথ দেখাতে বলেছিলেন। গলিপথে ঘুরপাক খেতে-খেতে নদীর ব্রিজের কাছে সেই বাজারে গিয়ে সেখান থেকে ডাইনে ঘুরে আবার একটা গলিতে ঢুকেই জয়গোপালবাবুদের বাড়িটা চিনতে পারলুম। গাড়ির শব্দ শুনে কাচ্চাবাচ্চারা ভিড় করেছিল। সুবিমল ধমক দিয়ে তাদের হটিয়ে দিল।
হৈমন্তী বেরিয়ে নমস্কার করে বললেন,–ভিতরে আসুন আপনারা। আমি গেনুদাকে ডেকে বলে আসি, গাড়ি পাহারা দেবে। সুবিমল! ভিতরে গিয়ে বসার ঘরে দরজা খুলে দাও।
কাল রাতে যে ঘরে বসেছিলুম, সেই ঘরে আমি ও কর্নেল বসলুম। একটু পরে হৈমন্তী ফিরে এলেন। কর্নেল বললেন,–গতরাতে কোনো উৎপাত হয়নি তো?
হৈমন্তী বললেন,–না। তবে প্রবোধদাতাকে চেনেন কি না জানি না
–চিনি। বলুন!
–আপনারা চলে যাওয়ার পর প্রবোদা মাতলামি করছিল।
–কিছু বলছিলেন কি উনি?
–মাতলামি করে গান গাইছিল। গোপাল আছে শিবের কোলে! সরলামাসি ওকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিল। তবে গানটা শুনে খটকা লেগেছিল।
কর্নেল হাসলেন,–প্রবোধবাবু ঠিকই বলেছিলেন।
–তার মানে?
–পরে বলছি। আপনি বাইরের দরজা বন্ধ করে একবার বাড়ির ভিতরে চলুন।
ভিতরে ঢুকে দেখলুম, বাড়িটার গড়ন ইংরেজি এল অক্ষরের মতো। যে ঘরে বসেছিলুম, সেটার ভিতরের দরজা পশ্চিমমুখী। এটার সংলগ্ন দুটো ঘর দক্ষিণমুখী। উঠোনের দুটো দিকে পাঁচিল। পাঁচিলের উত্তর অংশে শেষ ঘরটার সংলগ্ন টালির চালের রান্নাঘর।
কর্নেল বললেন, আপনার দাদা সম্ভবত এই ঘরটায় থাকতেন। আর আপনি থাকেন রান্নাঘরের পাশে শেষ প্রান্তের ঘরে। তাই না।
হৈমন্তী একটু চমকে উঠে বললেন, হ্যাঁ। আপনাকে কি দাদা এসব কথা বলেছিল?
কর্নেল তার কথার জবাব না দিয়ে বললেন, আপনার দাদার ঘরে তালা আঁটা দেখছি। ওটার ডুপ্লিকেট চাবি নেই?
হৈমন্তী গম্ভীরমুখে বললেন,–না। দাদা নিজের ঘরের চাবি নিজের কাছেই রাখে।
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে একটা সাদা খাম বের করে বললেন,–এর মধ্যে আপনার ঠাকুরদার উইল আছে। উইলের একটা অংশ পড়ে আমার খটকা লেগেছে। পড়ে শোনাচ্ছি।
