কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু বড্ড কুয়াশা। ওবেলায় গাড়িতে যাব বরং।
–বড় মুখুজ্যের ফার্ম দেখলেন?
–দেখলুম। নিচু পাঁচিলের ওপর কাঁটাতারের বেড়া। বাইনোকুলারে যতটা দেখা যায়, দেখলুম।
ঠাকমশাই চলে গিয়েছিলেন। সুবিমল এবার চাপাস্বরে বলল,–দোমোহানির এক মেছুনির নাম রানি। তাকে রানিদি বলে ডাকি। পথে তার সঙ্গে দেখা হল। তার কাছে হাফকিলো পাবদা মাছ ছিল। মাছগুলো দিয়ে রানিদি বলল, প্রায় দেড় কিলো পাবদা ছিল। আসবার পথে বড় মুখুজ্যের ডাকে ফার্মে ঢুকেছিল সে। মাছ ওজন করার সময় রানিদি একপলকের জন্য নাকি জয়গোপালকে দেখেছে। ঘর থেকে বেরিয়েই ঘরে ঢুকে গেল। রানিদি জানে, জয়গোপালবাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সুবিমলের কথা শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলুম। কিন্তু কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমার রানিদি জয়গোপালবাবুকে একপলক দেখেছে। আমি বাইনোকুলারে মিনিটতিনেক দেখেছি। ফার্মের পশ্চিমে গেট। গেটের ভিতর ঢুকলে বাঁদিকে প্রমথবাবুর বাংলো। একেবারে মডার্ন ফার্ম। প্রমথবাবুও পোশাকে আমার চেয়ে বেশি সায়েব। ড্রেসিং গাউন পরে বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে গায়ে রোদ নিচ্ছিলেন। আমি দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পাঁচিলের মাথায় বাইনোকুলার রেখে তাকে দেখছিলুম। আর তার পাশে একটা চেয়ারে বসে আদি অকৃত্রিম জয়গোপালবাবু চা-পান করছিলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখা হল না। একটা তাগড়াই অ্যালসেশিয়ান কুকুর টের পেয়ে দৌড়ে আসছিল। আমি রাস্তার অন্যপাশে একটা আখের জমিতে ঢুকে পড়লুম। অ্যালসেশিয়ানের মুখের পাশে একটা ষণ্ডামার্কা লোকের মুখ দেখলুম। পিচরাস্তায় কাকেও না দেখতে পেয়ে সে কুকুরটাকে নিয়ে অদৃশ্য হল।
সুবিমল বলল,–অদ্ভুত ব্যাপার স্যার! জয়গোপালদা নিজেকে নিজেই লুকিয়ে রেখেছেন তাহলে!
–চেপে যাও। আর ঠাকমশাইকে বলো, আমরা সাড়ে নটায় ব্রেকফাস্ট করে গাড়িতে বেরুব।
সুবিমল চলে গেলে বললুম,–কর্নেল! এমন তো হতেই পারে, রানাঘাট স্টেশনে জয়গোপালবাবুকে গাড়িতে লিফ্ট দেওয়ার ছলে প্রমথবাবু বা তার লোকেরা তাকে কিডন্যাপ করে ফার্মহাউসে রেখেছে। প্রাণের ভয়ে বেচারা চুপচাপ আছেন!
–এবং চেয়ারে বসে চা-ও খাচ্ছেন! রানি মেছুনিকে দেখেই লুকিয়ে পড়েছেন।
কর্নেল মিটিমিটি হাসছিলেন। আমি বললুম,–আহা! ভিতু গোবেচারা লোক। প্রাণের দায়ে মানুষ অনেক কিছু করে।
–এবং পদ্য লিখে ঠাকুরদার সিন্দুকে রাখা জুতো দুটো সাধুখাঁর পোড়ো-ভিটেয় রেখে আসতে বলে!
অবাক হয়ে বললুম,–কর্নেল! আপনি কি সিরিয়াসলি বলছেন?
কর্নেল তার প্রসিদ্ধ অট্টহাসি হাসলেন। তারপর বললেন,–নাঃ! তোমার কথায় যুক্তি আছে। জয়গোপালবাবু সম্ভবত পদ্যচর্চা করতেন। তার ওপর তিনি একটু ছিটগ্রস্ত। প্রমথবাবুর কথায় তিনি পদ্যটা লিখতেও পারেন।
–কিন্তু হৈমন্তীদেবী তো তার ঠাকুরদার সিন্দুক কোথায় আছে জানেন না! তাহলে?
কর্নেল স ম গ্র কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না। কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বারান্দা দিয়ে এগিয়ে গেলেন। সুবিমলকে অফিস থেকে বেরুতে দেখলুম। তারপর কর্নেল তার সঙ্গে অফিসে ঢুকলেন।
সাড়ে নটায় আমরা ব্রেকফাস্ট করলুম। তখনও হালদারমশাইয়ের পাত্তা নেই। কর্নেল বললেন, বলা যায় না। জঙ্গলে বাঘছাল খুঁজতে গিয়ে হালদারমশাই গোয়েন্দাগিরি করতে প্রমথবাবুর ফার্মের আনাচে-কানাচে হয়তো ওত পেতে বসে আছেন। কিন্তু সমস্যা হল, অ্যালসেশিয়ানের পাল্লায় পড়ে ফায়ার আর্মস থেকে গুলি ছুড়লে কী হবে?
ব্রেকফাস্টের পর সুবিমলও আমাদের সঙ্গে আসতে চাইল। কর্নেল একটু হেসে বললেন, –আমরা কিন্তু হালদারমশাইয়ের মতো গোয়েন্দাগিরি করতে যাচ্ছি না। কাজেই তুমি আসতে পারো। তাছাড়া তোমার আসবার অধিকার আছে। কারণ তুমি আপাতদৃষ্টে জটিল রহস্যে ভরা একটা ঘটনার এমন মূল্যবান সূত্র দিয়েছ, যা দিয়ে এই ঘটনার সব জট খুলে যাবে।
মনে-মনে অবাক হলেও কিছু বললুম না। রহস্যের জট খোলার কী মূল্যবান সূত্র দিয়েছে সুবিমল, কে জানে!
মোরামরাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে বাঁদিকে সেই শাল-সেগুনের সরকারি জঙ্গল পেরিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত! গাড়ি থামাও।
গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললুম, কী ব্যাপার?
কর্নেল গাড়ি থেকে নেমে বললেন,–যা ভেবেছিলুম, তাই ঘটেছে সম্ভবত। জঙ্গলের মধ্যে কুকুরের হাঁকডাক কানে আসছে। সুবিমল গাড়িতে বসে থাকো। জয়ন্ত! আমার সঙ্গে এসো তো!
আমারও কানে এল জঙ্গলের মধ্যে কুকুরের প্রচণ্ড চাঁচামেচি। কর্নেলকে অনুসরণ করে জঙ্গলে ঢুকলাম। শুকনো পাতার ওপর নিঃশব্দে চলা কঠিন। কুকুরের গজরানি লক্ষ করে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য! একটা ষণ্ডামার্কা গুঁফো লোকের হাতের চেনে আটকানো প্রকাণ্ড একটা অ্যালসেশিয়ান কুকুর। লোকটা ওপরদিকে তাকিয়ে আছে। আর কুকুরটাও ওপরদিকে মুখ তুলে বিকট হাঁকডাক করছে।
তারপরই দেখতে পেলুম একটা শালগাছের উঁচু ডালে বসে আছেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই। তার হাতে কোনো ফায়ার আর্মস নেই।
গুঁড়ি মেরে দুজনে এগিয়ে গেলুম। ষণ্ডামার্কা গুঁফো লোকটা দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে। আর হালদারমশাই ধমক দিচ্ছেন,–হালার কুত্তারে গুলি কইর্যা মারুম! অরে লইয়া যাও কইতাছি! সত্যই গুলি করুম!
