বললুম,–তাহলে অবনী মুখুজ্যেই হৈমন্তীদেবীর পিছনে লেগেছেন! জয়গোপালবাবুকে তিনিই কিডন্যাপ করে লুকিয়ে রেখেছেন।
কর্নেল এতক্ষণে চুরুট ধরিয়ে বললেন,–আগে খোঁজ নিয়ে দেখা যাক অবনীবাবু পদ্য লিখতে পারেন কি না।
হালদারমশাই নড়ে বসলেন,–পইদ্য? পইদ্যের কথা ক্যান কর্নেলস্যার?
কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর হাত ভরে সেই হলুদ কাগজটা বের করলেন। তারপর বললেন, –আজ বিকেলে জয়গোপালবাবুদের বাড়ির বারান্দায় এটা রাখা ছিল। জয়ন্ত! পড়ে শোনাও। হালদারমশাই কী বলেন শোনা যাক।
আমি পদ্যটা পড়তে থাকলুম :
কর্নেল ডাকার কী দরকার
প্রাণ যদি চাও গোপালদার
সিন্দুক খুলবে ঠাকুরদার
দর্শন পাবে দুই পাদুকার
জঙ্গলে পোডভিটে সাধুখাঁর
নিশিরাতে ঠিকঠাই রাখবার
হুঁশিয়ার পুলিশকে ডাকবার
চেষ্টাটি করলে গোপালদার
মুন্ডুটি ধড় ছেড়ে যাবে তার
হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার
হালদারমশাইয়ের গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে যথারীতি কাঁপছিল। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন,–ঠাকুরদার সিন্দুক! দুই পাদুকা! মানে দুইখান জুতা! জয়গোপালবাবুর পাঁচজোড়া জুতা চুরি গেছে। জুতা! ঠাকুরদার জুতা! জুতা চায় ক্যান? জুতায় কী আছে?
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট বিপ্লব!
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–কী কইলেন? কী কইলেন?
–বাবুগঞ্জের জমিদারের খাজাঞ্চিখানা লুঠ হয়েছিল।
–অ্যাঁ?
–প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি চলছিল কয়েকদিন ধরে। সেই সময় খাজাঞ্চিখানা লুঠ।
হালদারমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,–কর্নেলস্যার কী কইতাছেন জয়ন্তবাবু?
বললুম,–জয়গোপালবাবু কী বলেছিলেন আপনি ভুলে গেছেন হালদারমশাই! উনি বলছিলেন না, ওঁর ঠাকুরদা জমিদারবাড়ির খাজাঞ্চি ছিলেন।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসলেন,–হঃ! মনে পড়ছে। কর্নেলস্যার কইছিলেন খাজাঞ্চি মানে ট্রেজারার। তা ট্রেজারার ভদ্রলোকের জুতা অ্যাদ্দিন পরে চায় কারা? ক্যান চায়?
বললুম,–আমার ধারণা…
কথায় বাধা পড়ল। পর্দা তুলে সুবিমল ঢুকে বলল,আপনারা নটায় ডিনার খেয়ে নিলে ভালো হয় স্যার। ঠাকমশাই বড় শীতকাতুরে মানুষ। বয়সও হয়েছে।
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, ঠিক আছে। নটায় আমরা খেয়ে নেব।
সুবিমল বেরিয়ে গেলে হালদারমশাই বললেন,–জয়ন্তবাবু কী কইতাছিলেন য্যান?
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে আমার দিকে তাকালেন,–রাতবিরেতে জুতোর কথা বললেই ভূতপ্রেতের দল জানালার কাছে এসে জুতো চাইবে। সাবধান জয়ন্ত।
হালদারমশাই খিখি করে হেসে উঠলেন।…
পরদিন সকালে ঘুম ভেঙেছিল ঠাকমশাইয়ের ডাকে। তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট। ঠাকমশাই, কাঁচুমাচু হেসে বললেন,–স্যারের ঘুম ভাঙালুম। কিন্তু বুড়োসায়েব ভোরবেলা আমাকে বলে গেছেন, আপনার বিছানায় বসে বাসিমুখে চা খাওয়ার অভ্যেস।
কর্নেল সর্বত্র এই ব্যবস্থাটা করে প্রাতঃভ্রমণে বের হন। আমার বেড-টি না খেলে বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। চা নিয়ে জিজ্ঞেস করলুম,–ঠাকমশাই! কাল রাত্রে যিনি এসেছেন, সেই হালদারসায়েব কি ওঠেননি?
–উঠেছেন। বুড়োসায়েব বেরিয়ে যাওয়ার পর উনি উঠে আমার কাছে চা চাইলেন। ওঁকে চা দিয়ে আপনাকে দিতে এলুম।
ঠাকমশাই বেরিয়ে যাওয়ার পর চা খেয়ে বাথরুমে গেলুম। প্রাতঃকৃত্যের পর দাড়ি কেটে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট পরে বারান্দায় গিয়ে বসলুম। সেই সময় সুবিমলবাবু সাইকেলে থলে ঝুলিয়ে বাজারে যাচ্ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলুম,–হালদারমশাই কী করছেন?
সুবিমল বলল,উনি কিছুক্ষণ আগে বেরুলেন। আমি বাজার করে শিগগির ফিরে আসছি।
তখনও রোদ আর কুয়াশায় চারদিক রহস্যময় দেখাচ্ছিল। সাড়ে সাতটা বাজে। কিছুটা দূরে পূর্ব-দক্ষিণে সেই সরকারি অরণ্য কুয়াশায় ঢাকা। কিন্তু পুবের ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে নদী পেরিয়ে ম্লান রোদ এসে বাংলোর ফুলবাগানকে ঈষৎ উজ্জ্বল করেছে। হালদারমশাই তো কর্নেলের সঙ্গে বেরোননি। পরে বেরিয়েছেন। কোথায় গেলেন তিনি?
একটু পরে মনে পড়ল, সরকারি শালের বনে বাঘছাল ফেলে এসেছিলেন। সম্ভবত তিনি সেই বাঘছাল খুঁজে আনতে গেছেন। গোয়েন্দাপ্রবর আমাকে বলেছিলেন, ছদ্মবেশের জিনিসপত্র তিনি চিৎপুর এলাকায় যাত্রা-থিয়েটারের সাজপোশাকের দোকান থেকে কেনেন। বাঘছালটা চিৎপুরে কেনা নকল জিনিস হলেও ওটা তো তাকে পয়সা দিয়ে কিনতে হয়েছে। কাজেই ওটা জঙ্গলে ফেলে রাখবেন কেন?
প্রায় নটায় কর্নেল ফিরলেন। সেই ট্যুরিস্টের বেশ! মাথায় টুপি, পিঠে কিটব্যাগ আঁটা। কোমর থেকে ফ্লাক্স ঝুলছে। গলা থেকে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা। তিনি যথারীতি সম্ভাষণ করলেন, –মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে!
–মর্নিং কর্নেল! বেঘোরে ঘুমিয়েছি। কতদূর ঘুরলেন?
–প্রমথ মুখুজ্যের ফার্মের পাশ দিয়ে হেঁটে দোমোহানি জলাধার পর্যন্ত। কিন্তু কুয়াশা কাটতে দেরি হচ্ছিল। বাইনোকুলার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। তাই ফিরে এলুম। পরে দেখা যাবে। হালদারমশাই কোথায়?
–উনি সম্ভবত সরকারি জঙ্গলে ওঁর বাঘছাল খুঁজতে গেছেন। আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। ততক্ষণে সুবিমল বাজার করে ফিরে এসেছিল। ঠাকমশাই ট্রেতে কফি আর স্ন্যাক্স আনছিলেন। তার সঙ্গে সুবিমলও এল। সে বলল,–আপনি কি পায়ে হেঁটে ড্যাম অব্দি গিয়েছিলেন স্যার?
