কর্নেল কাগজটা পকেটে রেখে বললেন, এই নিয়ে তাহলে চারবার ছড়াটা পাওয়া গেল?
অনামিকা মাথা নাড়ল। তারপর পা বাড়িয়ে বলল, ভেতরে আসুন।
সে সিঁড়ি বেয়ে আমাদের ওপরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরে নিয়ে গেল। এই ঘরে সে থাকে। সে সোফায় আমাদের বসিয়ে বেরিয়ে গেল। বললুম, এই তাহলে হাট্টিমরহস্য?
কর্নেল হাসলেন। শুধু এটুকু হলেও কথা ছিল জয়ন্ত। আরও কিছু ব্যাপার আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তুমি সেগুলো জানতে পারবে।
অনামিকা ফিরে এল চায়ের ট্রে আর দু প্লেট সন্দেশ নিয়ে। তারপর একপাশে বসে আগের জের টেনে বলল, তারপর কানাইদা আর আমি বাড়ির চারপাশে ঘুরে খোঁজাখুঁজি করলুম। কাউকে দেখতে পেলুম না। আমরা ফিরে আসছি, হঠাৎ দেখি কখন দাদু ওপর থেকে নেমে এসেছেন। কিছু বলার আগেই দৌড়ুতে শুরু করলেন। পেছন-পেছন কানাইদা দৌড়ুল। কিন্তু দাদু যেন মন্ত্রবলে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কানাইদা ফিরে এসে বলল, ছেড়ে দাও। ফিরে আসবেনখন। এ তো আজ প্রথম নয়।
কর্নেল বললেন, কখন ফিরলেন উনি?
প্রায় ঘন্টাখানেক পরে। বাগানের দিক থেকে এলেন। আমরা এত জিগ্যেস করলুম, জবাবই দিলেন না। সোজা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, সাড়ে দশটা বাজে। এখনও উনি ঘুমুচ্ছেন?
না। সকাল সাতটায় দরজা খুলে চা খেয়েছিলেন। চা দিতেই ফের দরজা আটকে দিলেন। কিছুক্ষণ পরে কানাইদা জানালার খড়খড়ি ফাঁক করে দেখে এসে বলল, ঘুমুচ্ছেন।
ব্রেকফাস্ট করেননি তাহলে?
না। অনামিকা দুঃখিতভাবে বলল। একটু আগে আমি দরজা নক করলুম। সাড়া পেলুম না।
তুমি আরেকবার গিয়ে জোরে দরজায় ধাক্কা দাও তো!
অনামিকা অনিচ্ছুকভাবে বেরিয়ে গেল। বুঝতে পারছিলুম, দাদুর ব্যাপার-স্যাপার দেখে সে যত দুঃখিত, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত।
কর্নেলকে জিগ্যেস করলুম, বাড়িতে কে কে থাকে?
কর্নেল বললেন, কালোবরণবাবু, অনামিকা, আর কানাই নামে একজন চাকর। কানাই ছেলেবেলা থেকে এ বাড়িতে আছে। তাকে বাড়ির লোকই বলা নয়। অবশ্য তাকে আমরা এখনও দেখিনি। অনামিকার মুখে আমি যেটুকু শুনেছি, তা হল, কালোবাবু রেলে স্টেশনমাস্টার ছিলেন। রিটায়ার করে পৈতৃক এই বাড়িতে ফিরে আসেন বছর পনেরো আগে। এখন ওঁর বয়স প্রায় পঁচাত্তর। তবু শক্তসমর্থ মানুষ। ওঁর একমাত্র ছেলে দেবনাথ ছিলেন কাস্টমস অফিসার। বছর দুই আগে খিদিরপুর ডক এলাকার স্মাগলাররা তাকে খুন করে। তার স্ত্রী শ্বশুরের কাছে চলে আসেন। মেয়েকে নিয়ে। স্বামীর শোকে এবং নানা অসুখে ভুগে মাস ছসাত আগে তিনি মারা গেছেন।
হুঁ—মেয়েটা বড় দুর্ভাগা! তা এই হাট্টিমরহস্যের শুরু কবে থেকে?
মাসখানেক হয়ে এল প্রায়। অনামিকা আমার কাছে দিয়েছিল ১৫ই সেপ্টেম্বর। আজ ১৪ই অক্টোবর। হামাসখানেক হল। এর মধ্যে সে আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখে যা যা ঘটেছে, সব জানিয়েছে। আজ যে চিঠিটা পেলুম, তাতে গত সপ্তাহের ঘটনার বিবরণ ছিল। মোটামুটি কাল রাতে যা হয়েছে শুনলে, প্রায় তাই। শুধু একটা বাড়তি ঘটনা ছিল, তা হল : অনামিকা সে-রাতে নিচের বাগানে সত্যি একটা বিদঘুটে প্রাণীকে এক ঝলক টর্চের আলোয় দেখেছে—সেটা নাকি
অবিকল হাট্টিমাটিমের যে ছবি দেখলে সেটারই মতো।
ভড়কে গিয়ে বললুম, বলেন কী!
কর্নেল একটু হাসলেন। তবে তার চেয়ে অদ্ভুত কথা, সকালে বাগানে গিয়ে অনামিকা কয়েকটা পালক কুড়িয়ে পেয়েছিল। পালকগুলো নাকি প্রকাণ্ড। ভেবে দেখো জয়ন্ত, অনামিকা জীববিজ্ঞানের ছাত্রী—বিশেষ করে ওরিন্থােলজি বা পক্ষিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাও করছে। কিন্তু ওই পালকগুলো দেখে সেও ভীষণ অবাক হয়েছে। এমন পালক যার, সে কোন প্রজাপতি পাখি বা প্রাণী, বিজ্ঞানে তার হদিস নেই।
এইসময় অনামিকা ব্যস্তভাবে ফিরে এসে বলল, দাদু সাড়া দিচ্ছেন না।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কৈ, চলো তো দেখি।
অনামিকার দাদুর ঘর দোতলার উত্তর প্রান্তে। কর্নেল দরজার কাছে গিয়ে আমাদের ভীষণ অবাক করে দিয়ে সুর ধরে আওড়ালেন :
হাট্টিমাটিম টিম
তারা মাঠে পাড়ে ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিং
তারা হাট্টিমাটিম টিম।
অমনি ঘরের ভেতর মচমচ ধুপধুপ হল এবং দরজা খুলে গেল। শ্যামবর্ণ, কিন্তু ঘাসচাপা পাতার মতো ফ্যাকাসে গায়ের রং, ঢ্যাঙা গড়নের এক বৃদ্ধ পর্দা তুলেই থমকে দাঁড়ালেন। তারপর কর্নেল ও আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে রাগী গলায় বললেন, কে মশাই আপনারা আমার সঙ্গে রসিকতা করতে এসেছেন।
অনামিকা খিলখিল করে হেসে উঠল। কালোবাবু তার দিকে তেড়ে গিয়ে বললেন, সব তোরই চক্রান্ত অনি! তুই-ই এই লোকদুটোর সাহায্যে আমাকে ভয় দেখাস। এতদিনে সব ফাঁস হয়ে গেল।
কর্নেল বললেন, না, মুখুয্যেমশাই! কিছুই ফাঁস হয়নি।
কালোবাবু বললেন, কে আপনি?
অনামিকা কর্নেল ও আমার পরিচয় দিল। তবু সন্দিগ্ধ দৃষ্টে আমাদের দেখতে দেখতে কালোবাবু বললেন, ঠিক আছে। আমার খিদে পেয়েছে। অনি, আগে আমাকে খেতে দে। তারপর কথাবার্তা হবে।
দুই
কালোবাবুর হাবভাবে মোটেও তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে মনে হচ্ছিল না। রীতিমতো রাশভারি প্রকৃতির মানুষ উনি। নিজের ঘরে আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কর্নেলের প্রশ্নের উত্তরে যা বলেন, তা হল এই
মাস দেড়েক হবে, এক রাত্রে হঠাৎ কিসের শব্দে ওঁর ঘুম ভেঙে যায়। বাগানের দিকের জানালা দুটো ভোলা ছিল। একটা জানালার দিকে চোখ পড়তেই চমকে ওঠেন। কারা যেন উঁকি দিচ্ছে। লোডশেডিংয়ের যুগ বলে রাতে বিছানার পাশে টর্চ রেখে শোন। ঝটপট টর্চ জ্বালতেই দেখেন, দুটো বিদঘুটে মুখ। পেঁচার মতো অবিকল। কিন্তু মানুষের মুখের সাইজ মুখটা। মাথায় দুটো ছোট্ট শিং আছে। ভূতুড়ে গলায় ওরা বলে, ডিম কৈঁ? ডিম দে।
