–সব কমু। কফি খাইয়া লই। হেভি ফাইট দিছি। টায়ার্ড।
কর্নেল বললেন,–সুবিমল! হালদারমশাইয়ের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
সুবিমল বলল,–কোনো অসুবিধে নেই স্যার। ইঞ্জিনিয়ার সেনসায়েব এসে যে ঘরে থাকেন, সেই ঘরে ওঁর থাকার ব্যবস্থা করছি। আর ঠাকমশাইকে বলে আসি, একজন গেস্ট এসেছেন।
সে বেরিয়ে যাওয়ার পর হালদারমশাই ফুঁ দিয়ে দ্রুত কফি শেষ করলেন। তারপর যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই :
কর্নেলের কথামতো সন্ধ্যায় হালদারমশাই শ্মশানঘাট থেকে উঠে বাবুগঞ্জের ভিতর দিয়ে হেঁটে যান। তার নিজস্ব হিন্দিতে জমিদারদের ঠাকুরবাড়ির পথ জিজ্ঞেস করে চলতে থাকেন। তারপর নিজের খেয়ালে সোজা ঠাকুরবাড়িতে না ঢুকে পিছনে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঢুকে পড়েন। ততক্ষণে সন্ধ্যারতি শেষ হয়েছে। হালদারমশাই পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির ভিতরের চত্বরে উজ্জ্বল আলো। তিনি কী করবেন ভাবছেন, হঠাৎ পিছন থেকে টর্চের আলো এসে তার ওপর পড়ে। বেগতিক দেখে তিনি ত্রিশূল তুলে হুঙ্কার দিয়ে তেড়ে যান। কিন্তু তার পিছন থেকে কেউ তাকে জাপটে ধরে। জোর ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। মরিয়া হয়ে হালদারমশাই তার লাইসেন্সড রিভলভার বের করে টর্চের দিকে গুলি ছোড়েন। টর্চের কাঁচ গুঁড়ো হয়ে টর্চ ছিটকে পড়ে। সামনের লোকটা আর্তনাদ করে ওঠে। এদিকে যে পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলেছিল, সে হালদারমশাইয়ের হাতে রিভলভার দেখে এবং গুলির শব্দ শুনে বাপরে! বাপরে! ডাকাত! ডাকাত! বলে চাচাতে-চাঁচাতে রাস্তার দিকে ছুটে যায়। লোকেরা লাঠিসোটা-বল্লম নিয়ে ছুটে আসতে পারে ভেবে হালদারমশাই ত্রিশূলের কথা ভুলে গিয়ে তার ওই ঝোলাটি চেপে ধরে দৌড়তে থাকেন। নাক বরাবর দৌড়ে নির্জন পিচরাস্তা পেয়ে যান। তারপর টর্চের আলো জ্বেলে সামনে শালের জঙ্গল দেখে ঢুকে পড়েন। জঙ্গলের ভিতরে সাধুবাবার বেশ বদলে প্যান্টশার্ট-সোয়েটার-কোট আর হনুমান টুপি পরে জঙ্গল থেকে বেরুচ্ছেন, সেই সময় দেখতে পান, পাশের একটা মারামরাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি আসছে। তিনি লক্ষ করেন ওটা জিপগাড়ি। হাত তুলে গাড়ি দাঁড় করিয়ে তিনি সেচ-বাংলোর কথা জিজ্ঞেস করেন। জিপের চালক বলে, এই মোরামরাস্তা ধরে চলে যান।
কর্নেল বললেন,–ইঞ্জিনিয়ার মিঃ সেনের জিপগাড়ি। চণ্ডী গাড়িটা নিয়ে যাচ্ছিল। যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে, আমাকে তো বটেই, আপনাকেও শত্রুপক্ষ চেনে। এটা একটা ভাববার কথা। তো ওসব পরে ভাবা যাবে। আপনি বাথরুমে ঢুকে অন্তত মুখহাত ধুয়ে ফেলুন। গরমজলের ব্যবস্থা আছে। আপনার মুখে এখনও ছাইয়ের ময়লা লেগে আছে। রুমালে চিতার ছাই মোছা যায় না। আর কপালের লাল রংগুলোও ধুয়ে ফেলবেন।
বললুম,–ছ্যা-ছ্যা! মড়াপোড়া ছাই মুখে ঘষেছিলেন হালদারমশাই?
গোয়েন্দাপ্রবর কোট এবং সোয়েটার খোলার পর খিখি করে হেসে বললেন,–সে-ছাই না। . কাঠ কুড়াইয়া ধুনি জ্বালছিলাম, সেই ছাই।
সুবিমল এসে বলল,থানা থেকে ও.সি. বাসুদেববাবু কর্নেলসায়েবকে ফোন করেছেন!
কর্নেল বললেন,–ফোন কি তোমার অফিসঘরে?
–হ্যাঁ স্যার!
কিছুক্ষণ পরে হালদারমশাই মুখ-হাত ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, –শার্ট-গেঞ্জি-প্যান্ট খুললে অনেক ময়লা বাইরাইব। রাত্রে আর স্নান করুম না। কাইল সকালে স্নান কইর্যা সব সাফ করুম।
তিনি চেয়ারে বসে হঠাৎ লাফিয়ে উঠলেন,–ওই যাঃ।
–কী হল হালদারমশাই?
–বাঘছালখান জঙ্গলে ফ্যালাইয়া আইছি।
–কাল দিনে গিয়ে খুঁজে পাবেন।
এইসময় কর্নেল ফিরে এলেন। জিজ্ঞেস করলুম,–ও.সি. ভদ্রলোককে কেমন বুঝলেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–মজার কথা শোনো। হালদারমশাইও শুনুন। ও.সি. বাসুদেব ঘোষ কথাপ্রসঙ্গে বললেন, একটু আগে অবনী মুখার্জি নামে এক ভদ্রলোক তার একজন কাজের লোককে সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। হৈমন্তীদেবী নাকি কলকাতা থেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এনেছেন। সেই ডিটেকটিভ সাধুবাবার ছদ্মবেশে মুখার্জিবাবুদের ঠাকুরবাড়িতে ঢোকার জন্য উঁকি দিচ্ছিলেন। অবনীবাবুর দুজন লোক তা দেখতে পেয়ে তাকে তাড়া করে। ঠাকুরবাড়িতে ডিটেকটিভ ঢুকবে কোন সাহসে? তো ডিটেকটিভ তাঁর এই লোকটাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়েন। ভাগ্যিস গুলি এর টর্চের মাথায় লেগে কাঁচ গুঁড়িয়ে গেছে। কাজেই সেই সাধুবেশী ডিটেকটিভ আর হৈমন্তীদেবীর নামে এফ, আই. আর. করতে চান অবনীবাবু। ও.সি. তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ব্যাপারটা তদন্ত করবেন বলে বিদায় করেছেন।
হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে তাকিয়ে শুনছিলেন। বললেন,–খাইসে!
–নাঃ! খায়নি। বাসুদেববাবু আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি কি না? বললুম, জানি। প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার একজন প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর। তার আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সড় ফায়ার আর্মস আছে। তবে চরম অবস্থায় পড়লে অর্থাৎ আততায়ী তাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করলে তিনি শুন্যে গুলি ছুঁড়ে ভয় দেখান। মিঃ হালদার দায়িত্বজ্ঞানহীন নন। অবনীবাবুর দুজন লোক তার মুণ্ডু কাটতে চেষ্টা করছিল–যেভাবে হৈমন্তীর কালুর মুন্ডু কাটা হয়েছিল।
হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন,–ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার! একজন আমারে জাপটাইয়া মাটিতে ফেলছিল। অন্যজনের এক হাতে টর্চ ছিল। অন্য হাতে লম্বামতো কী একটা ছিল। দাও হইতে পারে। কুত্তাটার মতন আমার মুণ্ডু কাইট্যা ফেলত।
