কর্নেল একটু হেসে বললেন,–সাধু-সন্ন্যাসীদের স্বভাবই এরকম। কোথায় কখন থাকেন। আবার উধাও হয়ে যান। আচ্ছা চলি। চিন্তা করবেন না। আপনার দাদাকে আশা করি শিগগির উদ্ধার করে দেব।
যে পথে গিয়েছিলুম, সেচ-বাংলোয় সেই পথেই এসেছিলুম। ঠান্ডায় আমার হাত-পা প্রায় নিঃসাড়। সুবিমল ঠাকমশাইকে কফির তাগিদ দিয়ে রুমহিটারের সুইচ অন করে দিল। তারপর সে বেরিয়ে গেল। তখন কর্নেলকে চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করলুম,হালদারমশাইয়ের কানে কী ফুসমন্তর দিলেন যে উনি শ্মশানঘাট থেকে উধাও হয়ে গেলেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–কাল বাবুগঞ্জে এসেই হালদারমশাই শ্মশানঘাটের ওদিকে ঝোঁপের আড়ালে সাধু সেজে গিয়েছিলেন। তারপর শ্মশানঘাটের বটতলায় ধুনি জ্বেলে বসে ছিলেন। তাঁর বরাত ভালো। হৈমন্তীর সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রতি খুব ভক্তি আছে। সেটা অবশ্য তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। তরে তার দেখাদেখি সরলারও একইরকম ভক্তি আছে। সরলা কাল বিকেলে শ্মশানঘাটে এক সাধুবাবাকে দেখে হৈমন্তীকে খবর দিয়েছিল। ব্যস্! শীতের রাতে শ্মশানঘাটে কাটানো সম্ভব ছিল না বলব না। কারণ হালদারমশাইয়ের পক্ষে পুলিশজীবনে অমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু ওখানে বসে থেকে কষ্ট করে রাত কাটিয়ে তার লাভটা কী? তার উদ্দেশ্য ছিল জয়গোপালবাবুর বাড়ির আনাচেকানাচে ওত পেতে দুবৃত্তদের পাকড়াও করা। কাজেই হৈমন্তী তার সেবাযত্ন করতে চাইলে প্রত্যাখ্যান করবেন কেন?
–তাহলে গতরাতে গোয়েন্দামশাই দুবৃত্তদের সঙ্গে লড়াইয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন?
–নাঃ! তারা আড়াল থেকে সম্ভবত দেখেছিল ত্রিশূলধারী এক সাধুবাবা হৈমন্তীর অতিথি!
–তা উনি আজ হঠাৎ বেপাত্তা হলেন কেন? আপনার পরামর্শে?
–হ্যাঁ। হালদারমশাই আমাকে খবর দিলেন, জয়গোপালবাবু বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ। তাঁর বোন থানা-পুলিশ করে বেড়াচ্ছেন। কথাটা শুনেই আমি ওঁকে পরামর্শ দিলুম, প্রাক্তন জমিদারপরিবারের ঠাকুরবাড়িতে চলে যান। খুব হুঙ্কার ছাড়বেন। তন্ত্রমন্ত্র আওড়াবেন।
–তাতে কী লাভ!
–মুখুজ্যেবাড়ির লোকজনের গতিবিধির খবর দৈবাৎ মিলতেও পারে।
–জয়গোপালবাবুর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে মুখুজ্যেদের কোনো যোগাযোগ আছে বলে মনে করছেন?
–জানি না। তবে চান্স নিলে ক্ষতি কী?
এই সময় ঠাকমশাই ট্রেতে কফি আর পাঁপড়ভাজা এনে টেবিলে রাখলেন। তারপর বললেন,–সাহেবকে থানা থেকে ফোন করেছিল কেউ। চণ্ডী ফোন ধরেছিল।
–চণ্ডী কোথায়?
-আজ্ঞে সে বাড়ি চলে গেছে। কাল সকালে ইঞ্জিনিয়ারসাহেবকে জিপগাড়িতে চাপিয়ে সে কোথায় নিয়ে যাবে। গ্যারেজ থেকে জিপগাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেছে চণ্ডী। বুঝলেন স্যার? জিপগাড়িটা ইঞ্জিনিয়ারসায়েব আপনাদের জন্যই পাঠিয়েছিলেন। আপনারা গাড়ি এনেছেন শুনে ইঞ্জিনিয়ারসায়েব জিপগাড়িটা চণ্ডীকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন।
ঠাকমশাই মাথায় মাফলার জড়িয়েছেন এবং গায়ে আস্ত একখানা কম্বল। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পর বললুম,–একটা ব্যাপার ভারি অদ্ভুত লাগছে।
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–বলো!
–কিডন্যাপার হুমকি দিয়ে পদ্য লিখল কেন? সে এও জানে স্বয়ং কর্নেল নীলাদ্রি সরকার জয়গোপালবাবুর কেস নিয়েছেন এবং এখানে এসেছেন। লোকটাকে রসিক মনে হচ্ছে।
কর্নেল হাসলেন,–পল্লীকবিও বলতে পারো। ছন্দ আর মিল দেখে মনে হচ্ছে, সে অনেকদিন ধরে পদ্য লেখে। অবশ্য আমার তো মনে হয়, বাঙালিরা জাতকবি।
-–আচ্ছা কর্নেল, আপনি কখনও কবিতা লিখেছেন?
বাইরে সুবিমলের কণ্ঠস্বর শোনা গেল,–কার সঙ্গে কথা বলছ জগাই।
–এক ভদ্রলোক সায়েবদের সঙ্গে দেখা করতে চান।
কর্নেল বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে বললেন, কী আশ্চর্য! হালদারমশাই যে! আসুন! আসুন! সুবিমল! গেট খুলে দিতে বলো!
আমি চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু বাইরে গেলাম না। কর্নেলকে বলতে শুনলাম,–সুবিমল! পটে প্রচুর কফি আছে। একটা কাপ নিয়ে এসো!
কর্নেলের পিছনে হালদারমশাই ঢুকলেন। সাধুবাবার বেশে নয়, প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার কোট-হনুমানের টুপি পরে এবং কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে। বললুম,–কর্নেল বলছিলেন আপনি মুখুজ্যেদের ঠাকুরবাড়িতে ।
আমাকে থামিয়ে দিয়ে হালদারমশাই বললেন,–পরে কইতাছি। আগে রেস্ট লই।
কর্নেল চুপচাপ বসে কফিপানে মন দিলেন। একটু পরে সুবিমল একটা কাপ-প্লেট আনল। কর্নেল বললেন,–সুবিমল! ইনি আমার বন্ধু-ওঃ হো তুমি তো দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় জয়ন্তর ক্রাইম-রিপোর্টাজ পড়ো। তাহলে অনুমান করো নি কে?
হালদারমশাই কাপে কফি ঢালতে-ঢালতে বললেন,–আইজ রাতে হেভি শীত পড়ছে।
সুবিমল মুচকি হেসে বলল,–মনে পড়েছে। আপনি হালদারমশাই বলে ডাকলেন, তখন আমার অত খেয়াল ছিল না। নমস্কার স্যার। আমি বাংলোর কেয়ারটেকার সুবিমল হাজরা।
গোয়েন্দা এবার হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–বয়সে পোলাপান! আপনি কমু ক্যান? তুমিই কমু!
–নিশ্চয় স্যার! আপনাদের তিনজনকে একত্রে চর্মচক্ষে দেখতে পাব তা কল্পনাও করিনি।
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–সুবিমল! বিকেলে শ্মশানঘাটে এঁকেই তুমি নমো করেছিল!
সুবিমল চমকে উঠে বলল,–কী অদ্ভুত! ইনিই সাধুবাধা সেজে শ্মশানঘাটে বসেছিলেন!
–হ্যাঁ, ওই প্রকাণ্ড ব্যাগে ওঁর জটাজুট দাড়ি-টাড়ি আছে। কিন্তু ত্রিশূল? হালদারমশাই! ত্রিশূল কোথায় ফেলে এলেন?
