পরেশবাবু বললেন,–কোনো বজ্জাত তোমাকে হুমকি দিয়ে পদ্য লিখেছে। ওই কাগজটা সুতোয় জড়িয়ে ইটের টুকরোতে বেঁধে বারান্দায় কখন সে রেখে গিয়েছিল।
কর্নেল বললেন, আপনাকে লেখা চিঠি আপনি পাবেন। আগে কানে শুনে নিন। পড়ো জয়ন্ত!
চিঠিটাতে লেখা পদ্য ছন্দ মিলিয়ে পড়তে শুরু করলুম।
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার
তাঁহাকে ডাকার কী দরকার
প্রাণ যদি চাও গোপালদার
সিন্দুক খুলবে ঠাকুরদার
দর্শন পাবে দুই পাদুকার
জঙ্গলে পোডড়া-ভিটে সাধুখাঁর
নিশিরাতে ঠিকঠাই রাখবার
হুঁশিয়ার পুলিশকে ডাকবার
চেষ্টাটি করলে গোপালদার
মুন্ডুটি ধড় ছেড়ে যাবে তার
হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার
কর্নেল বললেন,–চিঠিটা ওঁকে দাও জয়ন্ত!
হৈমন্তীদেবীর হাতে চিঠিটা দিয়ে চায়ে চুমুক দিলুম। তারপর লক্ষ করলুম, হৈমন্তী চিঠিটাতে দ্রুত চোখ বুলিয়ে বললেন,–কর্নেলসায়েব! এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! গোলমেলে ঠেকছে।
কর্নেল বললেন, আগে বলুন কোথায় জঙ্গলে কোনো সাধুখাঁর পোড়ো-ভিটে আছে নিশ্চয় আপনি জানেন?
-হ্যাঁ। পুরোনো জমিদারবাড়ির ওধারে হরনাথ সাধুখাঁ নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়ি ছিল। এখন তো সেই জমিদারবাড়ি ধ্বংসস্তূপ। হরনাথবাবু এখন বাজারে এসে বাড়ি করেছেন। চাল-ডাল এসবের আড়তদারি ব্যবসা করেন তিনি।
–আপনার ঠাকুরদার সিন্দুক কোথায় আছে?
হৈমন্তীদেবী কর্নেলের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নামালেন। তারপর মাথা নেড়ে আস্তে বললেন,–জানি না।
–আপনার ঠাকুরদার উইল আমি আপনার দাদার কাছ থেকে নিয়ে দেখেছি। তাতে একটা প্রাচীন সিন্দুকের কথা আছে। কিন্তু অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ করলুম। আপনাদের তিনকামরা বাড়িটা একতলা। অথচ উইলে লেখা আছে, বাড়ির একটা অংশ দোতলা। সেই অংশের একতলায় সিন্দুকটা আছে।
পরেশবাবু বললেন, আমি তো এ বাড়িতে ছোটবেলায় কতবার এসেছি। দোতলায় কোনো ঘর দেখিনি। যদি আমার জন্মের আগে কোনো অংশ দোতলা থাকত, সে কথা নিশ্চয় জানতে পারতুম।
হৈমন্তীদেবী গম্ভীরমুখে বললেন,–দোতলা ঘর থাকলে তা ভেঙে যাওয়ার কোনো চিহ্ন থাকত। আমি উইল দেখেছি। ওটা যে মুহুরিবাবু লিখেছিলেন, তারই ভুল বলে আমার ধারণা।
কর্নেল বললেন, আপনার দাদার কী ধারণা, জানেন?
–দাদার বিশ্বাস, সিন্দুকটা কোনো ঘরে পোঁতা আছে।
–আপনার ঠাকুরদার পাদুকা অর্থাৎ জুতোর ব্যাপারটা কী, আপনি জানেন?
–নাঃ! দাদা আসবার পর তার অনেকগুলো জুতো হারিয়েছিল। তারপর দাদা নিজেই হারিয়ে গেল। শেষে এই চিঠি। কে বা কারা দাদাকে কোথায় বন্দি করে রেখে ঠাকুরদার জুতো দাবি করছে–কিছু বুঝছি না।
–পরেশ! পুলিশ কি জয়গোপালবাবুর অন্তর্ধানের কোনো হদিস পেয়েছে?
পরেশবাবু বললেন,–বাবুগঞ্জে হরেন নামে একজন গোয়ালা আছে। সে দুধের কারবার করে। রোজ কলকাতা যাতায়াত করে সে। সে পুলিশকে বলেছে, প্ল্যাটফর্মে ভিড়ের মধ্যে গোপালদাকে সে দেখেছিল। আর মকবুল নামে একটা লোক ডিমের কারবারি। সে স্টেশনের পিছনে বাসে চাপবার সময় গোপালদাকে দেখতে পেয়েছিল। গোপালদা হন্তদন্ত হেঁটে একটা প্রাইভেট কারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তখন বাস ছেড়ে দেয়। কাজেই মকবুল আর কিছু দেখতে পায়নি। কাজেই পুলিশ ঠিকই সন্দেহ করেছে, গোপালদা কারও প্রাইভেট কারে চেপেছিলেন। সে-ই তাকে সুযোগ পেয়ে অপহরণ করেছে।
–গাড়ির রং কী গাড়ি, তা কি মকবুল লক্ষ করেছিল?
–গাড়িটার যা বর্ণনা মকবুল দিয়েছে, তাতে অ্যামবাসাডার বলে মনে হয়েছে। গাড়িটার রং তত সাদা নয়। মেটে রঙের। এখন সমস্যা হল, বাবুগঞ্জে আজকাল অসংখ্য গাড়ি আছে। হিমিদির সন্দেহ অবনী মুখুজ্যের গাড়ি। কিন্তু তার অ্যামবাসাড়ার গাড়ি নেই। সাদা রঙের মারুতি আছে।
বলে পরেশবাবু ঘড়ি দেখলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–হিমিদি! আমাকে সাড়ে সাতটার বাসে কলকাতা ফিরতে হবে। কর্নেলসায়েব! আমি একদিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলুম। আপনি যখন এসে গেছেন, আমি নিশ্চিন্ত! বাবুগঞ্জ থানার ও.সি. বাসুদেব ঘোষ এখানে আপনার আসবার কথা জানেন। পুলিশ সুপার তাঁকে খবর দিয়েছেন। বাসুদেববাবু সেচ-বাংলোেয় আপনার সঙ্গে আজ রাত্রেই দেখা করতে যাবেন।
পরেশবাবু হৈমন্তীদেবীর সঙ্গে বাড়ির ভিতরে গেলেন। সেই সময় সুবিমল চাপাস্বরে বলল, –স্যার! আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। কর্নেল বললেন,–কী সন্দেহ?
–হিমিদির ঠাকুরদার সিন্দুক কোথায় লুকোনো আছে তা হিমিদি হয়তো জানেন।
–কী করে বুঝলে?
–হিমিদির চোখ-মুখ দেখে। সিন্দুকের কথা শুনেই উনি কেমন যেন চমকে উঠেছিলেন।
কর্নেল কিছু বলার আগেই একটা ব্রিফকেস হাতে নিয়ে পরেশবাবু এলেন। তারপর আমাদের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। হৈমন্তীদেবী বাইরের বারান্দায় গিয়ে তাকে বললেন,–তোমাকে টেলিফোন করে সব জানাব পরেশ। তিনি ভিতরে এলে কর্নেল বললেন, –হৈমন্তীদেবী! ওই পদ্যে লেখা চিঠিটা আমার দরকার। আপনার দাদাকে উদ্ধার করার জন্য ওটা একটা মূল্যবান সূত্র। তবে একটা কথা। পুলিশকে এই চিঠির কথা যেন জানাবেন না।
চিঠিটা হৈমন্তীদেবীর হাতের মুঠোয় ছিল। তিনি কর্নেলকে সেটা দিলেন। এই সময় সরলার, সাড়া পাওয়া গেল। সে বাইরের বারান্দায় উঠে ঘরে ঢুকল! তার হাতে ছোট একটা কেটলি আর কাঁচের গেলাস। সে বলল,–গিয়ে দেখি শ্মশানঘাটে ধুনির আগুন আছে। কিন্তু সাধুবাবু নেই। ডাকাডাকি করে সাড়া পেলুম না।
