হাট্টিমাটিম টিম
তারা মাঠে পাড়ে ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিং
তারা হাট্টিমাটিম টিম।
অবাক হয়ে বললুম, হঠাৎ ছড়া আওড়াতে শুরু করলেন যে?
কর্নেল তাঁর সাদা দাড়ি থেকে কী একটা বের করে ফেলে দিলেন। পোকা হওয়াও বিচিত্র নয়। সেই ভোরবেলা থেকে আটটা পর্যন্ত ছাদের বাগানে হরেকজাতের উদ্ভিদের সেবা করেছেন। দাড়িতে পোকা ঢুকে থাকা খুবই সম্ভব। হাসতে হাসতে বললেন, জয়ন্ত, ঠিক হাট্টিমাটিম টিমের মতোই পৃথিবীতে কিছুকিছু আজব মানুষ আছে। না, না—তাদের সকলেরই শিং আছে বা তারা মাঠে ডিম পাড়ে, সেকথা বলছি নে। কিন্তু তাদের ব্যাপার-স্যাপার দেখে তাজ্জব লাগে। যেমন ধরো, এই ভদ্রলোক–কালোবরণ মুখুয্যে।
চিঠিটা বুঝি তাঁরই?
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। চিঠিটা টেবিলে চাপা দিয়ে পায়চারি করতে করতে বললেন, না—চিঠিটা তার নয়। তাঁর নাতনি অনামিকার। সে আবার কিনা বিজ্ঞানের ছাত্রী। ঠাকুর্দার রকম-সকম দেখে ভড়কে গেছে। শেষে আমরাই শরণাপন্ন হয়েছে। কিন্তু আমি কি ভূতের ওঝা?
রহস্যের গন্ধ পেয়ে বললুম, কালোবরণ মুখুয্যেকে কি ভূতে ধরেছে?
তাই তো লিখেছে। বলে কর্নেল হঠাৎ মাথার টুপি খুলে প্রশস্ত টাক থেকে এবারও সম্ভবত একটা পোকা ঝেটিয়ে ফেললেন। তবে কথাটা হল, মানুষ বুড়ো হলে কিছুটা ভীমরতি ধরতেই পারে। যেমন আমারও মাঝে মাঝে ধরে। সেটা বিলক্ষণ বুঝতেও পারি। কিন্তু তাই বলে কি আমি রাতদুপুরে কোনও উদ্ভুট্টে কাণ্ড করি?
বিরক্ত হয়ে বললুম, আসল কথাটা বলুন না! এসবের সঙ্গে হাট্টিমাটিমের কী সম্পর্ক?
কর্নেল কিছুক্ষণ চুপচাপ পায়চারি করার পর আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, তোমার কি সময় আছে হাতে? চলো না একবার ঘুঘুডাঙা থেকে বেড়িয়ে আসি। কলকাতা থেকে কাছেই।
এদিন আমার ছুটি। তবে বলা যায় না কিছু। কাগজের আপিসে সাংবাদিকের চাকরি পুলিশের চাকরির মতোই। বিশেষ করে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার কর্তৃপক্ষের বড় বেশি সুনজর তাঁদের এই স্পেশাল রিপোর্টারটির ওপর। ছুটির দিনেও তলব পাঠিয়ে হুকুম দিতে পারেন, ধাদ্ধাড়া-গোবিন্দপুরে সাংঘাতিক খুনোখুনি হয়েছে। এক্ষুনি গিয়ে সরজমিন খোঁজখবর নিয়ে এস। তার মানে ওটাই পরদিন সকালে পাবলিককে খাওয়াতে হবে। পাবলিকও এমন হয়েছে আজকাল যে রোজ সক্কালবেলা রক্ত-গরমকরা খবর ছাড়া আর কিছু মুখে রোচে না।
আমার মুখে নিশ্চয় এইসব দোনামনার ছাপ ফুটে উঠেছিল। কর্নেল একটু হেসে বললেন ফের, ডার্লিং! চিন্তা কোরো না। ঘুঘুডাঙার হাট্টিমরহস্য ফাঁস হলে তোমার কাগজের প্রচারসংখ্যা দশগুণ বেড়ে যাবে। কর্তৃপক্ষকে বরং ফোনে এখনই তার ইশারা দিয়ে রাখো।
এরপর আর না করা চলে না। ষষ্ঠীচরণ কফি রেখে গেল। কফি খেয়েই আমরা বেরিয়ে পড়লুম। আমার ফিয়াট গাড়িটা মাঝে মাঝে একটু গণ্ডগোল বাধায়। কিন্তু এদিন দিব্যি খুশমেজাজে ছুটে যেতে আপত্তি করছিল না।
হাট্টিম রহস্যটা কী, রাস্তায় বারতিনেক জিগ্যেস করেও জবাব পেলুম না। কর্নেল চোখবুজে ধ্যানস্থ হয়েছেন তো হয়েছেনই। আশ্চর্য ব্যাপার, অভ্যাসমতো গাড়ির জানালা দিয়ে পাখি দেখার কথাও যেন ভুলে গেছেন। অথচ বুকের ওপর দিব্যি বাইনোকুলারটি ঝুলছে।
চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ঘন্টাখানেকের মধ্যে আমরা ঘুঘুডাঙা পৌঁছে গেলুম। শহর ও গ্রামে জটপাকানো মাঝারি সাইজের একটা জনপদ। কালোবরণ মুখুয্যের বাড়িটা একেবারে শেষদিকে মাঠের ধারে। একে-ওকে জিগ্যেস করে পৌঁছুতে অসুবিধে হল না।
পরিবেশটা কেমন নির্জীব, খাঁ খাঁ। এদিকে ওদিকে কিছু ভিটে, ভাঙাচোরা দালানকোঠা, কদাচিৎ দু-একটা নতুন বাড়ি, আর ঝোপঝাড় গাছপালায় ভর্তি। কালোবাবুর বাড়ির গেটে মান্ধাতা আমলের ফলকে লেখা আছে : স্বর্গপুরী।
স্বর্গপুরীর দশা বড় করুণ। প্রকাণ্ড সেকেলে দোতলা বাড়িটার গায়ে ছালচামড়া খুব কমই আছে। গেটের কাছে গাড়ি থামতে থামতে একটি ফুটফুটে ফর্সা তরুণী দৌড়ে এল। বছর কুড়ি-একুশের মধ্যে তার বয়স। বেশ স্মার্ট বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। চোখে চশমা আছে। কর্নেল পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগেই বুঝতে পেরেছিলুম, এই সেই নাতনি—শ্রীমতী অনামিকা।
কর্নেল বললেন, তোমার দাদুর খবর কী, অনি?
অনামিকা তক্ষুনি গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, দাদু এখন ঘুমুচ্ছেন। কাল রাতে সে কী কাণ্ড, কল্পনা করতে পারবেন না। সবে একটু চোখের পাতা টেনে ধরেছে, আমার দরজায় ধাক্কা। দাদুর গলা শুনে দরজা খুলে দিলুম। দাদু ভেতরে ঢুকে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, তারা এসেছে! আমাকে লুকিয়ে রাখ শিগগির! আমি টর্চ নিয়ে বেরুলুম। তখন লোডশেডিং চলছিল। কানাইদা নিচে থেকে ব্যস্তভাবে লণ্ঠন নিয়ে এল। দাদুকে ঘরে রেখে আমরা প্রথমে গেলুম দাদুর ঘরে। তন্নতন্ন খুঁজে কাউকে দেখতে পেলুম না শুধু মেঝেয় এই চিরকুটটা পড়ে থাকতে দেখলুম। এই দেখুন। আবার সেই ছড়াটা লেখা রয়েছে।
কর্নেল ভাঁজ করা কাগজটা মেলে ধরলেন। পাশ থেকে উঁকি মেরে দেখি, কর্নেলের মুখে শোনা সেই হাট্টিমাটিম ছড়াটা লেখা আছে গোটাগোটা সুন্দর হরফে। আর পাশে আঁকা আছে একটা ছবি। ছোটদের ছড়ার বইয়ে হাট্টিমাটিম নামে আজব প্রাণীর যে ছবি দেখা যায়, সেই ছবি, পেঁচার মতো মুখ, মানুষের মতো দুপায়ে দাঁড়ানো, বড়-বড় চোখওয়ালা পাখি এবং তাদের মাথায় দুটো খোঁচাখোচা শিংও আছে। গা ভর্তি পালক।
