হালদারমশাই সহাস্যে বললেন, আমি তো যামুই। হেভি একখান মিস্ত্রির লেজটুকু দেখছি। কিন্তু কর্নেলস্যারের লগে-লগে একদিন ঘুইরাও আসল কথাটা আপনি বুঝলেন না জয়ন্তবাবু?
–আসল কথাটা কী?
গোয়েন্দাপ্রবর চোখ নামিয়ে বললেন,–পক্ষী! উনি চোখে বাইনোকুলার দিয়া ওয়াটারড্যামে পক্ষী দেখবেন! বেনেপুকুরের এস. আই. ভদ্রলোক কর্নেলস্যারকে হেভি পক্ষীর খবর দিছেন!
কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–ঠিক বলেছেন হালদারমশাই! সাইবেরিয়ান হাঁস হেভি পক্ষীই বটে। একেকটার ওজন আট-দশ কিলোগ্রামেরও বেশি। সুদূর উত্তরের সাইবেরিয়া থেকে প্রতি শীতে চীন পেরিয়ে হিমালয় ডিঙিয়ে ওরা বাংলার মিঠে জলে সাঁতার কাটতে আসে। আবার শীতের শেষে দেশে ফিরে যায়। প্রকৃতির এ এক বিচিত্র রহস্য! পরিযায়ী পাখিদের রহস্য!
হাসি চেপে বললুম, হ্যাঁ। এ-ও হেভি রহস্য।
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, তুমি সাংবাদিক। একালের সাংবাদিকরা সর্ববিদ্যাবিশাবদ। জয়ন্ত! তোমার জানা উচিত ছিল, পাখিদের হাজার-হাজার মাইল উড়ে আসা এবং ঠিক পথ চিনে ঘরে ফেরা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কত গবেষণা চলেছে। পাখিদের এই পরিযানের রহস্য আজও সঠিকভাবে সমাধান করা যায়নি। শুনলে অবাক হবে, জিনোমবিজ্ঞানীরাও পরিযায়ী পাখিদের ডি. এন. এ.-র মধ্যে …
আবার ডোরবেল বাজল। তাই কর্নেলের বক্তৃতা শোনা থেকে রেহাই পেলুম। কর্নেল যথারীতি হাঁকলেন,ষষ্ঠী!
একটু পরে আমাদের আবার হতবাক করে বাবুগঞ্জের জয়গোপাল রায় এক হাতে জুতোজোড়া নিয়ে ঘরে ঢুকলেন এবং পরক্ষণে জিভ কেটে জুতোদুটো পায়ে পরে সোফায় বসলেন।
কর্নেল বললেন, আপনার ঠাকুরদার প্রপার্টি পেলেন?
জয়গোপালবাবু কাচুমাচু মুখে হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–হা স্যার! ভাগ্যিস ওই ভদ্রলোক মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। উনি মনে করিয়ে না দিলে আবার পরের রোববার আসতে হত।
বলে তিনি হালদারমশাইয়ের দিকে তাকালেন। হালদারমশাই বললেন,–কী কন বুঝি না!
জয়গোপালবাবু বললেন,–আজ্ঞে স্যার, এন্টালি মার্কেটের উল্টোদিকে ডাক্তার লেনে আমাদের বাবুগঞ্জের এক ল-ইয়ার পাঁচুবাবু থাকেন। পঞ্চানন বারিক। আমার ঠাকুরদার প্রপার্টির উইল ওঁর সাহায্যেই আমার বাবা কোর্টে প্রবেট করিয়েছিলেন। ঠাকুরদার উইলে বসতবাড়ির লাগোয়া কাঠাদশেক জমির কথা ছিল। জমিদারবংশের প্রমথ মুখুজ্যেমশাইয়ের খুড়তুতো ভাই অবনী জমিটা দখলে রেখেছিল। বাবা মামলা-মোকদ্দমা করবেন, না রেলের গার্ড হয়ে কঁহা-হা মুল্লুক ঘুরে বেড়াবেন। তখন বলেছিলুম, বাবা কাটিহারে মারা যান। তো আমি রেলের চাকরি থেকে রিটায়ার করে বাড়ি ফিরলুম। তখন আমার বোন হৈমন্তী আমাকে ওই জমিটার কথা বলল। হৈমন্তীর আগেই পাঁচুবাবু ল-ইয়ারের সঙ্গে বাবুগঞ্জে ওঁর দেশের বাড়িতে কথা বলেছিল। তারপর সেই উইল পাঁচুবাবু দেখতে চেয়েছিলেন।
কর্নেল বললেন,–বুঝেছি। আপনার ঠাকুরদার উইল পাঁচুবাবুর কাছেই থেকে গিয়েছিল!
–আজ্ঞে হ্যাঁ, গত রোববার পাঁচুবাবু দেশের বাড়িতে গিয়েছিলেন। হৈমন্তী তার কাছে উইল চাইতে গিয়েছিল। উনি বলেছিলেন, পরের রোববার আমি যেন কলকাতা গিয়ে উইলখানা ওঁর কাছে ফেরত নিই। কারণ এদিন উনি বাবুগঞ্জে যাবেন না। ফ্যামিলি নিয়ে সাড়ে দশটার বাসে চেপে তারাপীঠে তীর্থ করতে যাবেন।
–পেলেন উইল?
জয়গোপালবাবু একটু হেসে বললেন,–আর একটু দেরি করলেই ওঁকে পেতুম না। তীর্থ করতে বেরুনোর মুখে বাগড়া দিলুম। একটু বিরক্ত হয়েই বাড়ি ঢুকে প্যাকেটটা এনে দিলেন। বললেন, দশকাঠা দখলি জমি এতদিন পরে ফেরত পাওয়ার হ্যাপা অনেক। ফিরে এসে বলবেন।
–আপনার ঠাকুরদা সম্পত্তির উইল করেছিলেন কেন? আপনার বাবা ছাড়া কি আর কোনো ছেলে-মেয়ে ছিল তার?
জয়গোপালবাবু কী বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন। বললেন না।
কর্নেল বললেন, সম্পত্তির আইনত কোনো নির্দিষ্ট প্রাপক না থাকলে এবং সম্পত্তির পরিমাণ বেশি হলে তবেই লোক উইল করে। তাই জিজ্ঞেস করছি আপনার ঠাকুরদা উইল করেছিলেন কেন?
জয়গোপালবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন,–ঠাকুরদার শেষ বয়সে দেখাশোনা করতেন আমার পিসিমা। বাবা তো রেলের গার্ড।
–তার মানে, আপনার ঠাকুরদার একটি মেয়ে ছিল?
–ঠিক ধরেছেন স্যার। তো তারও দুর্ভাগ্য আমার বোনের মতো। পিসিমাও বিধবা ছিলেন। তাঁর একটি মাত্র ছেলে। তার নাম প্রবোর। সে এখন বাবুগঞ্জে আছে। ঠাকুরদার শুধু বসতবাটি আর তার লাগোয়া দশকাঠা পোড়ো জমি বাবাকে দিয়ে গেছেন। উইলে সম্পত্তির বেশি অংশই ছিল পিসিমা কুমুদিনীর নামে। পিসিমা মারা গেলে সেই সম্পত্তি প্রবোধ পেয়েছিল। ধানি জমি, পুকুর, একটা আমবাগান। উড়নচণ্ডী প্রবোধ সব বেচে খেয়ে এখন অবনী মুখুজ্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। নির্লজ্জ বজ্জাত! হৈমন্তীর কাছে কম টাকা ধার করেছে। আমাকে দেখলে এখন ছায়া মাড়ায় না!
–আপনার বোন হৈমন্তী টাকা পান কোথায়?
জয়গোপালবাবু চাপাস্বরে বললেন,–প্রাইমারি স্কুলের টিচার যে! অনেক টাকা মাইনে পায়। আপনার দিব্যি স্যার! রেলে আমি হৈমন্তীর মাইনের আদ্ধেক টাকা মাইনে পেতুম। অবশ্য পেনশন পাচ্ছি! হৈমন্তীও পাবে! বদমাশ প্রবোধের মুখ থেকে লালা ঝরবে না? বলুন! অবনী মুখুজ্যে ওকে আশ্রয় দিয়ে দু-দশটাকায় সব সম্পত্তি গ্রাস করেছে। প্রবোধের সায় না থাকলে অবনী আমার বাবার ন্যায্য দশকাঠা জমি দখল করতে পারত? হৈমন্তী তো মেয়ে। সে একা কী করতে পারত?
