হালদারমশাই বললেন,–জয়ন্তবাবু! আপনি সাংবাদিক। পুলিশের কামের মেথড বুঝবেন না।
হাসতে-হাসতে বললুম,–মেথডটা কী?
–মশায়! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। মেথডটা আমি জানি। ভদ্রলোক রাত্রিকালে চোরের উৎপাতের কথা কইছিলেন। তারপর ওনার কুত্তাটার মাথা কাইটা ঝুলাইয়া দিছিল অরা। এখন পুলিশের কাম হইল গিয়া কুত্তার মুণ্ডু ডাক্তারেরে দেখাইয়া সার্টিফিকেট লওয়া। পুলিশ যখন ডায়েরি লিখছে, তখন ওই কুত্তার মুণ্ডুকাটার ঘটনাও পুলিশের ডিউটির মধ্যে পড়ে। আপনাগো দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় লিখছে, মৎস্যজীবীগো জালে পাওয়া মুণ্ডুকাটা বডিটার খোঁজ লইতে গেছে পুলিশ! তা হইলেই বুঝুন!
হালদারমশাই ঢ্যাঙা বলিষ্ঠ গড়নের মানুষ। মাথার চুল খুঁটিয়ে ছাঁটা। তিনি ছদ্মবেশ ধরতে পটু। তবে তিনি বড্ড হঠকারী স্বভাবের মানুষ। পুলিশ ইন্সপেক্টরের পদ থেকে রিটায়ার করলেও মাঝে-মাঝে সেই কথাটা ভুলে গিয়ে বিভ্রাট বাধান। আজ সকালে বুঝতে পারছিলুম, তার নাকের ডগায় একখানা অদ্ভুত কেস এসে ঝুলছিল। কেসটা কর্নেলের হলেও তিনি এতে নাক গলাতে উদগ্রীব। অবশ্য এ-ও সত্যি, অসংখ্য জটিল রহস্যজনক কেসে কর্নেল তাঁর সাহায্য নেন। তাই লক্ষ করছিলুম, পুলিশের কাজের মেথড়’ নিয়ে কথা বলার পর তিনি কর্নেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। উত্তেজনায় চোয়ালে-চোয়ালে ঘর্ষণের জন্যই তার গোঁফের দুই সূক্ষ্ম ডগা যথারীতি তিরতির করে কাঁপছিল।
একটু পরে কর্নেল চোখ খুলে বললেন,–হালদারমশাই। আমার মনে হচ্ছে জয়গোপালবাবুর বোনের আশঙ্কার কারণ আছে। একটা কুকুরকে চিরকালের জন্য চুপ করানোর অনেক উপায় আছে। অথচ কেউ বা কারা কুকুরটার মাথা কেটে দরজার পাশে ঝুলিয়ে রেখছিল কেন? জয়গোপালবাবুকে নিশ্চয় তারা বোঝাতে চেয়েছিল, তোমার মুণ্ডুও এমনি করে কাটা হবে।
–ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার! এবার আমার ধারণাটা কইয়া ফেলি?
–হ্যাঁ বলুন!
–কে বা কারা ওনার ঠাকুরদার কোনো প্রপার্টি ফেরত চায়।
আমি অবাক হয়ে বললুম,–ফেরত চায় মানে?
জবাবটা কর্নেল দিলেন,–জয়ন্ত! হালদারমশাই সম্ভবত ঠিক বুঝেছেন! জমিদারের খাজাঞ্চি ছিলেন জয়গোপালবাবুর ঠাকুরদা। এমন হতেই পারে, তিনি কারও কোনো প্রপার্টি–তার মানে কোনো দামি জিনিস হাতিয়ে নিয়েছিলেন। এখন তার বংশধর সেটা ফেরত চাইছে। এছাড়া রাতবিরেতে চোরের উপদ্রবের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। জিনিসটা খাজাঞ্চি ভদ্রলোকের নিজের হলে চোরেরা এত সব কাণ্ড করতে যাবে কেন? জুতোচুরি, রাতবিরেতে হানা দেওয়া, কুকুরের মুণ্ডুকাটা!
বললুম,–আমার ধারণা, জুতোচুরি মানে জয়গোপালবাবুকে উত্যক্ত করা।
হালদারমশাই বললেন,–হঃ! ঠিক কইছেন জয়ন্তবাবু! বারবার জুতোচুরি করলে মাইনষের মাথা ব্যাবাক খারাপ হওনের কথা! তারপর কুত্তার মুণ্ডুকাটা! জয়গোপালবাবুকে উত্যক্ত কইর্যা মারছে অরা। কর্নেলস্যার! আপনি আমারে পারমিশন দ্যান! বাবুগঞ্জে গিয়া খোঁজখবর লই।
কর্নেল বললেন, আমার মতো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবেন?
–আপনিও লগে-লগে থাকবেন।
আমি বললুম,–বাবুগঞ্জ কোথায়?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,–বেহুলা নদীর ধারে!
বিরক্ত হয়ে বললুম,–ওঃ কর্নেল! এমন একটা সিরিয়াস ব্যাপারকে আপনি হাল্কাভাবে নিচ্ছেন। ধরুন, যদি সত্যি জয়গোপালবাবুর কোনো বিপদ হয়?
এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন,…হ্যাঁ। বলছি।… আরে কী কাণ্ড! পরেশ। তুমি বেনেপুকুরে কবে এলে?..কী আশ্চর্য! আমার নাকের ডগায় আছো! তোমার মাসতুতো দাদাকে সঙ্গে নিয়ে তুমিই আসতে পারতে!…হ্যাঁ। জয়গোপালবাবু এসেছিলেন। তোমার কথাও বলছিলেন।…হা তুমি যখন বলছ, আমার পক্ষে যতটা সম্ভব সাহায্য নিশ্চয় করব।…আমারও তাই মনে হল। একটু ছিটগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সেটা এ অবস্থায় স্বাভাবিক। তো শোনো! উনি হঠাৎ উঠে চলে গেলেন।…বুঝতে পেরেছি। তো বাবুগঞ্জ জায়গাটা ঠিক কোথায়?..না। ওই যে বললুম, হঠাৎ চলে গেলেন।…তার মানে শান্তিপুরের আগে!… কাছারিবাড়ির মোড়? তারপর?…নাঃ! বাসে নয়। গাড়িতেই যাব, তত কিছু দূরে নয়!…দোমোহানি ওয়াটারড্যাম?…বাঃ! এখন তাহলে তো সাইবেরিয়ান হাঁসের মেলা বসে গেছে।…বলো কী! গড়ের জঙ্গলেও… ওয়ান্ডারফুল! বুঝলে পরেশ? কদিন থেকে ভাবছিলুম মফস্বলে শীত এসে গেছে। জলাভূমিতে দেশ-বিদেশের পাখি এসে জুটবে। এবার কোথায় যাব, তা ঠিক করতে পারছিলুম না।…ধন্যবাদ পরেশ! এই খবরটার জন্য ধন্যবাদ।…না, না। ওঁর কেসটা আমি নিয়েছি।…আচ্ছা রাখছি।
রিসিভার রেখে কর্নেল একটু হেসে বললেন,–জয়ন্ত, তিতলিপুরের গড়ের জঙ্গলের কথা ভুলে গেছ?
হালদারমশাই নড়ে বসলেন।–হঃ! সেই তিতলিপুর! গড়ের জঙ্গল।
বললুম,–বাজে জায়গা। তিতলিপুরে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। বিশেষ করে নভেম্বর মাসে।
কর্নেল বললেন,–বাবুগঞ্জ তিতলিপুর থেকে সামান্য দূরে। আমরা দোমোহানির যে সেচ-বাংলোতে ছিলুম, সেখানে নয়। আমরা এবার থাকব বাবুগঞ্জের কাছাকাছি অন্য একটা বাংলোতে।
একটু অবাক হয়ে বললুম,–একজন ছিটগ্রস্ত মানুষের আবোল-তাবোল কথা শুনে আপনিও দেখছি হালদারমশাইয়ের মতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন! হালদারমশাই একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসার এবং বর্তমানে গোয়েন্দাগিরি ওঁর নেশা ও পেশা। বরং হালদারমশাই আগে গিয়ে ব্যাপারটা বুঝে আসুন।
