হালদারমশাই কথা বলার জন্য উসখুস করছিলেন। এবার বলে উঠলেন,–তাহলে জুতোচুরি, রাত্রে আপনারে জ্বালাতন, তারপর কুত্তার মাথা কাইট্যা ঝোলানো সেই প্রবোধেরই কাম!
জয়গোপালবাবু হাত নেড়ে বললেন,–না। না। প্রবোধের সে সাহসও নেই। আর ক্ষমতাও নেই। নেশাভাঙ করে বুড়ো বয়সে তার শোচনীয় অবস্থা। লাঠিতে ভর করে লেংচে হাঁটে। একটু হেঁটেই হাঁপায়। একদিন সে–
জয়গোপালবাবু হঠাৎ থেমে গেলেন। কর্নেল বললেন,–বলুন জয়গোপালবাবু।
–কালীপুজোর কদিন আগের কথা। বাজারে গেছি। হঠাৎ দেখি প্রবোধ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। একটু চমকে উঠেছিলুম বইকী! কিন্তু সে হাউমাউ করে কেঁদে বলল, ও ভাই গোপাল! আমাকে গোটাদশেক টাকা দে, তোর পায়ে পড়ি। আমার বড় কষ্ট রে! অবনী আমাকে এখন তাড়িয়ে দেওয়ার ছল খুঁজছে! কান্নার চোটে ভিড় জমে গেল।
–আপনি টাকা দিলেন?
–দিলুম স্যার! মনটা ভিজে গেল। পিসতুতো দাদা! বুদ্ধির দোষে এই অবস্থায় পড়েছে। গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–তা হইলে সে আপনারে উত্যক্ত করতাছে না?
–আজ্ঞে না। কেউ বললেও ও কথা বিশ্বাস করব না।
–তা হইলে সেই অবনীবাবু করতাছে।
জয়গোপালবাবু বললেন,–অবনী মুখুজ্যে জমিটা দখল করেছে, তা ঠিক। তবে ওই জমিতে সে গার্লস হাইস্কুল করবে শুনেছি। হৈমন্তীর মতে, ওটা নাকি ওর চালাকি। আর আমাদের ন্যায্য জমি ফিরে পাওয়ার চান্স থাকবে না। তাই গালর্স স্কুল করে নাম কিনতে চাইছে। কিন্তু আমার জুতো চুরি করবে কেন সে?
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন,–আপনার ঠাকুরদার উইলটা একটু দেখতে পারি?
জয়গোপালবাবু বললেন,–নিশ্চয়ই দেখতে পারেন। হৈমন্তী মাঝে-মাঝে আমাকে বলে, ঠাকুরদার উইলেই এমন কিছু গণ্ডগোল আছে, যা কোনো ল-ইয়ারও বুঝতে পারছে না। দলিল-দস্তাবেজের ভাষা স্যার, বোঝা বড়ই কঠিন।
বলে তিনি ব্যাগের ভিতর থেকে বড় আকারের একটা খাম কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল খাম থেকে আরেকটা জীর্ণ নোংরা খাম বের করলেন। তারপর দু-পাতার একটা কাগজ বের করে চোখ বুলিয়ে বললেন,–যদি আমার প্রতি আপনার বিশ্বাস থাকে, আমি এটা দু-একটা দিনের জন্য রাখতে চাই।
জয়গোপালবাবু করজোড়ে বললেন,–কর্নেলসায়েব, বিপদে পড়ে আপনার শরণাপন্ন হয়েছি, আপনাকে অবিশ্বাস করতে পারি?
-–ঠিক আছে। আপনাকে আসতে হবে না। আপনি বাবুগঞ্জে বসেই শিগগির এটা ফেরত পাবেন। আর একটা কথা। আপনি যে আমার কাছে এসেছিলেন, তা আপনার বোন ছাড়া আর কাকেও ঘুণাক্ষরে যেন জানাবেন না। তবে আপনার মাসতুতো ভাই পরেশ চৌধুরী পুলিশের লোক। পরেশ আমার বিশেষ স্নেহভাজন। সে আমাকে কিছুক্ষণ আগে টেলিফোন করেছিল। সে আমাকে আপনার কথা বলেছে। কাজেই বাইরের লোক বলতে শুধু পরেশই জানল।
জয়গোপালবাবু খুশি হয়ে বললেন,পরেশ টেলিফোন করেছিল আপনাকে? তাহলে আর আমি ওর কাছে যাচ্ছিনে। বারোটা পাঁচের লালগোলা প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরব। রানাঘাট জংশনে নেমেই বাস পাব।
বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর কর্নেলকে নমস্কার করে পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন, –ওঁদের সঙ্গে তো আলাপ হল না! দেখছ কাণ্ড? ছ্যা-ছ্যা! আমার ভদ্রতাবোধটুকুও হারিয়ে ফেলেছি।
কর্নেল আগে হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিতেই জয়গোপালবাবু বিস্ফারিত চোখে নমস্কার করে বললেন,–ওরে বাবা! প্রাইভেট ডিটেকটিভ? জানেন স্যার, হৈমন্তী আমাকে একবার বলেছিল–
তার কথা থামিয়ে কর্নেল আমার পরিচয় দিলেন। জয়গোপালবাবু আমাকে নমস্কার করে বললেন,–আমার কী সৌভাগ্য! ওরে বাবা! আপনারা সব কত নামজাদা মানুষ। আমি সামান্য এক চুনোপুঁটি!…
জয়গোপালবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি একটু হেসে বললুম,–হালদারমশাই কি এখন ওঁকে ফলো করতে চান?
গোয়েন্দাপ্রবর একটিপ নস্যি নিচ্ছিলেন। রুমালে নাক মুছে বললেন,–কর্নেলস্যার যা করতে বলেন, তা করব।
কর্নেল হাসলেন না। নিভে যাওয়া চুরুটটা জ্বেলে বললেন,–বাবুগঞ্জে হালদারমশাই যদি যেতে চান, আপত্তি করব না। বরং খুশি হব। তবে ছদ্মবেশে গেলেই ভালো হয়।
হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন,–যামু!
–আপনি তো সবচেয়ে ভালো পারেন সাধু-সন্ন্যাসী সাজতে।
–সাধুর বেশেই যামু!
–কিন্তু ঝুলির ভিতরে আপনার লাইসেন্সড রিভলভার থাকবে। আপনার সরকারি আইডেন্টিটি কার্ডও সঙ্গে থাকা দরকার।
আমি বললুম,–কিন্তু সেখানে প্রচণ্ড শীত!
প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসলেন,–সাধুরা কম্বল গায়ে জড়ায় না? ধুনি জ্বালে না?
–আপনার সেই সিন্থেটিক কাপড়ে তৈরি বাঘছাল, ত্রিশূল আর প্লাস্টিকে তৈরি মড়ার খুলি নিতে ভুলবেন না যেন!
হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–বাড়ি গিয়া খাওয়াদাওয়া কইরাই বারাইয়া পড়ুম। বাবুগঞ্জে গিয়া সন্ধ্যার পর সাধুর ছদ্মবেশ ধরুম। জয়গোপালবাবুর বাড়ির কাছাকাছি জায়গা হইলে ভালো হয়। চলি কর্নেলস্যার। চলি জয়ন্তবাবু!
কর্নেল বললেন,–যথাসময়ে আমাদের দেখা পাবেন। কিন্তু সাবধান হালদারমশাই! কুকুরের মুণ্ডু যে বা যারা কেটেছে, সে বা তারা শুধু ধূর্ত নয়, নৃশংসও বটে।
কর্নেলস্যার! পঁয়তিরিশ বৎসর পুলিশ ছিলাম। ভাববেন না।–বলে গোয়েন্দাপ্রবর সবেগে বেরিয়ে গেলেন।…
আমার ফিয়াট গাড়িটা কিছুদিন থেকে বেগড়বাঁই করছিল। গত সপ্তাহে মেকানিকের পাল্লায় পড়ে জব্দ হয়েছে। পরদিন সোমবার সকাল আটটায় বেরিয়ে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কে গাড়িটা যেন পক্ষীরাজের মতো উড়ে যাচ্ছিল। কর্নেল আমার বাঁদিকে বসেছিলেন। তার গলা থেকে ঝোলানো ক্যামেরা আর বাইনোকুলার। পিঠে যথারীতি আঁটা তাঁর প্রসিদ্ধ কিটব্যাগ, যার ভিতর একজন মানুষের জন্য দরকারি অসংখ্য জিনিস ঠাসা। কোণা দিয়ে উঁকি মারছিল প্রজাপতি ধরার জন্য অদ্ভুত একরকম জালের লম্বা হাতল। মাঝে-মাঝে তিনি বাইনোকুলারে পাখি দেখছিলেন, নাকি অন্য কিছু তা বলা কঠিন। এটা ওঁর এক বাতিক। মাঝে-মাঝে তিনি আমাকে সাবধান করে দিচ্ছিলেন, যেন গতি কমাই।
