–সে-ও কিছু বুঝতে পারছে না। হৈমন্তী কান্নাকাটি করে চুপিচুপি বলছিল, কালুকে চিরকালের জন্য চুপ করাতে চেয়েছে কেউ বা কারা, তা ঠিক। কিন্তু তার মনে একটা আতঙ্ক ঢুকেছে। কালুকে মারল, মারল, কিন্তু তার মাথা কেটে দোরগোড়ায় ঝোলালো কেন? তার আতঙ্কের কারণ, হয়তো এরপর আমার মাথা কেটে ফেলবে, ওটা তারই নোটিস! হৈমন্তীর ধারণা, রেলে চাকরি করার সময় আমি কারওর কোনো ক্ষতি করেছিলুম। আমি ওকে বলেছি, আমি ছিলুম রেলের সামান্য কেরানি। জ্ঞানত কারও কোনো ক্ষতি করিনি।
কর্নেল ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসে বললেন,–আপনার বাবা কী করতেন?
–বাবাও রেলে চাকরি করতেন। বাবা অবশ্য রেলে গার্ড ছিলেন। কাটিহারে মারা যান।
–আপনাদের বাড়িটা কে তৈরি করেছিলেন?
–আমার ঠাকুরদা বিনয়গোপাল রায়।
–তিনি কী করতেন?
–ঠাকুরদা বাবুগঞ্জে মুখুজ্যেমশাইয়ের জমিদারির সেরেস্তায় খাজাঞ্চি ছিলেন।
হালদারমশাই জিজ্ঞেস করলেন,–খাজাঞ্চি? সেটা কী পোস্ট?
কর্নেল বললেন,–ট্রেজারার বলতে পারেন। পুরোনো আমলে জমিদারদের খাজাঞ্চিখানা থাকত। অর্থাৎ ট্রেজারি। প্রজাদের খাজনা আদায় করে সেখানে রাখা হত। তাছাড়া জমিদারবাড়ির পারিবারিক সম্পদ, ধনরত্ন এসব কিছুই খাজাঞ্চিখানায় জমা থাকত। খাজাঞ্চি ছিলেন একাধার তদারককারী, আর ক্যাশিয়ার। কোষাধ্যক্ষ বলতে পারেন।
গোয়েন্দাপ্রবর গম্ভীরমুখে বললেন,–হঃ! বুঝছি।
কর্নেল বললেন,–জয়গোপালবাবু! আপনার ঠাকুরদাকে আপনি দেখেছেন?
–আজ্ঞে না। আমার জন্মের আগে তিনি মারা যান। ওদিকে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর মুখুজ্যেপরিবারের লোকেরা কে কোথায় চলে যায়।
-এখন বাবুগঞ্জে কোন মুখুজ্যে আছেন?
-আজ্ঞে স্যার, প্রমথ মুখুজ্যেমশাই। সেই সাতমহলা বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ। প্রমথবাবুর হাতে কিছু জমিজিরেত আছে। নিজেই দেখাশোনা করেন। মেকানাইজড় এগ্রিকালচার। বুঝলেন তো?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–বুদ্ধিমান লোক।
জয়গোপালবাবু আড়ষ্টভাবে হাসলেন,তা আর বলতে? ভাগচাষিদের ভাগিয়ে দিয়ে পাওয়ারটিলার আর সেচের জন্য পাম্পিং মেশিন কিনে রীতিমতো ফার্মহাউস করে ফেলেছেন। দোতলা নতুন বাড়ি করেছেন। তবে ঠাকুরবাড়িটা পুরোনো আমলের।
–আপনার জুতোচুরির কথা তাকে কি আপনি বলেছেন?
–বলিনি। বলে কী হবে? আমার বোন হৈমন্তী ছাড়া আর কেউ জানে না।
–পুলিশকে জানাননি?
জয়গোপালবাবু চাপাস্বরে বললেন,–হৈমন্তী নিষেধ করেছিল। পুলিশ জুতোচুরির কথা শুনলে হাসবে। বরং রাতবিরেতে বাড়িতে চোরের উৎপাতের কথা বলাই ঠিক হবে। তাই আমি পুলিশকে শুধু চোরের কথাই বলেছিলুম। তবে দেখুন কর্নেলসায়েব, দু-একটা মিথ্যা নালিশ না করলে কেস শক্ত হবে না। তাই পুলিশকে বলেছিলেন, চোর রান্নাঘর থেকে থালা-ঘটি-বাটি চুরি করেছে। আরও চুরি করার জন্য প্রায়ই রাতবিরেতে হানা দিচ্ছে।
–কুকুরটার কথা কি বলেছিলেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। পুলিশ ডায়েরি লিখে নিয়ে বলেছিল, কাকে সন্দেহ হয় বলুন। কাকেই বা সন্দেহ করব বলুন? বাবুগঞ্জে চোর নিশ্চয় আছে। তাদের কারও নাম করলে আমাদের ক্ষতি করতে পারে। তাই কারও নাম বলিনি।
–পুলিশকে আপনাদের কুকুরটার মুণ্ডুকাটার খবর নিশ্চয় দিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ। পুলিশ এসে মুণ্ডুটা নিয়ে গিয়েছিল। সে-ও স্যার, আমার মাসতুতো ভাই পরেশের অনুরোধে। পরেশ কলকাতার বেনেপুকুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর। সে-ই তো আমাকে আপনার কথা বলেছে।
ষষ্ঠীচরণ এতক্ষণে আমাদের জন্য দ্বিতীয় দফা কফি আনল। কর্নেল বললেন,–কফি খান জয়গোপালবাবু। কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।
জয়গোপালবাবু কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,–বাবুগঞ্জে স্যার জাঁকিয়ে শীত নেমেছে। শেয়ালদা স্টেশনে নেমে গরমের চোটে সোয়েটার খুলতে হল। তবে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। কফি খেয়ে সত্যিই চাঙ্গা হচ্ছি!
প্রাইভেট ডিটেকটিভ গুলি-গুলি চোখে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ বললেন,–জয়গোপালবাবুরে একটা কথা জিগাই।
জয়গোপালবাবু বললেন, আপনি কি স্যার ওপার বাংলার লোক?
–জন্ম হইছিল ওপারে। ছোটবেলায় এপারে আইছিলাম। তো কথাটা হইল, আপনার ঠাকুরদা জমিদারবাড়ির খাজাঞ্চি ছিলেন। ওনার একখান বাড়ি ছাড়া আর কোনো প্রপার্টি ছিল না?
জয়গোপালবাবু যেন চমকে উঠে বললেন,–প্রপার্টি?
তারপর ভদ্রলোক কফির কাপ-প্লেট রেখে তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে কী সর্বনাশ!–বলে আমাদের হতবাক করে বেরিয়ে গেলেন।
গোয়ন্দাপ্রবর বললেন,–এটা কী হইল? অরে আমি ফলো করুম…!
কর্নেল হালদারমশাইকে বাধা না দিলে উনি সত্যিই জয়গোপালবাবুকে অনুসরণ করে হয়তো বাবুগঞ্জে গিয়ে হাজির হতেন। কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই! শুনলেন তো! বাবুগঞ্জে এখন জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। শীতের পোশাক ছাড়া সেখানে গিয়ে শীতে কাঁপতেন, না গোয়েন্দাগিরি করতেন? কাজেই তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই।
হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন,–হেভি মিস্ত্রি আরও হেভি হইয়া গেল! ‘প্রপার্টি’ কথাটা যেই কইলাম, অমনই উনি কফি খাওয়া ছাড়ান দিয়া ঘোড়ার মতন ছুট দিলেন।
ঠিক বলেছেন। ঘোড়ার মতোই ব্যাপারটা অদ্ভুতই বটে।-বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। চোখ বুজে তিনি আবার ইজিচেয়ারে হেলান দিলেন।
আমি বললুম,–ভদ্রলোকের মাথায় ছিট আছে মনে হচ্ছে। ওঁর কথা বলার ভঙ্গিও কেমন এলোমেলো। গুছিয়ে সব কথা বলতে পারছিলেন না। পুলিশ কুকুরের কাটামুণ্ডু নিয়ে গেল কেন, তাও বুঝিয়ে বললেন না।
