–পাঁচজোড়া স্যার! আমার দুঃখের কথা আর কাকে বলব? অবশেষে আমার মাসতুতো ভাই পরেশ-পুলিশে চাকরি করে স্যার, সে-ই আপনার নাম-ঠিকানা দিল। আপনার চেহারার বর্ণনাও দিল। পরেশ বলল, এর বিহিত পুলিশ করতে পারবে না। তুমি কর্নেলস্যারের কাছে যাও। তাই এলুম! তা-তাহলে জুতো পরেই ঢুকি?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–হ্যাঁ। দেখছেন না, আমরা জুতো পরেই আছি!
যে ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন, তার পরনে সাদাসিধে প্যান্ট-শার্ট, কাঁধ থেকে একটা কাপড়ের ব্যাগ ঝুলছে এবং ব্যাগের ভিতর থেকে একটা সোয়েটার উঁকি দিচ্ছে। খাড়া নাকের নীচের প্রজাপতি-ছাঁট গোঁফ আর সিঁথে করা কঁচাপাকা চুলে ঈষৎ শৌখিনতার ছাপ। পায়ের পামশুজোড়া নতুন তা বোঝা যাচ্ছিল। এ-ও বোঝা যাচ্ছিল, ইনি যেখান থেকে আসছেন, সেখানে শীত এসে গেছে। কারণ তিনি কলকাতায় এসেই গায়ের সোয়েটার খুলে ব্যাগে ঠেসে ঢুকিয়ে রেখেছেন।
ভদ্রলোক সোফায় বিনীতভাবে বসে প্রথমে কর্নেলকে, পরে হালদারমশাই ও আমাকে করজোড়ে নমস্কার করলেন। তারপর বললেন, আমার নাম জয়গোপাল রায়। রেলে চাকরি করতুম। আজ এখানে, কাল সেখানে বদলির চাকরি। থিতু হয়ে কোথাও বসতে পারিনি যে বাড়ি-ঘর করব। আর করেই বা কী হবে? বাবুগঞ্জে পৈতৃক একতলা একখানা বাড়ি আছে। সেখানে আমার বিধবা বোনকে থাকতে দিয়েছিলুম। চাকরি থেকে গত মাসে রিটায়ার করার পর সেই বাড়িতেই চলে এসেছি, তারপর থেকেই এক উটকো বিপদ!
কর্নেল বললে,–জুতোচুরি?
–আজ্ঞে কর্নেলসায়েব! প্রথমে চুরি গেল পুরোনো পামশুজাড়া। সন্ধ্যাবেলা ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। গোবিন্দ-কোবরেজের ঘরে আড্ডা দিচ্ছিলুম। বাড়ি ফেরার সময় দেখি, সকলের জুতো আছে। আমার জোড়া নেই। সেই শুরু। কিন্তু তখন তলিয়ে কিছু ভাবিনি। আবার বাজার থেকে নতুন একজোড়া জুতো কিনলুম। দিন-তিনেক পরে মুখুজ্যেমশাইয়ের ঠাকুরবাড়িতে কথকতা শুনতে ঢুকেছিলুম। দরজার বাইরে জুতো খুলে রেখেছিলুম। কথকতা শেষ হল রাত দুটোয়। বেরিয়ে এসে আমার জুতোজোড়া আর খুঁজেই পেলুম না।
–তা হলে এইভাবে আপনার মোট পাঁচজোড়া জুতো চুরি হয়েছে?
–হ্যাঁ কর্নেলসায়েব। তারপর থেকে সতর্ক হয়েছিলুম। যেখানে ঢুকি, জুতোজোড়া হাতে নিয়েই ঢুকি কিন্তু এবার শুরু হল আরেক বিপদ! রাতবিরেতে বাড়ির আনাচে-কানাচে কারা ঘুরঘুর করতে আসে।
–সেটা টের পান কী করে?
–আজ্ঞে কালু। আমার বোনের পুষ্যি একটা কালো তাগড়াই কুকুর ছিল। তার নাম কালু। সে চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিত। তখন আমি আর আমার বোন হৈমন্তী ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁকডাক করে পড়শিদের জাগাই। তারা লাঠিসোটা, টর্চ নিয়ে বাড়ির চারদিকে খোঁজাখুঁজি করে। তবে দেখুন স্যার, দু-একদিন অন্তর এরকম হলে পড়শিরা বিরক্ত হয় না? দোষটা গিয়ে পড়ত কালুর ঘাড়ে।
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে শুনছিলেন। বললেন,–হুঁ। তারপর?
জয়গোপালবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–বাবুগঞ্জে বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু চোর আসে রাতবিরেতে, হঠাৎ যদি লোডশেডিং হয়, তখন। তো গত মঙ্গলবার ভোরবেলা উঠে দেখি সাংঘাতিক কাণ্ড। কাড়ির দরজার সামনে রক্তের ছড়াছড়ি। চাপ-চাপ রক্ত। চমকে উঠেছিলুম। কে কাকে আমার বাড়ির দরজার সামনে খুন করেছে ভেবে। তারপর চোখে পড়ল দরজার পাশে দেওয়াল থেকে–
–কালুর মুণ্ডু ঝুলছে?
জয়গোপালবাবু নড়ে বসলেন,–আপনি খবর পেয়েছেন স্যার? তক্ষুনি থানায় গিয়েছিলুম। পুলিশ এসেছিল। সে এক হইচই ব্যাপার! হৈমন্তী কালুর শোকে কেঁদেকেটে অস্থির। কর্নেলসায়েব! পরেশ বলছিল, আপনার নাকি পিছনেও একটা চোখ আছে। ওরে বাবা! সে এক বীভৎস দৃশ্য! আপনি নিশ্চয়
কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি খবরের কাগজ পড়েন?
জয়গোপালবাবু কিছু বলার আগেই গোয়েন্দাপ্রবর হালদারমশাই বলে উঠলেন,–সেই কুত্তার বডি উঠছে মৎস্যজীবীগো জালে! কর্নেলস্যার ঠিকই কইছিলেন। কুকুর-বলির রহস্য ঠিকই ফাস করছিলাম।
জয়গোপালবাবু অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন,–খবরের কাগজ নিয়মিত পড়ি না। কিন্তু উনি বলছেন মৎস্যজীবী–মানে জেলেদের জালে কুকুরের বডি উঠেছে। কিছু বুঝতে পারছি না!
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–পুলিশ আপনাকে খবর দেয়নি?
–আজ্ঞে না তো!
–বাড়ি ফিরে হয়তো আপনার বোনের কাছে জানতে পারবেন, পুলিশ আপনাদের হতভাগ্য কালুর লাশ উদ্ধার করেছে। আপনার বাড়ি বাবুগঞ্জে। নদীর ধারেই গঞ্জ গড়ে ওঠে। আপনাদের বাবুগঞ্জের নদীটার নাম কী?
–বেহুলা। একসময় নাকি বড় নদী ছিল। এখন প্রায় মজে এসেছে।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন, আপনাগো কুত্তাটার মাথা চোরেরা কাটল ক্যান তা কি বুঝছেন?
জয়গোপালবাবু বিব্রতভাবে বললেন,–চ্যাঁচামেচি করত বলে।
রাত্রে জুতোচোরেরা আপনার জুতো চুরি করতে আইলে কুত্তাটা চ্যাঁচামেচি করত–বলে হালদারমশাই কর্নেলের দিকে ঘুরলেন,–কর্নেলস্যার! একটা কথা বুঝি না। চোরেরা ভদ্রলোকের জুতো চুরি করে ক্যান? হেভি মিস্ত্রি।
কর্নেল হাসলেন, ঠিক বলেছেন হালদারমশাই! হেভি মিস্ত্রি। আচ্ছা জয়গোপালবাবু, কেউ. বা কারা আপনার জুতো চুরি করে কেন, একথা কি ভেবে দেখেছেন?
জয়গোপালবাবু করুণমুখে বললেন, অনেক ভেবেছি কর্নেলসায়েব। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি!
–আপনার বোন হৈমন্তীদেবীর কী ধারণা?
