সোফার এককোণে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্তকুমার হালদার–আমাদের প্রিয় হালদারমশাই’। তার ডানহাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর চিমটিতে একটুখানি নস্যি। কখন সেটা নাকে খুঁজবেন বোঝা যাচ্ছিল না।
হালদারমশাই একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসার। রিটায়ার করার পর একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। মাঝে-মাঝে তার এই এজেন্সির বিজ্ঞাপন দেন। কখনও-সখনও দু-একটা কেসও পান। কে জটিল হলে তিনি কর্নেলস্যারের লগে কনসাল্ট করতে আসেন। তবে আজ তাঁর হাবভাব দেখে বুঝতে পেরেছিলুম, কোনো কেসের ব্যাপারে কর্নেলের কাছে আসেননি।
নভেম্বর মাস শুরু হয়ে গেলেও এখনও কলকাতায় শীতের কোনো সাড়া নেই। প্রশস্ত ড্রয়িংরুমে দুটো সিলিংফ্যান পূর্ণ বেগে ঘুরছিল। একসময় নস্যি নাকে খুঁজে প্যান্টের পকেট থেকে নোংরা রুমাল বের করে নাক মুছলেন গোয়েন্দাপ্রবর কে. কে. হালদার। তারপর আপনমনে বললেন,–পড়বার মতন খবর নাই। জয়ন্তবাবু! আপনাগো দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা কী যেসব ল্যাখে, বুঝি না। খালি ন্যাতাগো বক্তৃতা। বক্তৃতা কি খবর? খবর কই গেল?
খবর আছে হালদারমশাই!-কর্নেল বলে উঠলেন। দেখলুম, এতক্ষণে তার টাইপ করা শেষ হয়েছে। কাগজগুলো গুছিয়ে ছবিগুলো তার সঙ্গে ক্লিপে এঁটে তিনি একটা প্রকাণ্ড খামে ঢোকাচ্ছিলেন। তাঁর দাড়ি থেকে চুরুটের ছাইটা এবার খসে পড়ে গেছে। হালদারমশাইয়ের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন, আপনার পড়ার মতো খবর জয়ন্তদের কাগজেই আছে। হালদারমশাই কর্নেলের দিকে গুলিচোখে তাকিয়ে বললেন,–কী খবর আছে কর্নেলস্যার?
–ছয়ের পাতায় মফস্বলের খবর দেখুন! তিন নম্বর কলামে বোল্ড টাইপে ছাপা!
গোয়েন্দাপ্রবর দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার পাতা উল্টে একটু ঝুঁকে বসে বিড়বিড় করে কী একটা খবর পড়তে শুরু করলেন।
একটু পরে তিনি খিখি করে হেসে উঠলেন,–অ্যাঁ? মৎস্যজীবীদের জালে মুণ্ডুকাটা কালো কুকুর! এটা কী হইল? মুকাটা মাইনষের বডি হইলে কথা ছিল। মুণ্ডুকাটা কুত্তার লাশ!
কর্নেল খামটা ড্রয়ারে ভরে সোফার কাছে তাঁর ইজিচেয়ারে এসে বসলেন। মিটিমিটি হেসে বললেন,–মুণ্ডুকাটা কালো কুকুরের লাশ আপনার খবর বলে মনে হচ্ছে না হালদারমশাই?
হালদারমশাই বললেন,–বুঝলাম না কর্নেলস্যার। জয়ন্তবাবু কই, মশায়! আপনাগো সাংবাদিকগো হাতে যখন ল্যাখনের মতো খবর থাকে না, তখন মুণ্ডুকাটা কালো কুত্তারে খবর কইরা ফ্যালেন!
বললুম,–কর্নেল ঠিক ধরেছেন। আপনি ধরতে পারেননি।
–ক্যান?
–চিন্তা করে দেখুন! দেবতার সামনে মুণ্ডু কেটে বলিদান করা হয় পাঁঠা। কোথাও কোথাও মোষের মুণ্ডু কেটেও বলিদানের প্রথা আছে। প্রাচীন যুগে নাকি এইভাবে নরবলির প্রথাও ছিল। কিন্তু কুকুর বলিদান! কোন দেবতা কুকুর-বলি পেলে খুশি হন? এটা একটা রহস্য না?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসলেন,–নাঃ। পোলাপানগো কাম। মশায়! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি! পাড়াগাঁয়ে দেখছি, পোলাপানরা শেয়ালের ছানার মুণ্ডু কাটত। বড়রা বাধা দিত না। ক্যান কী, শেয়াল অগো ছাগল, হাঁস-মুরগি খাইয়া ফ্যালে! কিন্তু কুত্তা হইল গিয়া উপকারী প্রাণী। রাত্রে পাড়ায় চোর ঢুকলে কুত্তা চাঁচাইয়া মাইনষেরে সাবধান করে।
কর্নেল বললেনে,–হালদারমশাই! আপনি নিজেই কুকুর-বলির রহস্য ফাঁস করে দিলেন কিন্তু!
–ফাঁস করলাম! কন কী কর্নেলস্যার?
–হ্যাঁ। পাড়ায় রাতবিরেতে চোর ঢুকলে কুকুর চ্যাঁচামেচি করে মানুষকে সাবধান করে। এটা আপনারই কথা। কাজেই চোরেরা সেই কুকুরকে রাগের বশে বলি দিতেই পারে। আর একটা কথা। খবরের শেষ লাইনটা আপনি পড়েননি।
হালদারমশাইয়ের গোঁফের দুই ডগা উত্তেজনায় তিরতির করে কঁপছিল। তিনি খবরের কাগজ তুলে আবার বিড়বিড় করে পড়তে থাকলেন। তারপর শেষ লাইনটা আওড়ালেন : খবর পেয়ে। দোমোহানির থানার পুলিশ মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে মুণ্ডুকাটা কালো কুকুরের লাশ উদ্ধার করেছে।
কর্নেল বললেন,–কী বুঝলেন এবার?
হালদারমশাই চাপাগলায় বললেন,–পুলিশ! তা হইলে খবরের একখান ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। কিন্তু দোমোহানির নিজস্ব সংবাদদাতা তা ল্যাখে নাই ক্যান, বুঝি না।
আমি বললুম,–নিজস্ব সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর জায়গার অভাবে কেটেছেটে ছাপানো হয়।
ঠিক এই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন,–ষষ্ঠী!
কর্নেলের এই ড্রয়িংরুমে ঢুকতে হলে ডাক্তারবাবুদের জন্য অপেক্ষারত রোগীদের ঘরের মতো একটা ঘর পেরিয়ে আসতে হয়। কর্নেলের ওই ঘরটা অবশ্য ছোট। ষষ্ঠী আগন্তুককে ভিতরে পাঠিয়ে দিয়ে ওদিকের করিডোর হয়ে নিজের ঘর বা কিচেনে চলে যায়। কর্নেলের কাছে সকলের জন্য দরজা খোলা, তা ষষ্ঠী জানে।
যাই হোক, একটু পরে ড্রয়িংরুমের পর্দার ফাঁকে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখা গেল। তিনি পা থেকে জুতো খোলর পর জুতো দুটো হাতে নিয়ে ঢুকছিলেন। কর্নেল বললেন, আপনি ইচ্ছে করলে জুতো পরেই ঢুকতে পারেন। আর যদি জুতো ওঘরে খুলে রেখেই ঘরে ঢোকেন, আপনার জুতো চুরি যাবে না।
ভদ্রলোক কাচুমাচু মুখে হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–আজ্ঞে অভ্যেস!
–তার মানে বাইরে জুতো খুলে কোথাও ঢুকলে আপনার জুতো চুরি হয়।
–আজ্ঞে স্যার! ঠিক ধরেছেন।
–এ পর্যন্ত কতজোড়া জুতোচুরি গেছে?
