কিছুক্ষণের মধ্যেই রমিতার সঙ্গেও আমার খুব ভাব হয়ে গেল। আমি কোন দেশের লোক সে-দেশটা কেমন–সব খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করল। তারপর অবাক হয়ে গেল যেন। সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা সবুজ বাংলার ছবি ওর কল্পনায় আসছিল না। তারপর কলকাতার কথা উঠল। কলকাতার কথা ওরা শুনেছে। বড় আজব শহর পুবের দেশে নাকি। বাবা ও মেয়ে অজস্র প্রশ্ন করে কলকাতা শহরের কথা জেনে নিল। তারপর বুড়ো বলল,–কলকাতা না দেখে ওর মৃত্যু হবে না। দেখা চাই। তবে সে তো বহুদিনের রাস্তা। সেই যা সমস্যা। …
ঘণ্টা দেড়েক চলার পর দিগন্তে রুণ্ডি বাজারের বাড়িগুলো ভেসে থাকতে দেখা গেল। একটু ভয় হল এবার। কিষাণচাঁদ রুণ্ডির কথা বলছিল। ওখানে নিশ্চয় ওর লোকজন আছে। আমাকে কি তারা চিনতে পারবে?
আরও আধঘণ্টা চলার পর আমরা রুণ্ডি পৌঁছে গেলুম। রুক্ষ অনুর্বর পাহাড়ি এলাকা। কিছু কল-কারখানা আছে দেখলুম। শহরের বাইরে একটা উপত্যকায় জিপসিদের গোটা পাঁচেক তাবু রয়েছে। ছাগল-ভেড়া-দুম্বা আর মুরগির পাল আছে। বেঁটে কয়েকটা ঘোড়া আর উটও আছে। কুকুর আছে একডজন। আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করছিল কুকুরগুলো। দু-জন জোয়ান জিপসি তাদের তাড়া করে ভাগিয়ে দিল। তারপর তিরিশ-বত্রিশ জন ক্ষুদে ও বড় নানা বয়সের জিপসি নারী পুরুষ আমাকে ঘিরে ধরল। সর্দার মেহেরু তাদের অল্প কথায় ব্যাপারটা শুনিয়ে আমাকে তার তাবুতে নিয়ে গেল।
তাঁবুর মধ্যে একটা খাঁটিয়ায় সুন্দর বিছানা পাতা রয়েছে। আমাকে শুয়ে পড়তে বলল। একটু পরে রমিতা এল হাসতে-হাসতে। ভাঙা উর্দুতে বলল,–ভাইজি। আপনার স্নান করা দরকার। আমি জল এনেছি কুয়ো থেকে। স্নান করে নিন।
বেরিয়ে দেখি, তাঁবুর সামনে একটা টুল পেতে রেখেছে। দুটো প্লাস্টিক বালতিতে জল রয়েছে। রমিতার হাতে সাবানের কৌটো আর তোয়ালে। শুধু তাই নয়, একপ্রস্থ পোশাকও এনেছে।
টের পাচ্ছিলুম, জিপসিরা একালের শহরে মানুষের ব্যবহৃত সব জিনিসই ব্যবহার করে। স্নান করার পর শরীরের ব্যথা অনেকটা কমে গেল। রমিতা ছাগলের টাটকা দুধ এনে দিল এক গ্লাস। বলল,–ভাইজি, খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও। খাবার সময় হলে ডাকব।
চোখের পাতা জড়িয়ে আসছিল। আমার পরনে এখন জিপসি পোশাক। ঘুমিয়ে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলুম। মরুভূমির মধ্যে দুলতে দুলতে উটের পিঠে চলেছি তো চলেছি। রমিতা বলছে–ভাইজি! বাংলা মুল্লুক আর কতদূর।…
ঘুম ভেঙে দিল কার ভারী গলার ডাকাডাকিতে। তারপর চোখ খুলে কয়েক মুহূর্ত বুঝতে পারলুম না–কোথায় আছি।
–ডার্লিং! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।
সঙ্গে-সঙ্গে হুড়মুড় করে উঠে বসলুম। এই কণ্ঠস্বর এবং এই বাক্যটি বহুকালের পরিচিত।
দেখি, আমার খাঁটিয়ার পাশে একটা টুলে বসে আছে আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।
নিশ্চয় আবার বিদঘুঁটে একটা স্বপ্ন দেখছি। চোখ কচলে বললুম,–আপনি কি সত্যিই কলকাতার ইলিয়ট রোডবাসী সেই বৃদ্ধ ঘুঘু?
–অবশ্যই সত্য, ডার্লিং!
–কিন্তু কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? জয়ন্ত তো কিষাণচাঁদের হাতে মারা পড়েছে। আমি জয়ন্ত নই! . দেখছেন না আমি একজন জিপসি।
–তা তো দেখতেই পাচ্ছি।
–লজ্জা করেনি আপনার আমার কাছে আসতে? কাল সারারাত আমি মরুভূমিতে কী ভোগান
কর্নেল হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–সব শুনেছি। জয়ন্ত, আমাদের ক্ষমা করো। তোমাকে উদ্ধারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। সারাটা রাত পুরো একটা মিলিটারি কনভয় নিয়ে কর্নেল কামাল খাঁ আর আমি দোশান মরুভূমি তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছি। কিষাণচাঁদ যে । পথনির্দেশ দিয়েছিল, তা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যে। ওর নিষ্ঠুরতার তুলনা নেই।
–আমি জিপসি তাবুতে আছি, কে বলল?
–তোমাকে সারারাত খোঁজাখুঁজি করে আমরা রুণ্ডির দিকে আসছিলুম। একস্থানে উটের পায়ের ছাপ দেখে সন্দেহ হল। পরীক্ষা করে দেখলুম, বালিতে কেউ শুয়েছিল। আশেপাশে কয়েকটা জুতোর ছাপও রয়েছে। তারপর উটের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে আমাদের গাড়ি এগোল। ছাপ গেছে সোজা উত্তরে। তখন ভাবলুম, হয়তো কিষাণচাঁদ তোমাকে এখনও ছেড়ে দেয়নি। কোনো কারণে আরও কোনও তথ্য আদায় করতে চায়। যাই হোক, এইমাত্র রুণ্ডি পৌঁছে খবর নিতে শুরু করলুম।-দোশান থেকে কোনো উটওয়ালা এদিকে এসেছে নাকি। তারপর সেইসূত্রে এদের তাবুতে এসে দৈবাৎ তোমাকে পেয়ে গেলুম।
তাঁবুর সামনে ভিড় জমেছিল। দুজনে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, কর্নেল কামাল খাঁ একদল সেপাই নিয়ে আসছেন। জিপসিদের মুখে আতঙ্কের ছাপ পড়েছে। ব্যাপারটা কর্নেলকে বললুম। তখন তিনি ওদের উদ্দেশে ছোটখাটো একটা ভাষণ শুরু করলেন। কর্নেল যে এত চমৎকার উর্দু জানেন, কে জানত।
কর্নেলের বক্তৃতা শুনে ওরা খুশি হল। জিপসিরা খুব আমুদে। কেউ কেউ অতি উৎসাহে নাচগান জুড়ে দিল আমাদের ঘিরে।
ভিড় ঠেলে রমিতা এতক্ষণে এসে আমার হাত ধরল।–ভাইজি, তুমি নাকি চলে যাচ্ছ?
–যাচ্ছি বোন!
–বা রে! তোমার জন্যে খানার জোগাড় হয়েছে না? তুম আমাদের মেহমান (অতিথি)।
কর্নেল ওর চিবুক সস্নেহে নাড়া দিয়ে বললেন,–বেটি! এ বুড়ো বুঝি মেহমান নয়?
রমিতা সলজ্জ হেসে মাথা দুলিয়ে বলল,–হ্যাঁ, তুমিও মেহমান।
কর্নেল কামাল খাঁ ভিড়ে উঁকি মেরে বললেন,–আর আমি?
