চাকাটা ক্রমশ বড় হতে-হতে এক লাফে মাটি ছাড়া হল। এক ভয়ংকর একচক্ষু দানব যেন আমাকে দেখতে পেয়েই লাল জিভ বের করে ঠোঁট চাটছে।
ওদিকে তাকাতে ভয় করছিল। তাই ঘুরে দক্ষিণে দৃষ্টি রাখলুম। তারপর এক আজব দৃশ্য দেখলুম। শূন্যে কী একটা কালো জিনিস ভাসছে।
জিনিসটা কাঁপতে কাঁপতে রঙ বদলাল ক্রমশ। মনে হল কী একটা প্রকাণ্ড চারঠেঙে প্রাণী দিগন্তের আকাশে নড়বড় করে পাখির মতো সাঁতার কাটছে।
একটু পরে দেখি, প্রাণীটা যেন একটা উট।
তা হলে কি মরুভূমিতে দিনের প্রথম মরীচিকা দেখতে পাচ্ছি আমি? মনে-মনে ঠিক করলুম, মরীচিৎকার দিকে তাকাবো না। মরীচিৎকার নাকি মায়া আছে। মানুষ বা প্রাণীকে আকর্ষণ করে নিয়ে যায় এবং পরিণামে ওই মিথ্যার পিছনে ছোটাছুটি করে মারা পড়তে হয়।
কিন্তু আবার দেখবার ইচ্ছে হল ব্যাপারটা। তখন ঘুরে, স্পষ্ট দেখলুম সত্যি সত্যি একটি উট দৌড়ে আসছে। উটের পিঠে একটা ছাতার মতো কিংবা নৌকার ছইয়ের মতো জিনিস চাপানো রয়েছে এবং তাতে দু-জন মানুষ বসে আছে।
মরীচিৎকার পিছনে মানুষ ছোট। কিন্তু এ যে দেখছি মরীচিকাই আমার দিকে ছুটে আসছে। হতবাক এবং অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইলুম।
ততক্ষণে সূর্যের রঙ সোনালি হয়ে উঠছে। দিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু বালির সমুদ্রে তরল সোনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে যেন। ক্রমশ উত্তাপ জেগে উঠছে শীতল বালিতে।
উটটা দেখতে দেখতে এসে পড়ল কাছাকাছি। তখন দেখলুম সামনের দিকে বসে আছে একটি কিশোরী মেয়ে। তার হাতে উটের দড়ি। পিছনে বসে আছে এক বৃদ্ধ। ওরা আমাকে দেখতে পেয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছিল না।
তাই অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলুম,–বাঁচাও! বাঁচাও!
সঙ্গে সঙ্গে কিশোরীটি উটের দড়ি টেনে ধরল এবং উটটা মুখ উঁচুতে তুলে দাঁড়িয়ে গেল।
আবার চিৎকার করে বললুম,–বাঁচাও! বাঁচাও!
উট দৌড়তে শুরু করছে আমার দিকে। এ কখনও মরীচিকা হতে পারে না। মরীচিৎকার কোনো ছায়া পড়ে না। কিন্তু এই উট এবং তার আরোহীদের লম্বাটে ছায়া পড়েছে।
উটটা এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। কিশোরীটি ড্যাবডেবে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ দুর্বোধ্য ভাষায় আমাকে কী বলল, বুঝতে পারলুম না। ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করলুম, পথ হারিয়ে বিপদে পড়েছি। আমাকে উদ্ধার করো।
উটকে ইশারা করতেই হাঁটু ভাজ করল। তখন বৃদ্ধ এবং কিশোরী নেমে দাঁড়াল। আমাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টে দেখে নিয়ে বৃদ্ধ এবার উর্দু ভাষায় বলল, তুমি কে? এখান কেমন করে এলে?
উর্দু আর হিন্দিতে তফাত খুব কম। আমি হিন্দিতেই জবাব দিলুম,আমি হিন্দুস্থানী। খবরের কাগজের লোক। দোশান মরুভূমি দেখতে এসে দিগভ্রান্ত হয়ে পড়েছি। সারারাত ঘুরে মরছি।
বৃদ্ধ হাসল।–তাজ্জব কথা বটে। মরুভূমি দেখার শখ এত বেশি তোমার? ঠিক আছে। এসো আমাদের সঙ্গে। তবে আমার উটটা খুব ক্লান্ত। আগের রাতে আমরা গিয়েছিলুম এই মরুভূমির একটা তীর্থে। সেখানে এক পীরের দরগা আছে। সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় রওনা দিয়েছিলুম। কিন্তু উটটা পাজি। পথ ভুল করে উল্টোদিকে চলে গিয়েছিল। তাই সকাল হয়ে গেল। আমরা ফিরে যাচ্ছি রুণ্ডির বাজারে।
বৃদ্ধের গায়ে একটা হাতকাটা ফতুয়া, পরনে ঢিলেঢালা পাতলুন, কোমরে একপ্রস্থ কাপড় জড়ানো। মাথায় পাগড়ি আছে। তার কাছে একটা বল্লম আর সেকেলে গাদা বন্দুকও দেখতে পাচ্ছিলুম।
মেয়েটির পরনে একটা ঘাগরা। কোমরবন্ধ আছে। ফুলহাতা জামার ওপর একটা হাতকাটা ক্ষুদের জহরকোটের মতো সবুজ ও নকশাদার আঙরাখা চাপানো। পরনে সালোয়ার ও পায়ে নাগরা জুতো। তার চুল বেণীবাঁধা। মাথায় একটা রুমালও সুন্দরভাবে জড়ানো আছে। সে ফ্যালফ্যাল করে আমাকে দেখছে আর দেখছে।
সাজ-পোশাক দেখে মনে হল এরা কি জিপসিদলের নোক? তাই জিজ্ঞেস করলুম,–আপনারা কি রোমানি?
জিপসিরা নিজেদের রোমানি বলে। বৃদ্ধ জবাব দিল,–হ্যাঁ, আমরা রোমানি। আমাদের লোকেরা রুণ্ডি বাজারের ওখানে একটা মাঠে তাবু পেতেছে। আমি ওদের সর্দার। দলের জন্যে মানত দিতে গিয়েছিলুম। তা, তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি, খাওয়া জোটেনি। ঠিক আছে। রোদ বেড়ে যাচ্ছে। উটের পিঠে যেতে-যেতে খেয়ে নেবে।
উটের পিঠে সুন্দর গদির আসন। ছইয়ের মতো একটা কাঠামো চাপানো। তিন দিক তেরপলের মতো শক্ত কাপড়ে ঘেরা। ছাদও রয়েছে। আরামে বসব ভাবলুম। কিন্তু উট চলতে শুরু করলে বেজায় ঝাঁকুনি টের পেলাম। শরীরের ব্যথা বেড়ে গেল।
বৃদ্ধ খুব দয়ালু। সে একটা টিফিন কেরিয়ার বের করে একটুকরো মোটা রুটি, খানিকটা জেলির মতো জিনিস আর একমুঠো কিসমিস দিল। বলল,–খেয়ে নাও। আর এই রইল জল। সবটাই খেয়ে নিতে পার। আর আমাদের জলের দরকার হবে না। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যাব।
ক্ষুধাতৃষ্ণা মিটিয়ে নিয়ে ওদের সঙ্গে গল্প শুরু করলুম। কথায় কথায় জানা গেল, বৃদ্ধ সর্দারের নাম মেহেরু। ওর মেয়ের নাম রমিতা। ওরা রুণ্ডিবাজারে এসেছে দিন সাতেক আগে। তার আগে ওরা ছিল কাফরিস্তানে। সেটা বালুচিস্তান ও ইরানের মধ্যে একটা পাহাড়ি এলাকা। কাফরিস্তানে থাকার সময় ওদের তিনটে ভেড়া মারা পড়েছে অসুখে। রুণ্ডিতে এসে কয়েকটা মুরগি মারা পড়েছে। ওদের ধারণা, শয়তানের নজর পড়েছে ওদের দলের ওপর। তাই তিখারি মরূদ্যানের তীর্থে পুজো দিয়ে এল।
