রমিতা ভেংচি কেটে বলল, তুমি তো মিলিটারি আদমি। মানুষ মারো। তুমি দূর হও এখুনি।
সর্দার মেহেরু বলল,–ছি, ছি বেটি! সবাই মেহমান। আজ সবাই খাবে। আজ আমাদের জীবনে একটা খুশির দিন। তিখারির পীরবাবা আমাদের দয়া করেছেন। তাই এত সব বড়া আদমি আমাদের তাঁবুতে এসেছেন।
বলে সে জিপসি ভাষায় ভিড়ের উদ্দেশে কিছু বলল। অমনি ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। কাঠের খুঁটি পুঁততে শুরু করল জোয়ানরা! তার ওপর রঙিন নকশাকাটা শামিয়ানা চড়াল। বুঝলুম, রীতিমতো একটা পার্টির আয়োজন হচ্ছে। কী সুন্দর ঝালরওয়ালা শামিয়ানা!
একটু তফাতে তেরপলের ছাউনির তলায় উনুনে বড়-বড় পাত্রে রান্না চাপল। যাকে বলে কমিউনিটি ভোজ। একসঙ্গে ওরা খায়। এখন হঠাৎ মেহমান এসে পড়ায় বাড়তি খাদ্যের ব্যবস্থা হচ্ছে। দুজন জোয়ান একটা মস্ত দুম্বা নিয়ে গেল টানতে টানতে। নিশ্চয় ওই দুম্বার মাংসে অতিথিদের সেবা হবে।
গতিক দেখে কর্নেল কামাল খাঁ ওঁর দলবলকে ধমক-ধামক দিয়ে কোথায় যেন পাঠিয়ে দিলেন। পঞ্চাশজন সেপাইয়ের খাবার জোগানো এদের ওপর অত্যাচারের শামিল হত। জনা দুই মিলিটারি অফিসার এবং স্বয়ং কামাল খাঁ রয়ে গেলেন। একটা জিপ থাকল। জিপ ঘিরে জিপসি ছেলেমেয়েরা খেলা জুড়ে দিল। উজ্জ্বল রৌদ্রে বিশাল নীল আকাশের তলায় রঙিন পোশাকপরা ছেলেমেয়েদের মনে হচ্ছিল প্রজাপতির ঝক।
এদিকে তাবুর সামনে একদল যুবক-যুবতী। গিটারের বাজনার সঙ্গে নাচগান শুরু করেছে। দেখলুম, বিশালদেহী কর্নেল কামাল খাঁকে ওরা টানতে টানতে ভেতরে ঢোকাল। তারপর তাজ্জব হয়ে গেলুম। মাথার ওপরে একটা হাত ঘুরিয়ে এবং মাঝে মাঝে গোঁফে তা দিয়ে ভুড়ি দুলিয়ে ও কোমর ঘুরিয়ে গোয়েন্দা দফতরের মিলিটারি অধিকর্তা সে কী নাচ নাচছেন!
হঠাৎ রমিতা দৌড়ে এসে কর্নেল বুড়োকে হ্যাঁচকা টান দিল।
তারপর দেখলুম, বুড়ো আসরে ঢুকে গেছেন। এবং দিব্যি নাচ শুরু করেছেন। কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের নাচ দেখব, সে কি স্বপ্নেও ভেবেছিলুম?
ওদের নাচগান চলতে থাকল। সর্দার মেহেরু আমাকে নিয়ে গেল ওর সেই তাবুতে। তারপর বলল,–তুমি কমজোর হয়ে গেছ, বেটা। তুমি রোদে ঘুরো না। চুপচাপ শুয়ে থাকো। খেতে একটু দেরিই হবে। ততক্ষণ তুমি আংরেজি কেতাবটা পড়তে পার।
বইটা দেখে অবাক হলুম। জাঁ পল সাত্রের লেখা ফরাসি বইয়ের ইংরাজি অনুবাদ : দা জিপসিজ। বললুম, এই বই কোথায় পেলেন সর্দারজি?
মেহেরু বলল,–এক সাহেব দিয়েছিল। আমাদের খবরা-খবর জানতে এসেছিল। তখন আমরা কাফ্রিস্তানে ছিলুম। ওটা তুমি ইচ্ছে করলে নিতে পার। আমরা কী করব ও নিয়ে?
বইটা পড়তে শুরু করলুম। অনেক খবর জানা গেল। এরা আসলে ভারতেরই বাসিন্দা ছিল কোনো যুগে। এদের ভাষায় হিন্দুস্থানী শব্দ প্রচুর। রোমানি কথাটা এসেছে সংস্কৃত রম্যানি’ থেকে। তার মানে ভ্রমণকারী। ফার্সিতে রম্ মানেও ভ্রমণ। রতা’ মানে বেড়াচ্ছে।
তাহলে রমিতার মানে দাঁড়ায়-যে মেয়ে সারাজীবন বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়াবে বলে জন্মেছে। হায়, আমি যদি একজন জিপসি হতুম, রমিতা হত আমার ছোটবোন!
.
আবার মোহেনজোদাড়ো
রওনা হতে পাঁচটা বেজে গেল। রমিতার জন্য রুণ্ডি বাজার থেকে কয়েকটা সুন্দর পাথরের মালা আর একজোড়া সোনার দুল কিনে এনেছিলুম। সেগুলো পেয়ে রমিতা কি খুশি!
কিন্তু যাবার সময় সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,–ভাইজি এমন করে চলে যাবে জানলে ওই মরুভূমিতেই ফেলে রেখে আসতুম।
ওকে আদর করে বললুম,–বোনটি আমার! রাগ করো না। আবার দেখা হবে।
সে বেণী দুলিয়ে জোরে মাথা নেড়ে বলল,হবে না। বাইরের লোকের সঙ্গে আমাদের দুবার দেখা হয় না।
–বেশ। তা হলে মরে গিয়ে আমি তোমাদের দলে জন্মাব।
রমিতা কী বুঝল কে জানে, হঠাৎ, ভেংচি কেটে দৌড়ে চলে গেল তাবুর দিকে। কিছুক্ষণ পরে পাহাড়ের চড়াইয়ে ওঠার সময় ঘুরে নীচের উপত্যকার জিপসি,তাঁবুগুলোর দিকে তাকালুম। হঠাৎ দেখতে পেলুম, উপত্যকার পুবদিকের টিলার চূড়ার একটা পাথরের ওপর রমিতা দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে রুমাল নাড়ছে।
আমি হাত নেড়ে মনে মনে বললুম–বিদায় রমিতা! বিদায়! মন খারাপ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্যে। এই যাযাবর মানুষগুলোর সম্পর্কে কত ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে। ওরা নাকি চোর-ডাকাত, খুনে এবং জাদুকর।
মনে হল, সব মিথ্যা। ওদের চির-যাযাবর জীবনের আনন্দ, ওদের স্বাধীনতা আর বাধাবন্ধনহীন উদ্দাম জীবন দেখে ঈর্ষাবশত আমরা ওদের নামে বদনাম রটাই।
কিছুক্ষণ পরে আমাদের জিপ পৌঁছল একটা প্রশস্ত হাইওয়েতে। অজস্র যানবাহন যাতায়াত করছে। কর্নেল কামাল খাঁ জানালেন–এই হাইওয়ে লারকানায় পৌঁছেছে। উনি জিপ চালাচ্ছেন। কর্নেল ও আমি ওর ডানপাশে বসেছি। এতক্ষণে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করার সময় পেলাম। শেষ পর্যন্ত কী হল গুপ্তধনের?
কর্নেল বললেন,–হিটাইট সীলমোহরের অবিকল একটা নকল ভাগ্যিস আগেভাগেই তৈরি করিয়ে রেখেছিলুম। সেটা দেওয়া হয়েছে কিষাণচাঁদকে। চিত্রলিপি অদলবদল করা হয়েছে ডঃ তিড়কের সাহায্যে। ওই সূত্র ধরে কিষাণচাঁদ ফাঁদে পড়বে। কামালসাহেব ফাঁদ পেতে রেখেছেন। মোহেনজোদাড়োর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে লুকিয়ে আছে ওঁর বাহিনী।
–গতরাতে দুহালার সেই গুহায় কি আমার খোঁজ করেননি আপনারা?
