জানি না, আমার চিঠি পেয়ে কর্নেল কী করবেন। আমাকে তিনি কত স্নেহ করেন, তা জানি। কিন্তু ওই চাকতিটা তো তার ব্যক্তিগত জিনিস নয়। যখনই পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি ডঃ করিম এবং কর্নেল কামাল খাঁকে ওটা দেখিয়েছেন তখনই ওটা সরকারি সম্পত্তি হয়ে গেছে।
এই সময় কেউ এসে দাঁড়াল। কিষাণচাঁদ তাকে বলল,–দেখা হয়েছে?
-–হ্যাঁ, স্যার। এই নিন, উনি চিঠিও দিয়েছেন।
ডাকাত সর্দারকে স্যার বলা শুনে এখন হাসার অবস্থা নয়। নয়তো হো হো করে হেসে ফেলতুম। কিষাণচাঁদ মন দিয়ে চিঠি পড়ছে এখন। পড়া শেষ হলে সে টর্চ নিভিয়ে জিজ্ঞেস করল–আর কী বললেন?
–বললেন, খাঁটি জিনিসই বটে।
–কখন দেখা হবে ওঁর সঙ্গে?
–চিঠিতে তো সব লিখে দিয়েছেন?
–তোমার মুখেই শুনি।
–কাল দশটায় তিন নম্বর গেটে থাকবেন।
-–ঠিক আছে। চলো, রওনা হওয়া যাক।
–আপনার উট কী হল?
–পাঠিয়ে দিয়েছি। হারুনকে বলেছি, উট বেঁধে রেখে তাবারুর জিপ নিয়ে রুণ্ডিতে অপেক্ষা করবে আমার জন্যে। তুমি কোন পথে এলে?
–জুলং বাজার হয়ে।
–মিলিটারি আছে ওখানে?
–না। তবে শুনলুম, দুহালার দিকে একটা বড় কনভয় রাত বারোটায় রওনা দিয়েছে।
–ঠিক আছে। চলো রওনা হই।
–আসামির অবস্থা কী? কবর দিয়ে যেতে হবে নাকি?
কিষাণচাঁদ টর্চের আলো আমার মুখে ফেলল। ওর স্যাঙাত বলল,–তাজ্জব। এখনও তাজা হয়ে আছে যে স্যার!
কিষাণচাঁদ চাপা হেসে আমার উদ্দেশে বলল,–তা হলে ছোটঘুঘু। আসি আমরা। তুমি আরামে ঘুমোও। তোমাকে মুক্তি দেব বলেছিলুম, দিলুম। আমরা আসি।
ওঠার চেষ্টা করে বললুম,–আমি এখানে পড়ে থাকব? এ তো মরুভূমি!
-বাঙালি হয়ে জন্মেছ। মরুভূমি একবার দেখবে না কেমন বস্তু? রাগে দুঃখে বলে উঠলুম,–আপনি এত নিষ্ঠুর কিষাণচাঁদজি! আপনি জবাব দিয়েছিলেন, চাকতির বদলে কর্নেলের কাছে আমাকে পৌঁছে দেবেন।
–মোটেও না। তেমন কিছু বলি নি। যা বলেছি, তা করেছি। তোমার ঠিকানা আমার লোক তোমার বুড়ো ঘুঘুকে দিয়ে এসেছে। অতএব ভাবার কিছু নেই। ওরা এসে তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে।
বলে কিষাণচাঁদ উটের পিঠে বসল। ওর স্যাঙাত উটের দড়ি ধরে নিয়ে চলল। আস্তে আস্তে দূরে উটের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। অন্ধকার রাতের মরুভূমিতে হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় আহত শরীরে পড়ে রইলুম। চোখ ফেটে জল এল এতক্ষণে।, একটু পরে হঠাৎ মাথায় এল, এই মরুভূমিতে কর্নেলরা আমাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে? ওঁরা খুঁজতে-খুঁজতে যদি বেলা হয়ে যায়, রোদ তীব্র হতে থাকে, তা হলে তো আমি তেষ্টাতেই মারা পড়ব। তারপর প্রচণ্ড উত্তাপ তো আছেই।
অতএব প্রাণপণ চেষ্টায় কোনোরকমে যদি রাত থাকতে এগোবার চেষ্টা করি, তা হলে বাঁচার সুযোগ পেতেও পারি।
কিষাণচাঁদ যে দিকে গেল, সেই দিকে তাকিয়ে আবছা দূরে যেন সিগারেটের আগুন দেখলুম। মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করলুম।
হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা চলার পর উঠে দাঁড়ালুম অতিকষ্টে। দুই কাঁধে ভীষণ যন্ত্রণা। আস্তে-আস্তে টলতে-টলতে পা বাড়ালুম। কখনও আছাড় খাচ্ছি, কখনও উঠে হামাগুড়ি দিচ্ছি। আবার কখনও কয়েক পা কুঁজো হয়ে হাঁটছি। এভাবে কিছুটা চলার পর মনে জোর এল।
যখনই দম আটকানোর মতো অবস্থা হল, তখনই থেমে চিত হয়ে শুয়ে পড়লুম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলুম। তারপর হাঁফাতে-হাঁফাতে এইভাবে এগিয়ে গেলুম।
একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র লক্ষ করে চলার ফলে কিষাণচাঁদরা পেথে গেছে, সেই পথেই যাচ্ছি মনে হল। সাদা বালির ওপর নক্ষত্রের আলো পড়ায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল উটের ও মানুষের পায়ের গভীর ছাপ।
একবার মনে হল কিষাণচাঁদের নাগাল পেয়ে গেছি। পরে দেখলুম, ভুল। বাতাসের শব্দ।
এইভাবে চলেছি তো চলেছি। কখনও হাঁটু ভর করে, কখনও বুকে হেঁটে। আবার কখনও উঠে দাঁড়িয়ে পা ফেলার চেষ্টা করছি। মাঝে মাঝে বিশ্রামও নিচ্ছি।
কিছুক্ষণ পরে উটের পায়ের দাগ হারিয়ে ফেললুম। সামনে উঁচু বালির পাহাড় আছে মনে হল। সেখানে গিয়ে অনেক চেষ্টা করেও ওটাতে উঠতে পারলুম না। প্রতিবার কিছুটা উঠে গড়িয়ে নীচে এসে পড়লুম।
বারবার চেষ্টার পর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লুম। শেষবার গড়াতে গড়াতে এত জোরে নীচে পড়লুম যে ঝাঁকুনির চোটে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলুম।
যখন জ্ঞান হল, তখন দিনের আলো ফুটছে।
অনেক কষ্টে মুখ তুলে চারপাশটা দেখলুম। তারপর আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। যতদূর চোখ যায়, শুধু বালি আর বালি। দিগন্তে আকাশ নিচু হয়ে এসে মিলেছে। মরুভূমি কাকে বলে, এতক্ষণে টের পেলুম।
একটু পরে সূর্য উঠবে। তারপর কী ঘটবে, স্পষ্ট বুঝতে পারছি।
তবু মানুষের মনে কী যেন একটা শক্তি আছে। বেঁচে থাকার একটা সুতীব্র ইচ্ছা আছে। সেই শক্তি আর ইচ্ছা আমাকে সাহস জোগাল।
আবার ক্ষীণ একটা আশা জেগে উঠল, কর্নেলরা আমাকে খুঁজে বের করবেনই। বিশেষ করে কর্নেল কামাল খাঁ মিলিটারি কনভয় নিয়ে নিশ্চয় বেরিয়ে পড়েছেন ওর সঙ্গে। আমি চারদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রেখে বসে রইলুম। এ আমার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। …
.
জিপসি মেয়ে রমিতা
কিছুক্ষণ পরে দিগন্তের আকাশ লালচে হয়ে উঠছে, দেখে জানলুম ওটাই তাহলে পূর্বদিক। আমি উত্তর দিকেই এগিয়েছি। আমার পায়ের ছাপ দেখে সেটা বোঝা গেল। কিন্তু এবার সূর্য ওঠার সময় হয়েছে। দেখতে-দেখতে মরুভূমির সূর্য উঁকি দিল। লাল প্রকাণ্ড একটা চাকার মতো সূর্য। বুক শুকিয়ে গেল আতঙ্কে।
